Image description

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে মুক্তির আগ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে টানা ছয় দিন একাকী অবস্থানে ছিলেন। এই সময়জুড়ে তিনি ছিলেন নীরব, সংযত এবং খুব প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলেননি।

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ নেত্রী শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ৭ এপ্রিল ভোরে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

গণঅভ্যুত্থানের সময় সহিংসতা, ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে রাজধানীর লালবাগ থানায় করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে রিমান্ড আবেদন করা হয়।

তবে আদালত রিমান্ড নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

সেদিন রাতেই তাকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে নেওয়া হয়।

আগেই ডিভিশন ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ তার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। ৭ এপ্রিল থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ছয় দিন তিনি ওই কক্ষেই অবস্থান করেন।
 

কারা সূত্র জানায়, কারাগারে পুরো সময় তিনি অত্যন্ত শান্ত ও সংযত ছিলেন এবং প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলেননি। ডিভিশন ভবনের দ্বিতীয় তলায় তিনি একাই ছিলেন; সেখানে অন্য কোনো ডিভিশনপ্রাপ্ত নারী বন্দি ছিল না। নারী কারারক্ষীদের কঠোর পাহারায় তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। তার সেবার জন্য একজন সাজাপ্রাপ্ত নারী কয়েদি নিয়োজিত ছিলেন। তাদের সঙ্গেও তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী কথা বলতেন। বন্দি হওয়ায় ডিভিশন ভবনের বাইরে তার যাওয়ার সুযোগ ছিল না।

গত ৮ এপ্রিল নিয়ম অনুযায়ী তার এক নিকট আত্মীয় (চাচাতো ভাই) কারাগারে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া ডিভিশন বন্দিদের জন্য নির্ধারিত খাবারই তাকে সরবরাহ করা হয়। কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী ডিভিশন ভবনের বাইরে যাওয়ার সুযোগও ছিল না।

১২ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিনি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পান। এ সময় কারাগারের সামনে তার আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত ছিলেন।

সোমবার (২০ এপ্রিল) কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, কারাগারে নেওয়ার পরপরই চিকিৎসকরা সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। তিনি সুস্থ ছিলেন এবং সুস্থ অবস্থাতেই জামিনে মুক্তি পান।

তিনি আরও জানান, আগের শারীরিক সমস্যার জন্য যে ওষুধগুলো তিনি নিয়মিত সেবন করতেন, সেগুলো সংগ্রহ করে তাকে সরবরাহ করা হয়েছিল।

৭ এপ্রিল গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা আগে শিরীন শারমিন চৌধুরী ধানমন্ডির ৮/এ সড়কে তার চাচাতো ভাই আরিফ মাসুদ চৌধুরীর বাসায় যান। দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকলেও হঠাৎ ফোন করে সেখানে যাওয়ার কথা জানান এবং পছন্দের খাবার রাখতে বলেন।

মাসুদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিরীন শারমিন চৌধুরী ও তার স্বামী ছোট একটি লাগেজ নিয়ে তাদের বাসায় আসেন। রাতে একসঙ্গে খাবার খাওয়া ও আলাপচারিতার পর গভীর রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তার বাসায় আসেন। ইন্টারকমে যোগাযোগ করে তারা তল্লাশির কথা জানান। বিষয়টি গোপন না রেখে মাসুদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করেন এবং শিরীন শারমিনকেও বিষয়টি জানান।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২ সেপ্টেম্বর স্পিকারের পদ থেকে ইস্তফা দেন শিরীন শারমিন চৌধুরী।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মে মাসে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) প্রকাশিত একটি তালিকায় গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ৬২৬ জনের মধ্যে তার নামও ছিল।

এছাড়া ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায় মোহাম্মদ আশরাফুল নামে এক ব্যক্তিকে গুলির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। ভুক্তভোগী আশরাফুল ২৫ মে আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২৯ জনকে আসামি করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে মামলাটি এজাহার হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়।

২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন চৌধুরী। পরপর তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন।