Image description

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে কালক্ষেপণ করতে রাজি নয় নতুন গঠিত বিএনপি সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে দেশের কৃষিজীবী মানুষের ভাগ্য বদলাতে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে তারা। 

সোমবার (১৬ মার্চ ২০২৬) উত্তরের জেলা দিনাজপুরের কাহারোল থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশব্যাপী ‘খাল খনন কর্মসূচি ২০২৬’-এর উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন।

এই কর্মসূচির মাধ্যমে মূলত চার দশক আগের একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগের পুনর্জাগরণ ঘটতে যাচ্ছে।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যে খাল খনন কর্মসূচির সূচনা হয়েছিল, তারেক রহমানের নেতৃত্বে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক আঙ্গিকে সেটিই আবার রূপ পেতে যাচ্ছে। কিন্তু অতীত এবং বর্তমানের এই খাল খনন দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?

 

জিয়াউর রহমানের খাল খনন: যেভাবে উপকৃত হয়েছিল সাধারণ মানুষ

স্বাধীনতার পরপর দেশের কৃষি ব্যবস্থা মূলত বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্ষায় যেমন অতিবৃষ্টিতে ফসল তলিয়ে যেত, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে মাঠ ফেটে চৌচির হতো। এই সংকট কাটাতে ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হাতে নেন এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

তিনি নিজেই কোদাল হাতে নেমে পড়েছিলেন খাল খননে।

 

সেই সময় প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়েছিল। এর ফলে সাধারণ মানুষ নানাবিধ সুবিধা পেয়েছিল:

১. সবুজ বিপ্লব ও স্বনির্ভরতা: সেচ সুবিধার অভাবে যেসব জমিতে বছরে মাত্র একটি ফসল হতো, খাল খননের ফলে সেখানে একাধিক ফসল ফলানো সম্ভব হয়। এতে দেশে খাদ্য উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যা ‘সবুজ বিপ্লব’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

 

২. খরা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ: বর্ষায় অতিরিক্ত পানি খাল দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বন্যা ও জলাবদ্ধতার প্রকোপ কমে যায়। অন্যদিকে সেই জমানো পানি দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা অনায়াসে সেচকাজ চালাতে পারতেন।

৩. গ্রামীণ কর্মসংস্থান: খাল খনন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল, যা তখনকার ভঙ্গুর গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছিল।

তারেক রহমানের নতুন উদ্যোগ: জনগণ কী সুবিধা পাবে?

সময়ের পরিক্রমায় জিয়ার আমলে খনন করা অনেক খালই আজ ভরাট বা বেদখল হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন অসময়ে বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা, খাল ও জলাধার খননের মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

 

এই আধুনিক খাল খনন কর্মসূচির ফলে জনগণ যেভাবে লাভবান হবে:

১. আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক কৃষির প্রসার: বর্তমান সরকার শুধু খাল কেটেই বসে থাকবে না, খালের পানির বৈজ্ঞানিক ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। সংরক্ষিত পানি দিয়ে আধুনিক সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে, যা কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাবে এবং ফলন বাড়াবে।

২. বহুমাত্রিক গ্রামীণ অর্থনীতি (মাছ ও হাঁস পালন): খালগুলোতে সারা বছর পানি থাকলে তা শুধু কৃষিতেই নয়, বরং মাছচাষ এবং হাঁস পালনের মতো লাভজনক খাতেও বিপ্লব আনবে। এতে গ্রামীণ যুবকদের কর্মসংস্থান হবে এবং আমিষের চাহিদা মিটবে।

৩. প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা: দিনাজপুরের সাহাপাড়ায় যে ১২ কিলোমিটার খাল খনন করা হচ্ছে, শুধু এর ফলেই ওই এলাকার প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ বর্ষার অতিরিক্ত বন্যা ও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে।

৪. পরিবেশের ভারসাম্য ও বনায়ন: নতুন এই কর্মসূচিতে খাল খননের পাশাপাশি পাড় রক্ষা, বাঁধ নির্মাণ এবং ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ করা হবে। এটি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখবে।

সমন্বিত উদ্যোগ ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

পানিসম্পদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং বিএডিসির যৌথ উদ্যোগে প্রথম ধাপে দেশের ৫৪টি জেলায় এই কাজ শুরু হচ্ছে। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ যাতে শুধু কাগজে-কলমে বা দলীয় প্রভাবের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের মতে, এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে কাজ করতে হবে নদীর সঙ্গে খালের সংযোগ ও প্রবাহ ঠিক করে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং যেখানে জলাবদ্ধতা বেশি, সেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, খাল খননের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে যদি দখলদারদের কঠোর হস্তে দমন করা না হয়। রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ে কেউ যেন নতুন করে খাল দখল বা দূষণ করতে না পারে, সরকারকে সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর দিনাজপুর সফর

এই উদ্যোগের সূচনা করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোমবার সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছে সেখান থেকে দিনাজপুরের বলরামপুরে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে সাহাপাড়া খালের মাটি কেটে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। এরপর জনসভায় বক্তব্য রাখা, পারিবারিক কবর জিয়ারত এবং বিকেলে সুধী সমাবেশ ও ইফতার মাহফিলের মধ্য দিয়ে তার ব্যস্ত দিন কাটবে।

জিয়াউর রহমানের সেই কোদাল আর আজকের আধুনিক ড্রেজার-মাঝখানে কয়েক দশকের ব্যবধান। তবে উদ্দেশ্য একটাই-কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো। খাল দখলের রাজনীতি বন্ধ করে সরকার যদি এই মেগা প্রকল্প স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।