Image description

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও সমালোচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। পদোন্নতি-পদায়ন, অডিট আপত্তি এবং প্রশাসনিক নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে ৪ হাজার কোটি টাকার ‘হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট)’ প্রকল্প।

দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় ইউজিসির বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পটি শুরু থেকেই নানা অনিয়ম, পক্ষপাত এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্পটি তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে একটি গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ও প্রভাবনির্ভর কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে।

জানা গেছে, পাঁচ বছর মেয়াদি হিট প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার বহন করছে ২ হাজার ৩৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা এবং বিশ্বব্যাংক দিচ্ছে ১ হাজার ৯৮৩ কোটি ১১ লাখ টাকা ঋণ সহায়তা।

প্রকল্পটির সমন্বয়কারী এবং ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান প্রজেক্ট প্রোপোজাল প্রেজেন্টেশন রিভিউয়ার হিসেবে নিজের পছন্দ ও মতাদর্শের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। রিভিউ কমিটিতে থাকা ৬ জনই বামপন্থি শিক্ষক রাজনীতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন শিক্ষক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে। এই শিক্ষকদের সঙ্গে আদর্শগত সখ্যতার ভিত্তিতেই তাদেরকে রিভিউ বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করেন অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে রিভিউ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

অভিযোগ রয়েছে, রিভিউয়াররা নিজেদের দক্ষতার বাইরের বিষয়ের গবেষণা প্রস্তাবও মূল্যায়ন করেছেন। সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা ব্যবসায় শিক্ষা, অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, স্থাপত্যসহ বিভিন্ন ভিন্নধর্মী বিষয়ের প্রস্তাব মূল্যায়ন করেছেন, যা সংশ্লিষ্টরা নিয়মবহির্ভূত এবং অস্বাভাবিক বলে মনে করা হচ্ছে।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা এমনকি দাওয়াহ ও ইসলামিক স্টাডিজ, আর্কিটেকচার এবং শিক্ষা বিজ্ঞানের প্রকল্পও মূল্যায়ন করেছেন, যা অনেকেই ‘হাস্যকর’ পরিস্থিতি বলে আখ্যা দিয়েছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

রিভিউ কমিটিতে থাকা বেশ কয়েকজন শিক্ষকের গবেষণা প্রোফাইল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল সেসময়। তাদের অনেকেরই আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশনা এবং সাইটেশন অত্যন্ত সীমিত থাকলেও অধ্যাপক তানজীমউদ্দিনের সুপারিশে রিভিউ কমিটিতে স্থান পেয়েছিলেন তারা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আইনুন নাহারের স্কোপাস প্রোফাইলে মাত্র একটি ইনডেক্সড প্রকাশনা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে মির্জা তাসলিমার গুগল স্কলার প্রোফাইলে এইচ-ইনডেক্স ৩ এবং আই-১০ ইনডেক্স ১, যেখানে তার প্রকাশিত মাত্র তিনটি গবেষণাপত্র মোট ৬৪ বার উদ্ধৃত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গীতিআরা নাসরীনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার সংখ্যা সীমিত বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও সেগুলো যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের পরও গত বছরের ২৭ আগস্ট নির্বাচিত ১৫১টি উপ-প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশের ৪৩টি পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি সই করে ইউজিসি। ইউজিসির সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান নিজেদের মতো করে কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন বলেও অভিযোগ ওঠে।

পিডি নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। জানা যায়, নিয়োগ পরীক্ষায় ৩২ প্রার্থীর মধ্যে প্রথম হওয়া শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল হাসনাত মুহাম্মদ সোলায়মানকে ২০২৪ সালের ১৪ মার্চ নিয়োগ দেওয়া হয়।

তবে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের মৌখিক নির্দেশে মাত্র এক দিনের মধ্যে তার নিয়োগ বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসাদুজ্জামানকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। আসাদুজ্জামানের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতা থাকলেও তাকে বাদ দেননি অধ্যাপক তানজীনউদ্দিন খান।

মেধার পরিবর্তে সুপারিশের প্রভাবের অভিযোগ
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্প নির্বাচনে মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। ইউজিসি সদস্যদের সুপারিশের প্রভাব এবং স্বজনপ্রীতির কারণে তুলনামূলক কম গবেষণা ও সাইটেশনধারী শিক্ষকদের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ শতাংশ নির্বাচিত গবেষকের মোট সাইটেশন ১০০ এর নিচে এবং আরও ৪০ শতাংশের সাইটেশন ৫০০ এর কম। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষকদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম যোগ্যতাসম্পন্নদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে যা গবেষণার মানের জন্য বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

রিভিউ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব
রিভিউ কমিটিতে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ না থাকা, পিএইচডি ডিগ্রিবিহীন ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা, ব্লাইন্ড পিয়ার রিভিউর দাবি বাস্তবে অনুসরণ না করার ঘটনা হিট প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রেজেন্টেশন মূল্যায়নে নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে। বিভাগ ও অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য, প্রাক-বাছাই প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি অবহেলা, গবেষণার গুণগত মান নিয়ে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা, করোনা মহামারিকালে জাতীয় অবদান থাকা প্রকল্প বাতিল, শিল্প অংশীদার ছাড়াই ইন্ডাস্ট্রি প্রজেক্ট অনুমোদন, চূড়ান্ত বোর্ডে তাচ্ছিল্যমূলক আচরণ, রিভিউ ও ব্যবস্থাপনার নামে অর্থের অপচয়ের ঘটনা প্রকল্পটিকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফেলেছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া হিট প্রকল্পটি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত না হলে এ প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইউজিসির সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ এবং সদস্য (পাবলিক ইউনিভার্সিটি) তানজীনউদ্দিন খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘হিট প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

বিশ্বব্যাংকের উদ্বেগ, বিব্রত মন্ত্রণালয়
প্রকল্পটির স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংকও। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে হিট প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়টি তুলে ধরে।

এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. মিলন বলেন, ‘হিট প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাপক অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি আমাদের জন্য বিব্রতকর। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।’