Image description
চাপে পড়বেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বিশ্ববাজারে অস্থিরতার মধ্যে দেশের বাজারেও বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। সরকার প্রতি লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা, অকটেনে ২০, পেট্রোলে ১৯ এবং কেরোসিনে ১৮ টাকা দাম বাড়িয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী শনিবার মধ্যরাত থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫, অকটেন ১৪০, পেট্রোল ১৩৫ এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে জ্বালানি তেলে এ মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প খাতসহ নাগরিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শিল্প খাতে পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন সবখানে ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। কৃষি খাতে সেচের পেছনে খরচ বাড়বে। পণ্য পরিবহনের ভাড়ায় প্রভাব পড়বে। এতে বাড়তে পারে পণ্যের দাম, যা খরচের বোঝা বাড়াবে ভোক্তাদের।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে তা স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন খাতের ওপর সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে। তবে বর্তমানে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে সরকারকে দাম বাড়াতে হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান কালবেলাকে বলেন, যতটুকু বোঝা যাচ্ছে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং সামনের দিনগুলোতে অনিশ্চয়তার কারণে দাম বাড়াতে হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়বে। জ্বালানির দাম বাড়লে পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ে তার প্রভাব পড়ে। এখানে পরিবহন, কৃষি খাত, শিল্প খাত, পণ্য উৎপাদন, রপ্তানিকেন্দ্রিক, আমদানিকেন্দ্রিক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতও রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা অতীতেও দেখেছি, তেলের দাম বাড়লে প্রথম ধাক্কা লাগে পরিবহন খাতে। খুচরা পর্যায়ে নিত্যপণ্যের দাম লাফিয়ে বাড়ে। এখানে দেখতে হবে যেন অযৌক্তিকভাবে, অস্বাভাাবিকভাবে দাম না বাড়ে। জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়বেই, কিন্তু সরকারের সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে এই চাপ অনেকখানিই প্রশমিত করা সম্ভব। সরকার শুধু দাম বাড়ালেই হবে না। সেটার প্রভাব কোথায় কতটুকু পড়ছে, সেটাও দেখতে হবে।

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, আমাদের বড় সমস্যা মানুষের আয় বাড়ছে না। আয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির প্রভাব কম পড়ে। সুতরাং বিনিয়োগ বাড়িয়ে আমাদের কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। মানুষের আয় বাড়াতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালবেলাকে বলেন, তেলের পাম্পে লম্বা লাইন, অথচ অবৈধ মজুত চলছে, কালোবাজারিতে দাম বাড়ছে, পাচারও হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ও বিশ্ববাজারের চেয়ে দেশে তেলের দাম কম, তাই দেশেও বাড়াতে হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও বিশ্ববাজার বিবেচনায় ব্যথাহীন কোনো বিকল্প নেই। দাম না বাড়ালেও তেল পাচার হচ্ছে। কৃষককে কালোবাজারিতে বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। এই বাড়তি খরচ বিবিএসের হিসাবে উঠবে না। অন্যদিকে জ্বালানির দাম বাড়ালে ভর্তুকির পরিমাণ কমবে। ভর্তুকির চাপও অনেক বড় চাপ। জ্বালানির দাম সহনীয় রাখতে ভর্তুকি দিয়ে খুব একটা সুবিধা হয় না। এটা ঠিক যে দাম বাড়লে বিভিন্ন খাতে খরচের চাপ তৈরি হয়। তবে তা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

এদিকে এখনই সরকারের হুট করে দাম বাড়ানো যথাযথ হয়নি বলে মনে করছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারম অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। কালবেলাকে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর জন্য সবসময় অজুহাত খুঁজতে থাকেন, এবার তাদের হাতে আরও একটি অজুহাত এলো। আর জ্বালানি তেলের মজুতদারসহ সব ব্যবসায়ী দাম বাড়ানোর জন্য সরকারকে নানাভাবে চাপ দিয়ে আসছিলেন। তারা সফল হলেন। জ্বালানি তেলের সঙ্গে নিত্যপণ্যসহ সবকিছুই সরাসরি জড়িত। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। এখনই সরকারের হুট করে দাম বাড়ানো যথাযথ হয়নি।

প্রথম ধাক্কা পরিবহন খাতে, অতিরিক্ত ভাড়া বাড়তে পারে গণপরিবহনে: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। বাস, ট্রাক, লঞ্চসহ সব ধরনের যানবাহনের ভাড়া বেড়ে যায়। জ্বালানি পরিবহন খাতের ব্যয়ের একটি অংশ মাত্র; কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম যতখানি বাড়ে ভাড়াও ততখানি বাড়ানো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার থেকেও বেশি বাড়ানো হয়। এতে ভোক্তাদের যাতায়াতে ব্যয় বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল জ্বালানির দাম সমন্বয় করলেই হবে না, এর প্রভাবে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে যাতে অস্বাভাবিক ভাড়া না বাড়ে তা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

শিল্প খাতে প্রভাব ঠেকাতে সরবরাহ স্বাভাবিক চান ব্যবসায়ীরা:

তৈরি পোশাক, চামড়া, সিরামিক, ইস্পাতসহ বিভিন্ন শিল্পে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দেবে। তাছাড়া পণ্যের দাম বাড়লে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ঢাকার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান কালবেলাকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শিল্প খাতেও তার প্রভাব পড়ে; কিন্তু দাম বাড়ার পরও তো সরবরাহ বাড়ছে না। পাম্পগুলোতে লাইন। আমাদের ভাবনা হলো ঠিক মতো সরবরাহ পাওয়া। আশা করি, দ্রুতই বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা কাটবে এবং এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসব আমরা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম কালবেলাকে বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে তা শিল্প ও রপ্তানি খাতে প্রভাব ফেলে। খরচ বেড়ে যায়। তবে আমাদের এখন দামের চেয়ে স্বাভাবিক সরবরাহটা বেশি জরুরি। কারণ জ্বালানির সরবরাহ না থাকলে সবকিছুই ব্যাহত হয়।

ডিজেলের বাড়তি দাম কৃষিতে খরচ বাড়াবে:

কৃষি খাতে ডিজেল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কারণ সেচ, ট্রাক্টর এবং ফসল পরিবহনে এটি ব্যবহৃত হয়। ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অন্য খরচও বাড়ে, যা সরাসরি ফসল উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়।

নিত্যপণ্যের দামেও প্রভাব পড়তে পারে:

জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্য পরিবহনেও ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অতীতেও এমনটি হয়েছে। আর পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে তা সরাসরি বাজারে, বিশেষ করে কাঁচা পণ্যের বাজারে দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে সাধারণ ভোক্তাদের কষ্ট বেড়ে যায়।

ক্যাবের সহসভাপতি নাজের হোসাইন বলেন, হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের কথা বলে দাম বাড়ানোর কারণে সব নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। অসাধু ব্যবসায়ীরা এর অপেক্ষাতেই ছিলেন। তারা এখন নতুন অজুহাত পেলেন। অতীতেও এমনটি হয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং মনিটরের ঘাটতির ফলেই বারবার এমনটি হচ্ছে।

চাপে পড়বেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা:

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন। এতে তাদের উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে এসব উদ্যোক্তারা সহজে তাদের পণ্যের দাম বাড়াতে পারেন না। ফলে তাদের লাভ কমে যায়। এ চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় এ ধরনের উদ্যোক্তাদের।