Image description

পবিত্র ঈদ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। আনন্দ, পরিবার, নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবার আর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করেন সবাই। তবে এই আনন্দঘন দিনেও সমাজের একটি বড় অংশের মানুষ রয়েছেন, যাদের জন্য ঈদ মানেই বাড়তি দায়িত্ব, ব্যস্ততা আর কর্মব্যস্ত দিন। তাদের ত্যাগ আর পরিশ্রমের ওপরই নির্ভর করে অন্যদের ঈদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা।

ঈদের দিনেও ছুটি নেই এমন পেশাজীবীদের তালিকায় প্রথমেই আসে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নাম। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনের মতোই জরুরি সেবা চালু থাকে। দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে মানুষ ছুটে আসে হাসপাতালগুলোতে। তাই চিকিৎসকদের ঈদ কাটে অপারেশন থিয়েটার, ওয়ার্ড কিংবা জরুরি বিভাগেই। পরিবার থেকে দূরে থেকেও তারা মানুষের জীবন বাঁচানোর দায়িত্বে অটল থাকেন।

জেলা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, ঈদের দিনটাও আমাদের কাছে অন্য দিনের মতোই। রোগীদের সেবা দেওয়াই আমাদের প্রথম দায়িত্ব। পরিবারকে সময় দিতে না পারলেও মানুষের জীবন বাঁচাতে পারছি এটাই বড় পাওয়া।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ঈদের দিনে দায়িত্ব পালন করেন নিরবচ্ছিন্নভাবে। পুলিশ, র‍্যাব ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা মাঠে থাকেন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। ঈদের নামাজের জামাত, যানজট নিয়ন্ত্রণ, বাস-টার্মিনাল ও লঞ্চঘাটে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সবকিছুই তাদের দায়িত্বের অংশ।

ডিউটিতে থাকা এক পুলিশ সদস্য, কনস্টেবল আশরাফুল ইসলাম বলেন, ঈদের দিন পরিবারকে খুব মিস করি। কিন্তু দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। তাই কষ্ট হলেও ডিউটিতেই থাকতে হয়।

একইভাবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীরাও প্রস্তুত থাকেন যেকোনো দুর্ঘটনা মোকাবেলায়। ঈদের দিনেও অগ্নিকাণ্ড বা অন্যান্য দুর্ঘটনা ঘটতে পারে তাই তাদের জন্য নেই কোনো ছুটি।

গণমাধ্যমকর্মীদের জন্যও ঈদ মানেই কাজের দিন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঈদের জামাত, দুর্ঘটনা, ভ্রমণ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি সব খবরই মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সাংবাদিকরা কাজ করেন নিরবচ্ছিন্নভাবে।

একজন স্থানীয় সাংবাদিক শরিফ মিয়া বলেন, ঈদের দিনটা পরিবারের সঙ্গে কাটাতে ইচ্ছা করে। কিন্তু পেশাগত দায়িত্বের কারণে মাঠেই থাকতে হয়। মানুষের কাছে সঠিক খবর পৌঁছে দেওয়াই আমাদের কাজ।

পরিবহন খাতের শ্রমিকদেরও ঈদের দিনেও ব্যস্ততা থাকে। বাসচালক, হেলপার, ট্রেন ও লঞ্চের কর্মীরা যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে কাজ করে যান।

বাসচালক আব্দুল হালিম বলেন, আমরা কাজ না করলে মানুষ বাড়ি যেতে পারবে না। তাই ঈদের দিনও স্টিয়ারিং ধরতেই হয়। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করা হয় না, কিন্তু অন্যদের হাসি দেখেই ভালো লাগে।

এর পাশাপাশি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রহরীরা ঈদের দিনেও দায়িত্বে থাকেন। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিন-রাত পাহারায় থাকতে হয় তাদের। অফিস-আদালতের প্রহরী ও নৈশ প্রহরীরাও একইভাবে দায়িত্ব পালন করেন নিরবচ্ছিন্নভাবে।

শেরপুর সরকারি কলেজের প্রহরী মানিক মিয়া বলন, সবাই যখন ঈদে বাড়ি যায়, তখন আমরা ক্যাম্পাস পাহারা দেই। পরিবারকে সময় দিতে পারি না, কিন্তু দায়িত্ব তো পালন করতেই হবে।

অফিস সহকারীরাও অনেক ক্ষেত্রে ঈদের দিন দায়িত্ব পালন করেন, বিশেষ করে জরুরি প্রশাসনিক কার্যক্রম চালু থাকলে। একজন অফিস সহকারী, আজমল মিয়া বলেন, ছুটি থাকলেও অনেক সময় অফিসে আসতে হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাজের জন্য আমাদের উপস্থিতি জরুরি হয়ে পড়ে।

এছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ সংস্থার কর্মীরাও থাকেন সার্বক্ষণিক তৎপর। কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত সমাধানের জন্য তাদের প্রস্তুত থাকতে হয়। শহরের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরাও ঈদের দিন সকালে রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখার কাজে নিয়োজিত থাকেন, যাতে নগরবাসী পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ঈদ উদযাপন করতে পারেন।

হোটেল-রেস্তোরাঁ, শপিংমল ও বিনোদন কেন্দ্রের কর্মীদের জন্যও ঈদ একটি ব্যস্ত সময়। মানুষের আনন্দ আয়োজনকে পূর্ণতা দিতে তারাও কাজ করেন নিরবচ্ছিন্নভাবে।

সমাজের এ নীরব নায়করা নিজেদের ব্যক্তিগত আনন্দকে ত্যাগ করে অন্যদের ঈদকে আনন্দময় করে তুলছেন। তাদের এই অবদান অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়, কিন্তু বাস্তবতা হলো তাদের ছাড়া আমাদের ঈদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা অসম্ভব।

ঈদের দিনে যখন আমরা পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দে মেতে উঠি, তখন এই মানুষগুলোর কথা মনে রাখা উচিত যাদের ত্যাগে আমাদের উৎসব হয় আরও সুন্দর ও নিরাপদ।