জুলাইযোদ্ধাদের দায়মুক্তি সংক্রান্ত অধ্যাদেশের বিষয়ে ‘সবাই একমত’ বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাইয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। বেলা ১১টায় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক শুরু হয়।
১২ই মার্চ সংসদে উত্থাপিত ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে সংসদে প্রতিবেদন দেয়ার বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়। ওদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাইয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে ৪০টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন এ তথ্য জানিয়েছেন।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে এক মিটিংয়ে ফয়সালা করা সম্ভব হবে না, তাই আরও কয়েক দফা বৈঠকে বসতে হবে। তবে ‘অনেক বিষয়ে’ একমত হওয়া গেছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই ইনডেমনিটি বিষয়েও সবাই একমত।
এরআগে বৈঠকে প্রবেশের আগেও সংসদ ভবনের সামনে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো এখনো গঠিত না হওয়ায় কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কোন অধ্যাদেশ গ্রহণ করা যায়, কোনটা সংশোধন করে নেয়া যায়, আর কোনটার ক্ষেত্রে আরও পরিবর্তন লাগবে, সেগুলো নিয়েই আলোচনা হবে। তার ভাষায়, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে কিছু রয়েছে, যেগুলো সংবিধানের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হচ্ছে’। আবার কিছু অধ্যাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ‘জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন’ রয়েছে।
সালাহউদ্দিন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা আমরা ধারণ করবো। যেমন কিছু অধ্যাদেশ আছে, যেখানে জুলাইযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানে যারা নেতৃৃত্ব দিয়েছে বা অংশগ্রহণ করেছে- তাদের বিষয়ে ইনডেমনিটির বিষয় আছে, এগুলো আমরা গ্রহণ করবো। এছাড়া আগের সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত বাতিলের বিষয়ও ‘সহজে গ্রহণযোগ্য হবে’ বলে তার বিশ্বাস।
বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার কাজ শুরু হয়েছে। আমরা ২ তারিখের (এপ্রিল) মধ্যে রিপোর্ট তৈরি করবো। সংবিধান এবং জনআকাঙ্ক্ষা দুইটাকে সমন্বয় করে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান অবশ্যই সবার থেকে এগিয়ে থাকে।
আইনমন্ত্রী বলেন, সব সিদ্ধান্ত এখনই জানানো যাবে না। রিপোর্ট যখন প্রকাশ হবে তখন বলা যাবে। আমরা মাঝপথে আছি, এগোচ্ছি।
বিশেষ কমিটির সুপারিশের সঙ্গে সঙ্গে অধ্যাদেশ যে সরাসরি আইনে পরিণত হয় না, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কমিটি তাদের মতামত ও সুপারিশ সংসদে পেশ করবে, পরে সংসদই চূড়ান্তভাবে ঠিক করবে কোনগুলো আইনে পরিণত হবে।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনেই এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ১২ই মার্চ আইনমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন। পরে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিনের নেতৃত্বে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন, যা কণ্ঠভোটে অনুমোদন পায়।
সংসদে তোলা অধ্যাদেশগুলো বিশেষ কমিটিতে পাঠিয়ে ২রা এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। একইসঙ্গে সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, ২৯শে মার্চ আবার সংসদ বসবে। চলতি অধিবেশন ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। ফলে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন এই অধিবেশনেই আলোচনায় আসার সুযোগ থাকছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা এসব অধ্যাদেশের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশোধন, গণভোট, সাইবার সুরক্ষা, পুলিশ কমিশন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশও রয়েছে।
বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। কমিটির সদস্যরা হলেন ঢাকা-৮ আসনের মির্জা আব্বাস, কক্সবাজার-১ আসনের সালাহউদ্দিন আহমেদ, বরগুনা-২ আসনের মো. নুরুল ইসলাম, ঝিনাইদহ-১ আসনের মো. আসাদুজ্জামান, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, নোয়াখালী-১ আসনের এ. এম. মাহবুব উদ্দিন, জয়পুরহাট-২ আসনের মো. আব্দুল বারী, পঞ্চগড়-১ আসনের মুহাম্মদ নওশাদ জমির, নাটোর-১ আসনের ফারজানা শারমীন, রাজশাহী-১ আসনের মো. মুজিবুর রহমান, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের মো. রফিকুল ইসলাম খান এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের জি. এম. নজরুল ইসলাম।
বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে ৪০ অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা: অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাইয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে ৪০টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। তিনি বলেন, প্রথম দিনে অর্ধেকেরও কম অধ্যাদেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা গেছে। কিছু বিষয়ে সদস্যদের ভিন্ন মত আছে, সেগুলো পরের বৈঠকে আবার আলোচনা হবে। গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
কমিটির সভাপতি বলেন, আজকে প্রায় আমরা অর্ধেক পর্যন্ত, অর্ধেকেরও কিছু কম হবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। তিনি বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশ তৎকালীন সময়ের প্রয়োজনে অন্তর্বর্তী সরকার জারি করেছিল। এখন সেগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সংসদ বিশেষ কমিটি গঠন করেছে।
জয়নুল আবেদীন বলেন, কিছু বিষয়ের ওপর দুই-একজন সদস্যের কিছু কিছু মতামত আছে, সেগুলো পরবর্তী সভায় আলোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে লিখিত মতামতও নেয়া হবে।
আজ দুপুর ২টায় কমিটি ফের বৈঠকে বসবে জানিয়ে তিনি বলেন, ২রা এপ্রিলের আগেই ১৩৩টি অধ্যাদেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংসদের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। সংসদে কবে উত্থাপিত হতে পারে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সেটি পরে সংসদ ঠিক করবে। তবে সম্ভবত এক সপ্তাহের মধ্যেই হতে পারে।
যেসব অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা: সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈঠকের শুরুতে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ছাত্র-জনতার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং মোনাজাত করা হয়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনা হওয়া ৪০টি অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে-দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী সংশোধন, মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সংশোধন, বৈদেশিক অনুদান রেগুলেশন সংশোধন এবং বাংলাদেশ বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল রহিতকরণ অধ্যাদেশ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যেসব অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ অধ্যাদেশ, সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, সরকারি চাকরি (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং নিয়োগের বয়সসীমা নির্ধারণসংক্রান্ত সংশোধনী অধ্যাদেশ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যেসব অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার মধ্যে আছে-জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা রহিতকরণ, সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ।
এছাড়া ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী সংশোধন, বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সংশোধন, বেসামরিক বিমান চলাচল সংশোধন, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি সংশোধন, মাছ সংরক্ষণসংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সংশোধন, শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট সংশোধন, বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন সংশোধন, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সংশোধনের দুটি অধ্যাদেশ, বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ ট্রাস্ট সংশোধন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার সংশোধন, পরিত্যক্ত বাড়ি সম্পূরক বিধানাবলী সংশোধন, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং স্থানিক পরিকল্পনা অধ্যাদেশ নিয়েও আলোচনা হয়।
পরবর্তী বৈঠকে বাকি অধ্যাদেশগুলো নিয়ে আলোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে বলে সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, অধ্যাদেশগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও যথার্থতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন আকারে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে পেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিটি।