জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যারা রক্ত দিয়ে নতুন বাংলাদেশের পথ গড়েছিলেন, এবারের ঈদে তাদের অনেকের ঘর ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢাকা। আনন্দের বদলে ছিল কেবলই বিষাদের ছাপ। চারদিকে যখন উৎসবের আমেজ, নতুন পোশাকের ঘ্রাণ আর ফিরনি-সেমাইয়ের আয়োজন, তখন শহীদ পরিবারগুলোতে ছিল কেবলই শূন্যতা আর অবহেলার দীর্ঘশ্বাস। শহরের কিছু পরিবার হয়তো সরকারি বা রাজনৈতিক নেতাদের সান্নিধ্য পেয়েছে; কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের সিংহভাগ পরিবারের ভাগ্যে তাও জোটেনি। রমজানের শুরু থেকে ঈদের দিন পর্যন্ত কেউই তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়নি। যাদের রাজভাগ্য গড়তে ছাত্র-তরুণরা অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিলেন, তাদের রাজকীয় ইফতার কিংবা জাঁকজমক ঈদ আয়োজনে শহীদদের স্বজনদের যথাযথ সম্মান ও ঠাঁই মেলেনি। উৎসবের রঙিন আলোয় এই বীরদের আত্মত্যাগ যেন এক চরম বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছে।
ভিটেবাড়িতে ইয়ামিনবিহীন ঈদের গল্প
সাভারে জুলাই বিপ্লবের শহীদ শাইখ আসহাবুল ইয়ামিনের পরিবারে ঈদ আনন্দের বদলে ছিল কেবলই বিষাদ। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই পুলিশের গুলিতে এমআইএসটির এই মেধাবী ছাত্রের নির্মম মৃত্যু তার বাবা-মা ও একমাত্র বোনের জীবন থেকে উৎসবের সবটুকু রঙ কেড়ে নিয়েছে। এবারও ঈদের কোলাহল এড়াতে তারা সাভারের বাসা ছেড়ে কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে চলে যান। সেখানে আত্মীয়-স্বজন ও গরিব মানুষের পাশে সময় কাটালেও ইয়ামিনবিহীন এ পরিবারে কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা খুশির ছোঁয়া ছিল না।
ইয়ামিনের বাবা মহিউদ্দিন জানান, শান্ত স্বভাবের ছেলেটি কোনোদিন কেনাকাটার বায়না ধরত না, অথচ তার সেই নিস্তব্ধ অনুপস্থিতিই এখন পরিবারের সবচেয়ে বড় হাহাকার। যে ছেলের রক্ত আর আত্মত্যাগে দেশ নতুন পথ পেল, তার শূন্যতা প্রতিটি উৎসবে পরিবারটিকে নতুন করে শোকাতুর করে তোলে। ইয়ামিনের বাবা-মায়ের কাছে ঈদ মানে এখন কেবলই ছেলের কবর জিয়ারত আর হারানো সন্তানের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানো।
জুলাই শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের বাবা সাহরিয়া খান পলাশ জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তার আরেক সন্তানকে নিয়ে ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়তে যান। ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘অনেক বছর আগে আনাস ও আমি ঈদের নামাজ পড়তে বায়তুল মোকারম জাতীয় মসজিদে যাই। আনাসের ছোট ভাই সাফওয়ান আনাসের ছোটবেলার ছবিগুলো দেখে আমাকে বলে, বাবা তুমি যে বড় মসজিদে ঈদের নামাজে ভাইয়াকে নিয়ে গিয়েছ, আমাকেও নিয়ে যেতে হবে; আমরা ভাইয়ার মতো করে ছবি তুলব। আনাসকে সঙ্গে নিয়ে যেভাবে ছবি তুলেছিলাম, সাফওয়ানের সঙ্গে সেভাবেই ছবি তোলার অনেক চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারিনি। আনাস, আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, শরীফ ওসমান হাদিরা একবারই আসে।’
উত্তরা থেকে গাইবান্ধার নিভৃত কোণে পরিবার
৩২ বছর বয়সি মোহাম্মদ সুজন ছিলেন পরিবারের আশার প্রদীপ। রাজধানীর উত্তরা আজমপুরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যখন বিজয়ের উষালগ্ন, ঠিক তখনই স্তব্ধ হয়ে যায় তার প্রাণ। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন; স্বপ্ন দেখতেন ছেলে নাহিদ (১১) আর মেয়ে সুমনা (১৩) বড় হয়ে একদিন মানুষের মতো মানুষ হবে। কিন্তু মৃত্যুর পর যেন সব পরিচয় হারিয়ে গেল। ৬ আগস্ট উত্তরার বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যখন তার নিথর দেহটা পাওয়া যায়, তখন থেকেই তার পরিবারের উৎসবের দিনগুলো শেষ হয়ে যায়।
