Image description
► আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে বিরোধী দলের ওয়াকআউট, হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড ► হট্টগোলের মধ্যে ভাষণ শুরু রাষ্ট্রপতির ► সংসদে ১৩৩ অধ্যাদেশ উত্থাপন ► প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করলেন খন্দকার মোশাররফ ► খালেদা জিয়া, মতিয়া চৌধুরীসহ ৩১ জনকে স্মরণে সংসদে শোকপ্রস্তাব

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের গতকাল প্রথম অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবসেই উত্তপ্ত ছিল জাতীয় সংসদ। রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন বিক্ষোভ করে বিরোধী দল। প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল-স্লোগান ও হট্টগোলের মধ্যে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটের সদস্যরা।

স্পিকারের আসন খালি রেখেই গতকাল বেলা ১১টায় সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। এমপিরা যথাসময়ে উপস্থিত থাকলেও স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে স্পিকারের আসন ছিল ফাঁকা। সংসদ সচিব কানিজ মওলার উপস্থাপনায় অধিবেশন শুরু হয়। পরে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাব অনুযায়ী বিএনপিদলীয় সিনিয়র এমপি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

অধিবেশনে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। অধিবেশনে শোক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়। ওই অধ্যাদেশগুলো যাচাইবাছাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর অধিবেশন আগামী রবিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।

সংসদ অধিবেশনে যোগদানের জন্য পূর্বনির্ধারিত সময়ের আগেই সংসদের অধিবেশন কক্ষে আসন গ্রহণ করেন এমপিরা। সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে সংসদে প্রবেশ করেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নির্ধারিত সময়ের ৫ মিনিট পর ১১টা ৫ মিনিটে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। শুরুতে সংসদ সচিব কানিজ মওলা সংসদ নেতাকে বক্তব্য দেওয়ার অনুরোধ জানান। স্বাগত বক্তব্য শেষে সংসদ নেতা তারেক রহমান অধিবেশনের প্রথম সেশনের সভাপতি হিসেবে দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন। তাঁর প্রস্তাব দলের পক্ষ থেকে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বিরোধী দলের পক্ষে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সমর্থন জানান।

তখন স্পিকারের আসনে যান সেশন সভাপতি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন শেষে ৩০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি করেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন ভোলা-৩ আসনের এমপি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন নেত্রকোনা-১ আসনের এমপি ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। সংসদ অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্বপালনকারী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সংসদকে জানান, দুটি পদে একটি করে মনোনয়ন জমা পড়েছে। তাঁরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেন। স্পিকার প্রস্তাবটি ভোটে দিলে তা কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালকে সংসদ সচিবালয়ের শপথকক্ষে শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শপথ গ্রহণ শেষে স্পিকারের আসনে যান নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি শুরুতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদ অধিবেশন পরিচালনার জন্য ৫ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলী (প্যানেল স্পিকার) মনোনীত করেন। তাঁরা হচ্ছেন মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমদ (ঢাকা-৮), গয়েশ্বর চন্দ্র রায় (ঢাকা-২), ড. আবদুল মঈন খান (নরসিংদী-১), মোহাম্মদ মনিরুল হক চৌধুরী (কুমিল্লা-৬) এবং এ টি এম আজহারুল ইসলাম (রংপুর-২)। পরে শোক প্রস্তাব উত্থাপন ও তা নিয়ে আলোচনা হয়।

অধিবেশনকক্ষে স্লোগান, বিরোধী জোটের ওয়াকআউট : অধিবেশন চলাকালে বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে সংসদের অধিবেশনকক্ষে রাষ্ট্রপতির আগমণবার্তা ঘোষণা করেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ সময় বিরোধী সদস্যরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এর মধ্যেই অধিবেশনকক্ষে প্রবেশ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি স্পিকারের ডান পাশে রাখা নির্ধারিত আসনের সামনে দাঁড়ান। তখন জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে এবং অধিবেশনকক্ষের মনিটরে জাতীয় পতাকা প্রদর্শিত হয়। সরকারদলীয় সদস্যরা দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানালেও বিরোধী জোটের সদস্যরা সম্মান না জানানোর উদ্দেশ্যে তাঁদের আসনে বসে পড়েন। প্রথমে বিরোধীদলীয় সদস্যরা বসে থাকলেও জাতীয় সংগীতের মাঝ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় সদস্যরাও দাঁড়ান।

