টিকা কর্মসূচিতে সফল বিবেচিত দেশগুলোর একটা বাংলাদেশ। নিয়মিত টিকাদান ও বিভিন্ন ধরনের টিকা কর্মসূচির কারণে পোলিও এবং ধনুষ্টংকার নির্মূলে সফল হয়েছে বাংলাদেশ। হেপাটাইটিস ও হাম এতোদিন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ছিল। গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে হাম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল; অথচ জানা গেলো এক শেষ মাসের মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে ৪১ জন মারা গেছে! খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে গাফিলতির কারণে সফল একটি কর্মসূচি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
আরও বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল (রবিবার) রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আট বছর আগে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর দেওয়া হয়নি! একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা কর্মসূচি কীভাবে আটবছর অবহেলিত থাকলো, এখণ জনমনে এ প্রশ্ন উঠছে ব্যাপকভাবে।
একমাসে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামে আক্রান্ত ১৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে ১২টি শিশু। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জে হামে মৃত্যু হয়েছে তিন শিশুর। নতুন নতুন হাম আক্রান্তের তথ্যও আসতে শুরু করেছে। যা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে দেশবাসীর মধ্যে।
টিকা সংকট!
আতঙ্ক আরও বেড়েছে টিকার মজুত না থাকার খবরে। হাসপাতালগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হামে আক্রান্তরা নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে অংশ নিলেও এমআর টিকা পায় নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টিকার জন্য ধর্ণা দিয়ে জেনেছে গুদামে টিকা নেই!
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে দেশে ১২টি রোগ প্রতিরোধে ৯টি টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন বয়সী শিশুদের দেওয়া হয় সাতটি টিকা। যক্ষ্মা প্রতিরোধে দেওয়া হয় বিসিজি টিকা; পেন্টা টিকা দেওয়া হয় ডিপথেরিয়া, পার্টুসিস, ধনুষ্টংকার, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি ও হেপাটাইটিস-বি প্রতিরোধে; পোলিও প্রতিরোধে দেওয়া হয় বিওপিভি ও আইপিভি টিকা; নিউমোনিয়া প্রতিরোধে দেওয়া হয় পিসিভি টিকা; টাইফয়েড প্রতিরোধে দেওয়া হয় টিসিভি টিকা এবং হাম ও রুবেলা রোগ প্রতিরোধে এমআর টিকা দেওয়া হয়।
নারীদের বিশেষভাবে ওেয়া হয় দুটি টিকা। ১০ বছরের বেশি বয়সী কিশোরীদের এইচপিভি টিকা দেওয়া হয় জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে এবং প্রজননক্ষম ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ধনুষ্টংকার ও ডিপথেরিয়া প্রতিরোধে দেওয়া হয় টিডি নামের টিকা।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) দপ্তরের দেওয়া তথ্য বলছে, কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি- এই ছয়টি টিকার মজুত এখন শূন্য। আইপিভি ও টিসিভির মজুত রয়েছে জুন পর্যন্ত। আর এইচপিভি চলবে ডিসেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যে মাঠপর্যায়ে আবার কোনো কোনো টিকার ঘাটতি আছে বলে নিশ্চিত করেছেন ইপিআই ও দাতা সংস্থার কর্মকর্তারা।
কেন নেই টিকা?
টিকা কেনায় বাংলাদেশকে আর্থিক সহায়তা দেয় টিকার সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ‘গ্যাভি‘। সংস্থাটি জানায় কোভিড পরবর্তী সময়ে ঝরে পড়ার কারণে অনেক শিশু হামের প্রথম ডোজ টিকা পেলেও দ্বিতীয় ডোজ পায়নি। একই সঙ্গে টকিার সরবরাহ ও জনবল ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই টিকা ঘাটতির সংকট তৈরি হয়।
আগে টিকা কেনা হতো স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচিতে (এইচপিএনএসপি) থাকা অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে। ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ে টিকা কিনতে পারতেন ওপির লাইন ডিরেক্টর। ২০২৫ সালের আগস্টে পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপি তথা ওপি–ব্যবস্থা বাতিল করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার পালিয়ে যাবার পর কয়েকমাস স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদ খালি ছিল। এটাও টিকা ক্রয়ে প্রতিবন্ধকতার অংশ।
এখন করণীয়
হামে আক্রান্ত হয়ে সারাদেশে শতাধিক শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। প্রতিদিনই নতুন আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, শিশুদের হামের চিকিৎসার জন্য সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ছাড়া আক্রান্ত জেলাগুলোতে শিশুদের হাম মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানান তিনি।