সুজন যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন, সেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও তার শাহাদতের পর বিন্দুমাত্র সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়নি। সুজনের মা এখন গাইবান্ধা সদরে নাতি-নাতনিদের নিয়ে দিন কাটান। ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১০ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট করে দেওয়া হলেও বাজারের অগ্নিমূল্যের কাছে সেই টাকা খুবই সামান্য। মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতার মধ্যে শহীদ সুজনের স্ত্রী পান ১৩ হাজার আর মা পান সাত হাজার টাকা।
সুজনের মায়ের কণ্ঠে ঝরে পড়ে অভিমান, ‘ঈদে কেউ খোঁজ নেয় নাই। রোজার মাসে ঘরে কেবল কান্নাকাটি। মানুষ না থাকার যে কী হাহাকার, তা কাউরে বোঝানো যায় না। আমার ছেলেটা দেশের জন্য জীবন দিল, কিন্তু ঈদ ও রোজায় কেউ খোঁজও নেয় নাই। আমাদের জন্যই ওরা গদিতে বসেছে, অথচ আমাদের ঘরের খোঁজ নেওয়ার সময় তাদের নাই।’
জুয়েলের ভাঙা সংসার ও দুটি পিতৃহীন মুখ
২৭ বছরের টগবগে যুবক মো. জুয়েল। তারও ছিল ছোট দুটি মেয়ে আর বৃদ্ধ বাবা-মা। জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে জুয়েল ফিরে আসেননি। তার মৃত্যুর পাঁচ-ছয় মাস পরই স্ত্রী জীবনের তাগিদে অন্যত্র বিয়ে করে চলে গেছেন। পেছনে পড়ে রইল জুয়েলের দুই অবুঝ শিশু আর ৪৫ বছর বয়সি মা জোমেলা খাতুন ও বাবা মন্তাজ উদ্দিন বেপারী।
জুয়েলের মা জোমেলা খাতুন আক্ষেপ করে আমার দেশকে বলেন, ‘আমরা যাদের জন্য সব হারালাম, তারা আমাদের ভুলে গেল। ঈদে কেউ খোঁজ নেয় নাই।’
আশুলিয়ায় পুলিশ ভ্যানে পোড়া সাজ্জাদের পরিবার গ্রামে
শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের গল্পটি আরো বেশি পীড়াদায়ক ও বীভৎস। ২০০৫ সালে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ছিলেন ঢাকার সিটি ইউনিভার্সিটির ছাত্র। তিনি বিবাহিত ছিলেন। আড়াই বছরের একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তানও রয়েছে। ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় সাজ্জাদকে হত্যা করে তার লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
অর্থনৈতিক সংকট কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার প্রমাণ সাজ্জাদের পরিবার। ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর তারা ঢাকা ছেড়ে গাইবান্ধার শ্যামপুরে ফিরে যেতে বাধ্য হন। কারণ, ঢাকার বাসা ভাড়া আর সাজ্জাদের ছোট বোনটির পড়াশোনার খরচ চালানোর সামর্থ্য তাদের আর নেই। সাজ্জাদের স্ত্রীও অন্যত্র বিয়ে করে চলে গেছেন। আড়াই বছরের শিশুটি এখন তার দাদির কাছে বড় হচ্ছে।
সাজ্জাদের মা শাহীনা বেগম বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে ছিল সাজ্জাদ। আজ অভাবের কারণে আমরা ভিটেমাটিছাড়া হয়ে গ্রামে পড়ে আছি। এখন আর আমাদের খোঁজ কেউ নেয় না। ঈদ গেল, পরিবারের আনন্দ নেই। সহানুভূতি জানানোর মানুষও এখন আর নেই।’
শহীদ মোবারকের বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গ্রিন রোডের বেপজা অফিসের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় এই শিশু। মোবারকের বাবা রমজান (৫৫) এখন কেরানীগঞ্জে থাকেন। তার এক ছেলে অটো চালান, আর রমজান নিজে দুধ বিক্রি করে কোনোমতে টিকে আছেন।
ঈদে এই দরিদ্র পরিবারটির খোঁজ নেয়নি কেউ। রমজান বলেন, ‘আমার ছোট ছেলেটা তো রাজনীতি বুঝত না। সে তো মিছিলে গিয়েছিল দেশের জন্য। কিন্তু আজ বড় বড় নেতারা যখন কোলাকুলি করে, তখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ঘরে কেউ উঁকিও দেয় না। সরকার বা রাজনৈতিক দল কারো পক্ষ থেকেই আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।’
শহীদের স্বজনরা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার বা টিকে থাকার জন্য জুলাই শহীদদের নাম জপছে। কিন্তু সেসব মানুষের ঘরে যখন রোজা বা ঈদের দিন অভাব থাকে, যখন কোনো শহীদ বাবার একমাত্র ছেলের লাশ পোড়ানোর শোক নিয়ে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়, তখন সবার বিবেক কোথায় থাকে?
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন আমার দেশ সাভার প্রতিনিধি নজমুল হুদা শাহীন)