ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় পোল্ট্রি খামারগুলোতে মড়কে একের পর এক খামার মুরগিশূন্য হয়ে পড়ছে। খামারিদের দাবি, এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর সংক্রমণে তাদের খামারগুলো উজাড় হয়ে যাচ্ছে। পুঁজি হারিয়ে এবং ব্যাংক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অনেক খামারি ইতিমধ্যে তাদের খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
খামারিদের অভিযোগ, মুরগির খাবারের চড়া মূল্য এবং বাজারে ভ্যাকসিনের তীব্র সংকটের কারণে তারা লোকসানের মুখে পড়েছেন। এমন চরম সংকটের সময়েও উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে কোনো ধরনের খোঁজখবর না নেওয়া বা পরামর্শ না পাওয়ায় তাদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামের ভাই বোন পোল্ট্রি ফার্মের মালিক আবুবকর সিদ্দিক ১৩ বছর ধরে ব্যবসার সাথে জড়িত। শুরুতে এ ব্যবসা করে লাভের মুখ দেখলেও খাদ্য ও ভ্যাকসিনের দাম বৃদ্ধিতে এ ব্যবসায় এখন লাভের মুখ দেখা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে তার। ডিম সিন্ডিকেটের কারনে ডিমের সঠিক দাম পাওয়া নিয়েও রয়েছে তার হতাশা। তারপরও অতি কষ্টে ব্যবসা ধরে রেখেছিলেন। ক মাস আগে খামারে থাকা ৪ হাজার ডিম দেয়া মুরগি রোগে আক্রান্ত হয়। কোম্পানীলোকদের পরামর্শে চিকিৎসা দেয়ার পরও ১২শ মুরগি মারা যায়। ৪০ লাখ টাকা খরচের পর মাত্র ৮ লাখ টাকা এসেছে খামার থেকে। এখন বাংক ঋণ ও কোম্পাণী লোকজন টাকা জন্য তাগাদা দিচ্ছেন। টাকা না পেলে তারা চেক ডিজওনারের মামলার ভয় দেখাচ্ছে। এখন কিভাবে ঋণের টাকা পরিশোধ করবো তার কোন গতি পাচ্ছেন না।
কাহালগাঁও গ্রামের অপর খামারি জহিরুল ইসলাম মজনু জানান, তার ৬৮ হাজার মুরগির মধ্যে এভিয়েন ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর এখন ৩৭ হাজার মুরগি রয়েছে খামারে। ৪৮ টি শেডে মুরগিগুলো লালন পালন করা হচ্ছিল। এতে তার ২ কোটি ৩৭ লাখ টাকার মত ক্ষতি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, উপজেলার প্রাণি সম্পদ অফিস থেকে তাদেরকে কোন সহযোগীতা করা হয় না। খামারগুলো পরিদর্শনেও আসেনা কেউ। মুরগী অসুস্থ হলে কোম্পানী নির্ভর চিকিৎসা করাতে হয় আমাদের। মুরগিগুলো ফ্লুতে আক্রান্ত হলে এসি আই ও এডভ্যান্স কোম্পানীর ভ্যাকসিন দিয়ে চিকিৎসা শুরু করি। কিন্ত ভ্যাকসিনে কোন কাজ না হওয়ায় অন্য কোম্পানীর ভ্যাকসিন দিয়ে চিকিৎসা শুরু করি। চিকিৎসা করতে করতেই খামারে মুরগি মরে সাবাড় হয়ে যায়।
খামারি আব্দুল কাইয়ুম জানান, কৃমি, জীবানুনাশক ওষুধ সেই সাথে খামারে খামারিদের স্প্রে মেশিন দেয়ার কথা থাকলেও কোন কিছুই খামারিদের দেয়া হয় না। উপজেলা প্রাণি সম্পদ অফিসে গিয়ে দেখবেন, একই ব্যক্তি প্রতি মাসে ভ্যাকসিন নিচ্ছেন।
মানিক নামের অপর খামারি জানান, আমরা প্রাণি সম্পদ অফিসে গেলে বলে থাকেন ভ্যাকসিন নেই। গ্রামে যারা খামারে খামারে ভ্যাকসিন দেন তাদেরকে অতিরিক্ত টাকা দিলে সরকারী ভ্যাকসিন খামারে এসে দিয়ে যান।
ফুলবাড়ীয়া উপজেলার প্রাণি সম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় লেয়ার খামার রয়েছে ৫শ, বয়লার খামার রয়েছে ২শ ও সোনালী জামের মুরগির খামার রয়েছে ১শ। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ মুরগি রয়েছে। শীতের সময় বিশেষ করে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে খামারগুলোতে ভাইরাস আতংক দেখা দেয়। এবার তারা অন্তত একশ খামারে ভাইরাস আক্রমন করে ছিল। সরকারী নির্দেশনা না পাওয়ায় অর্থ সহায়তা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পাশে দাড়ানোর কার্যক্রর কোন পদক্ষেপ নেই তাদের।
উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. যোবায়ের হোসেন বার্ড ফ্লু বা এভিয়েন ফ্লু কোনটাই মানতে নারাজ। তবে এটাকে তিনি ভাইরাজনিত রোগ নামে অভিহিত করেন। ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত কমপক্ষে একশ খামারে এবার তার অফিস থেকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি। তিনি জানান, এক মাস আগে ভেটেরিনারি সার্জন উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ চলে গেছেন। অফিস সহকারী দীর্ঘদিন ধরে নেই। ৪ জন ফিল্ড স্টাফের মধ্যে আছেন ২ জন। এ কারনে হয়ত মাঠে কম যাওয়া হয়। যারা সেবা নিতে আসেন তাদেরকে অফিস থেকে সেবা দিয়ে থাকি।