Image description
ছয় জেলার ‘আওয়ামী বাহিনী’

ভুয়া ঠিকানায় পুলিশ নিয়োগ! খবরের এমন শিরোনাম অবিশ্বাস্য হলেও বাস্তবে তা ঘটেছে। শুধু দু-একজন নন, শত শত। আওয়ামী জমানায় গোপালগঞ্জসহ বিশেষ ছয়টি জেলার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের জেলা কোটায় নিয়োগ দিতে এমন নজিরবিহীন দুর্নীতি-জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়। বাকি জেলাগুলো হলো ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, বাগেরহাট ও খুলনা।

বিরোধী মত দমনসহ ক্ষমতায় থাকাকে পাকাপোক্ত করতে পুলিশবাহিনীর মধ্যে এভাবে ‘আওয়ামী বাহিনী’ তৈরি করতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে এই অপকর্মে নেতৃত্ব দেন তৎকালীন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) হাবিবুর রহমান। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৭ বছরে যিনি একাধিক প্রাইজ পোস্টিং ভোগ করে সরকার পতনের শেষদিন পর্যন্ত ডিএমপি কমিশনার ছিলেন।

সূত্র জানায়, এসব জেলার দলীয় কর্মীদের পুলিশে ঢোকাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জমি কিনে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী চাকরি হওয়ার পর অনেকে কেনা জমি বিক্রি করে টাকাও তুলে নেন। তবে দলীয় বিবেচনায় এভাবে পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রত্যেকের কাছ থেকে বড় ধরনের নিয়োগ বাণিজ্য করা হয়। ফলে এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাতারাতি অর্থবৃত্তে ফুলেফেপে উঠে গোপালগঞ্জের বাসিন্দা এসপি হাবিবসহ পুলিশের একটি সিন্ডিকেট।

এদিকে এ ধরনের জালিয়াতি করে নিয়োগ পাওয়া ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবলদের (টিআরসি) চিহ্নিত করতে সরকার নড়েচড়ে বসেছে। কারা, কীভাবে এ ধরনের নিয়োগ দিয়েছে এবং নিয়োগ দেওয়ার সময় কত ধরনের অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়-সেসব বিষয় চিহ্নিত করতে ১৫ মার্চ পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সব জেলার এসপিকে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে ছয় ধরনের নির্দেশনা দিয়ে এক মাস তথা ১৫ এপ্রিলের মধ্যে বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন পাঠাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত চিঠি যুগান্তরের হাতে এসেছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে-প্রথমত, ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে ভিন্ন জেলার প্রার্থীকে শুধু জমি ক্রয়ের ওপর ভিত্তি করে স্থায়ী নাগরিক হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে কি না। দ্বিতীয়ত, অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে কৌশলে পৃথক কক্ষে বিশেষ পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে কি না। তৃতীয়ত, প্রার্থী বা তার পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগযোগ্য বা নিয়োগ অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে কি না। চতুর্থত, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের মধ্যে অস্বাভাবিকতা অর্থাৎ লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর, কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে চাকরি পেয়েছেন কিনা। পঞ্চম, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে কি না। ষষ্ঠ, নির্দেশনায় বলা হয়, অসাধু পুলিশ সদস্য, দালাল ও প্রতারকচক্র তথা পরীক্ষার পরিবেশ বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কতটা তৎপর ছিলেন। এসব বিষয় অনুসন্ধানে ৬৪ জেলায় পুলিশ সুপারকে প্রধান করে ৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি করা হয়েছে। কমিটির অপর ৩ সদস্য হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), জেলা গোয়েন্দা কর্মকর্তা (ডিআইও-১) ও রিজার্ভ অফিসার-১/২।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ডিআইজি মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা জেলা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জে ভুয়া ঠিকানায় অনেক কনস্টেবলকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। এত পরিমাণ অভিযোগ পাচ্ছিলাম যে-নির্দিষ্ট কিছু জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা দেশেই কমিটি করে দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ভুয়া ঠিকানায় সবচেয়ে বেশি কনস্টেবল নিয়োগ করেছেন হাবিবুর রহমান। ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ঢাকার এসপি এবং পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজিও ছিলেন। এরপর পুলিশ হেডকোয়ার্টারে গুরুত্বপূর্ণ পদ ডিআইজি (প্রশাসন) পদটিও নিজের সার্ভিস ক্যারিয়ারে সংযুক্ত করেন। এছাড়া সর্বশেষ, সিনিয়র কয়েকজনকে ডিঙিয়ে অতি সৌভাগ্যবান হাবিবুর রহমান অতিরিক্ত আইজিপি হিসাবে ডিএমপি কমিশনার পদেও আসীন হন।

তিনি জানান, শেখ হাসিনার অতি আস্থাভাজন হিসাবে পরিচিত গোপালগঞ্জের এই প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে নিজস্ব বলয় তৈরি করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন ওই প্রভাবশালী বলয়ের মহাক্ষমতাধর। যে কারণে সব সময় তিনি পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তাদের কোনো পাত্তা দিতেন না। ভয়ে সিনিয়ররাও তাকে ঘাঁটতেন না। এ কারণে খোদ গোপালগঞ্জের তিন পুলিশ কর্মকর্তা পৃথক তিনটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিতেন। বাকি দুই গ্রুপের নেতা ছিলেন পুলিশের তৎকালীন আইজি বেনজীর আহমেদ ও এসবিপ্রধান মনিরুল ইসলাম।

প্রসঙ্গত, এভাবে ভয়াবহ জালিয়াতি করে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) নিয়োগ শুরু হয় ২০১২ সাল থেকে। নিয়োগ পাওয়া কনস্টেবলদের অনেকে ইতোমধ্যে পদোন্নতি পেয়ে এএসআই এবং এসআই হয়ে গেছেন। যারা সারা দেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের যেসব সদস্য দলীয় ক্যাডারের মতো ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়, তাদের মধ্যে এভাবে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যরা ছিলেন সামানের সারিতে।