জ্বালানি সংকটে বন্ধ হওয়ার উপক্রম সারা দেশের লঞ্চ চলাচল। তেল না পাওয়ায় শুক্রবার রাজধানীর সদরঘাট থেকে ছাড়েনি বেশ কয়েকটি রুটের লঞ্চ। শনিবার তেল পাওয়া যাবে কিনা তারও কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেনি ঢাকার ফতুল্লার তেল ডিপোগুলো। এই অবস্থা চলতে থাকলে ঈদযাত্রায় ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন লঞ্চমালিকরা। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ঈদে বিশেষ সার্ভিস তো দূর, নিয়মিত সার্ভিসও দেওয়া যাবে না বলে তারা জানিয়েছেন। সংকট সমাধানে জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে জরুরি চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় লঞ্চ মালিক সমিতি ও নৌযানে তেল সরবরাহকারীদের সংগঠন রিভার ফুয়েল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন। এদিকে রোববার থেকে সব ধরনের গণপরিহণে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক, সেতু, রেল ও নৌ পরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। শুক্রবার রাজধানীর কমলাপুর রেল স্টেশনে ট্রেনের বিশেষ ঈদযাত্রা পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এ আশ্বাস দেন।
ঢাকার সদরঘাটকেন্দ্রিক জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী আবিদুর রহমান সাদ্দাম বলেন, ‘চলতি মাসের শুরু থেকেই চাহিদা অনুযায়ী তেল দিচ্ছে না ডিপোগুলো। প্রতি ট্যাংকারে ১০-১৫ হাজার লিটারের বেশি ডিজেল তারা দিচ্ছে না। অথচ একেকটি ট্যাংকারের ধারণক্ষমতা দেড় লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ লিটার। ফলে আমরা যারা নিয়মিত লঞ্চে তেল দেই তারা এখন আর তা দিতে পারছি না।’ লঞ্চ-জাহাজে তেল সরবরাহকারীদের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিভার ফুয়েল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশেনের সভাপতি জিএম সরোয়ার বলেন, ‘সদরঘাট থেকে দেশের ৩৮টি রুটে লঞ্চ চলে। এসব লঞ্চে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে আমাদের ১৬-১৭টি মিনি ট্যাংকার। নিয়মিত চলাচলে এই ঘাটের লঞ্চগুলোর দৈনিক দরকার পড়ে ২ থেকে ৩ লাখ লিটার ডিজেল। কিন্তু গত ৭-৮ দিন ধরে চাহিদার এক-চতুর্থাংশ তেলও পাচ্ছি না আমরা। এই নিয়ে ডিপো কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। তারপরও বাড়েনি তেল সরবরাহ। উপরন্তু শুক্রবার ডিপো থেকে এক ফোঁটা ডিজেলও দেওয়া হয়নি। আমরাও তেল দিতে পারিনি লঞ্চগুলোকে। শনিবারও নাকি দেওয়া হবে না তেল। এতে করে একদিকে যেমন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন রুটের লঞ্চ চলাচল তেমনি আমরাও মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়েছি।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাপ) সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. বদিউজ্জামান বাদল বলেন, ‘৩৮টি নৌপথে নিয়মিত চলাচল করে ৬০-৭০টি যাত্রীবাহী লঞ্চ। এসব লঞ্চের প্রতিদিন আড়াই থেকে ৩ লাখ লিটার তেল দরকার হয়। ঈদে বিশেষ সার্ভিসসহ দৈনিক ১৪০টি লঞ্চ চলবে। তেলের চাহিদাও বেড়ে হবে ৪-৫ লাখ লিটার। গত এক সপ্তাহ ধরে আমরা চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছি না। ফলে অনেক রুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাধ্য হয়ে কয়েকটি রুটে চালু করা হয়েছে রোটেশন পদ্ধতি। এতে করে যাত্রীরা পড়ছেন চরম দুর্ভোগে। রেশনিংয়ের তেলে তো আর লঞ্চ চলবে না। ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে বরিশালে গিয়ে ফেরত আসতে একটি লঞ্চের কমপক্ষে ৬ হাজার লিটার তেল লাগে। এখন আপনি রেশনিং করে যদি ৪ হাজার লিটার দেন, তাহলে তো লঞ্চ মাঝ নদীতে নোঙর করে বসে থাকতে হবে। আমরা এই বিষয়ে নৌ, রেল, সড়ক ও সেতুমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছি। ১১ মার্চ ওই চিঠি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সংকট সমাধানের কোনো উদ্যোগ দেখছি না। প্রতিমন্ত্রী নাকি রোববার বসবেন আমাদের সঙ্গে। এদিকে বৃহস্পতিবার থেকেই শুরু হয়ে গেছে সাধারণ মানুষের ঈদযাত্রা। অবস্থা যা তাতে শনিবার থেকে অধিকাংশ রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
