Image description

দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকার পর আবারো টাকার বিপরীতে শক্তিশালী হচ্ছে ডলারের দাম। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর এটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যেই আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তিতে ডলারের দর উঠে গেছে
১২৩ টাকা ৫০ পয়সায়, যা দেড় মাস আগের তুলনায় প্রায় ১ টাকা ২০ পয়সা বেশি। আর ব্যাংকগুলোতে নগদ ডলারের দাম ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা ছাড়িয়েছে। মূলত আন্তর্জাতিক অস্থিরতায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ডলারের ওপর চাপ বাড়ছে। আর এতে সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিনিময় হারে। এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফের বাজার থেকে ডলার কেনা শুরু করেছে। টাকার মান প্রায় ৪৫ পয়সা অবমূল্যায়ন করে প্রায় ১২ কোটি ডলার কেনা হয়েছে। ফলে বাজারে ডলারের দাম আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে স্পট মার্কেটে কৃত্রিম ডলার সংকট তৈরি হয়ে দাম যাতে না বাড়ে, সে লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ফরওয়ার্ড ডলার বুকিংয়ে যেতে নিরুৎসাহিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফরওয়ার্ড বুকিং বেড়ে গেলে স্পট মার্কেটে ডলারের সরবরাহ কমে চাপ তৈরি হতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক মৌখিকভাবে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর ডলারের দাম বাড়তে থাকে। ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়তে পারে-এমন ধারণা থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের প্রবণতা বেড়েছিল। ফরওয়ার্ড বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি হলো- এমন একটি লেনদেন, যেখানে কোনো ব্যাংক বা পক্ষ ভবিষ্যতের নির্দিষ্ট সময়ে পূর্বনির্ধারিত বিনিময় হারে নির্দিষ্ট পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির অঙ্গীকার করে। বিনিময় হার ওঠানামার ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যবসা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এই পদ্ধতি ব্যবহার করে।

ব্যবসায়ীরা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ধারাবাহিকভাবে বাজার থেকে ডলার কিনতে থাকে, তাহলে বাজারে ডলারের সরবরাহ আরও কমে গিয়ে দাম বাড়তে পারে। আর ব্যাংকাররা বলছেন, বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ডলারের দাম বেশি নিচ্ছে। আগে যেখানে প্রবাসী আয়ের ডলার প্রায় ১২২ টাকা দরে পাওয়া যেত, এখন সেটি বেড়ে ১২৩ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফলে আমদানি এলসি নিষ্পত্তিতেও দাম বাড়ছে।
সূত্র বলছে, সামপ্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স কিনতে ব্যাংকগুলোকে বেশি দাম দিতে হচ্ছে। বর্তমানে রেমিট্যান্স কিনতে ব্যাংকগুলোর প্রায় ১২৩ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহে ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৯০ পয়সা পর্যন্ত খরচের মৌখিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আমদানি এলসি নিষ্পত্তির দরে। বিভিন্ন ব্যাংকগুলোর দুইদিন আগে প্রকাশিত দরে দেখা গেছে, এনআরবি ব্যাংক আমদানি এলসি নিষ্পত্তিতে প্রতি ডলার বিক্রি করেছে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায়। একই দিন ব্যাংকটি নগদ ডলার বিক্রি করেছে সর্বোচ্চ ১২৪ টাকা ৭৫ পয়সায়। ঢাকা ব্যাংক আমদানিতে ১২৩ টাকা ৪০ পয়সায় এবং নগদ ডলার বিক্রির দর ছিল ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা। অন্যদিকে এনআরবিসি ব্যাংক আমদানিতে ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা ডলার বিক্রি করেছে। এ ছাড়া ব্র্যাক, যমুনা ও স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক আমদানিতে প্রতি ডলার বিক্রি করেছে ১২৩ টাকা ২৫ পয়সায়। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, ব্যাংকগুলো যে দর প্রকাশ করছে, তার চেয়ে বেশি দামে আমদানি এলসি নিষ্পত্তি করছে।

জানা গেছে, টানা দেড় মাস বিরতির পর আবার বাজার থেকে ডলার কেনা শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৫ কোটি ডলার কেনা হয়। নিলাম পদ্ধতিতে (অকশন) প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। এর আগে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৭ কোটি ডলার কেনা হয়। ওইদিনই প্রতি ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। এর আগে গত ২রা মার্চ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার ক্রয় করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন ডলার কেনার দর ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবেই দেড় মাসেরও কম সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে প্রায় ৪৫ পয়সা। তবে ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রি করছে প্রায় ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত, যা বাজারে চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অথচ এক সপ্তাহ আগে গত ৮ই এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক বিবৃতিতে বলেছিল, আমদানি ও বৈদেশিক পরিশোধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক। আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ নিয়মিত ও পরিকল্পিত ধারায় চলছে। সার্বিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ও চাহিদা বর্তমানে ভারসাম্যপূর্ণ রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী, বাজারে আস্থা ও শৃঙ্খলা বিদ্যমান থাকার ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে টাকার বিনিময় হারে অবমূল্যায়নের কোনো চাপ নেই এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক ফের ডলার কিনতে শুরু করায় দর হারাচ্ছে টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বাজারে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে। তবে সামপ্রতিক দর বৃদ্ধির পেছনে ডলারের সরবরাহ কিছুটা সংকুচিত হওয়াই প্রধান কারণ। আগে ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে ডলার কেনা সম্ভব হলেও এখন তা ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় কিনতে হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেনা এই দরই বাজারে রেফারেন্স রেট হিসেবে কাজ করছে। এর ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো কিছুটা বেশি দামে আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রি করছে। তবে ডলারের দর নির্দিষ্ট করে বেঁধে দেয়া হয়নি। বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কখনো কম দামে, কখনো বেশি দামে ডলার কিনে থাকে।

ফরওয়ার্ড বুকিং এড়ানোর নির্দেশ: বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো কেবল গ্রাহকের প্রকৃত প্রয়োজনের বিপরীতে ফরওয়ার্ড বিক্রয় করতে পারবে এবং এসব চুক্তির উদ্দেশ্য হতে হবে বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি কমানো। ব্যাংকগুলো রপ্তানিকারক, ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্ট হোল্ডার ও এক্সচেঞ্জ হাউসসহ বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে ফরওয়ার্ড ডলার কিনতে পারে। তবে নিজেদের ঝুঁকি দ্রুত সমন্বয় করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।