তেল সংকটে বেশ কয়েকটি রুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ বলে জানিয়েছেন লঞ্চ মালিকরা। ঢাকা-ভোলা রুটে চলাচলকারী গ্রীনলাইন ওয়াটার ভেসেলের জিএম আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের ২টি ওয়াটার বাস চলাচল করে ঢাকা-ভোলা রুটে। জ্বালানি সংকটের কারণে কয়েকদিন ধরে একটি ওয়াটার বাস চালিয়েছি আমরা। শুক্রবার থেকে তাও বন্ধ হয়ে গেছে। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়া পর্যন্ত জাহাজ চালানো সম্ভব হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঢাকা থেকে ভোলা যাওয়া-আসায় ২ হাজার ৭শ থেকে ৩ হাজার লিটার ডিজেল দরকার হয় একেকটি জাহাজে। কিন্তু আমরা এখন দিনে এক হাজার লিটার ডিজেলও পাচ্ছি না।’ একই রুটে যানবাহন ও যাত্রী পরিবহণে নিয়োজিত কার্নিভাল ক্রুজের মালিক মাসুম খান বলেন, ‘ঢাকা-ভোলা রুটে প্রতিবার যাওয়া-আসায় ৪ হাজার লিটার ডিজেল লাগে আমাদের একেকটি জাহাজে। অথচ ৭ দিন মিলিয়েও আমরা ৪ হাজার লিটার তেল পাইনি। প্রতিদিন আমাদের দুটি করে জাহাজ চলত এই রুটে। আগে থেকে স্টকে থাকা তেল দিয়ে এ কদিন একটি জাহাজ চালিয়েছি। শুক্রবার সেই স্টকও শেষ হয়ে গেছে। তেল না পেলে শনিবার থেকে আর জাহাজ চালাতে পারব না।’ ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী সুন্দরবন নেভিগেশনের মালিক আকতার হোসেন আকেজ বলেন, ‘রাউন্ড ট্রিপে একটি লঞ্চে ৬ থেকে ৭ হাজার লিটার তেল লাগে। নিয়মিত চলাচলকারী আমাদের ৩টি লঞ্চে দৈনিক গড়ে ১৮ থেকে ২১ হাজার লিটার তেল লাগলেও বর্তমানে ১২-১৪ হাজার লিটারের বেশি পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে একটি বসিয়ে রেখে বাকি দুটি লঞ্চ দিয়ে সার্ভিস চালানো হচ্ছে। যে অবস্থা তাতে রোববার থেকে লঞ্চ চালাতে পারব কিনা সন্দেহ।’
ঢাকা-বরিশাল রুটের আরেক লঞ্চ কোম্পানি সুরভী নেভিগেশনের মালিক রিয়াজ উল কবির বলেন, ‘প্রতিবছর ঈদে স্পেশাল সার্ভিস দেন লঞ্চ মালিকরা। কিন্তু এবার তো নিয়মিত সার্ভিস চালু রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই নিয়ে সব মালিকরাই এখন টেনশনে। আমার লঞ্চগুলো তেল নেয় ঢাকার সরবরাহকারীদের কাছ থেকে। তারাও তেল দিতে পারছেন না। বৃহস্পতিবার মেঘনা পেট্রোলিয়ামের অফিসে গিয়েছিলাম। সেখান থেকেও ভালো কোনো উত্তর পাইনি। ডাবল ডেকার একটা লঞ্চে একসঙ্গে ৪-৫ হাজার মানুষ ভ্রমণ করেন। এই একটি লঞ্চের যাত্রী পরিবহণ করতে ১৫০-১৬০টি বাস লাগবে। তাছাড়া মধ্যবিত্ত আর দরিদ্র মানুষের জন্য সবচেয়ে সস্তা হচ্ছে লঞ্চযাত্রা। অথচ সেই লঞ্চে জ্বালানি সরবরাহ সঠিক রাখার বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। এখনই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা না নিলে ঈদযাত্রায় ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’
জ্বালানি তেল সরবরাহ বিষয়ে কথা বলার জন্য মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ফতুল্লা ডিপোর সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. শরিয়তউল্লাহ মিয়ার মোবাইলে বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে একই ডিপোর সুপারভাইজার জালাল উদ্দিন বলেন, ‘সদরঘাটে যে তেল যায় তা মূলত ফ্লোটিং পাম্প ও এজেন্টের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী এজেন্টদের মাধ্যমে তেল সরবরাহ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। তাছাড়া সড়কমন্ত্রী মহোদয় যেহেতু বলছেন যে রোববার থেকে গণপরিবহণে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হবে-তাই আশা করছি যে আর সংকট থাকবে না। আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।’