জাতীয় সংগীত পরিবেশন শেষে নির্ধারিত আসনে বসেন রাষ্ট্রপতি। অন্যদিকে ‘জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না’, ‘জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বন্ধ কর’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন জামায়াত-এনসিপি জোটের সদস্যরা। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি জনগণ সইবে না। উই রিজেক্ট বিট্রেয়াল অব জুলাই। তারা রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করে ‘খুনি’, ‘কিলার চুপ্পু’, ‘ফ্যাসিস্ট চুপ্পু’, ‘গেট আউট চুপ্পু’ বলতে থাকেন। তাদের শৃখলা বজায় রাখার জন্য বারবার অনুরোধ জানান স্পিকার। আর রাষ্ট্রপতি তাঁর জন্য নির্ধারিত ভাষণ ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই হট্টগোলের মধ্যে বিএনপির কয়েকজন এমপি বলতে থাকেন, ‘আপনারা কাজটি ঠিক করছেন না, রাষ্ট্রপতি অর্ধেক মানছেন, অর্ধেক মানছেন না। তাঁকে অসম্মান করছেন।’ অধিকাংশ সরকারদলীয় সদস্য চুপচাপ বসে ছিলেন।

এ সময় বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. আবদুল্লাহ মো. তাহের, চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আবদুল্লাহর নেতত্বে বিরোধী সদস্যরা স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় তাঁরা বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ-গণতন্ত্র এক সাথে চলবে না’, ‘ফ্যাসিবাদের দোসররা, হুঁশিয়ার সাবধান’। তাঁরা টেবিল চাপড়াতে ও চিৎকার করতে থাকেন। বিক্ষোভকালে মাইক ছাড়াই বিরোধী দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে ইমপিচমেন্ট, পদত্যাগ ও গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান মাইক ছাড়াই বলেন, এই রাষ্ট্রপতি স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের সহযোগী, দালাল। এই সংসদে আমরা তাঁর ভাষণ মেনে নিতে পারি না।’ এ পর্যায়ে হাসনাত আবদুল্লাহ আসন ছেড়ে রাষ্ট্রপতির ডায়াসের দিকে তেড়ে যান। কিন্তু তাঁকে বাধা দেন বিরোধীদলীয় উপনেতা। তিনি দুই হাত প্রসারিত করে বিরোধীদলীয় সদস্যদের বাইরে নিয়ে যান। প্রায় চার মিনিট অচলাবস্থার পর রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণ শুরু করেন।

শোক প্রস্তাব উত্থাপন : অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও চব্বিশের গণ আন্দোলনে শহীদ ‘জুলাই যোদ্ধা’সহ দেশের ও বিশ্বের ৩১জন বিশিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়। শোক প্রস্তাব উত্থাপনকালে স্পিকার বলেন, ‘২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর আমরা হারিয়েছি তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়াকে। মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দেশের গণতন্ত্র রক্ষায় তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। সংসদ তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছে।’

অধ্যাদেশ উত্থাপন ও বাছাই কমিটি গঠন : অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা ও যাচাইবাছাইয়ের জন্য ১৪ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে জয়নাল আবদিনকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমদ, সালাহউদ্দিন আহমদ, নূরুল ইসলাম মনি, আসাদুজ্জামান, এম ওসমান ফারুক, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, আবদুল বারী, নওশাদ জমির, মুজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান ও জি এম নজরুল ইসলাম। স্পিকার এ কমিটির প্রস্তাব ভোটে দিলে সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটে তা অনুমোদিত হয়। কমিটিকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো যাচাইবাছাই করে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। 

সংসদসংশ্লিষ্ট চার কমিটি গঠন : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনে বিশেষ কমিটিসহ পাঁচটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে এসব কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয় এবং কণ্ঠভোটে তা অনুমোদন পায়। সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি ও সংসদ কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন স্পিকার। অন্যদিকে বিশেষ কমিটি, বিশেষ অধিকার-সম্পর্কিত কমিটি এবং বেসরকারি সদস্যদের বিল ও বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব-সম্পর্কিত কমিটির প্রস্তাব দেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। পরে সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটে সেগুলো অনুমোদিত হয়।

দর্শক গ্যালারিতে ড. মুহম্মদ ইউনূস, জুবাইদা রহমান ও জাইমা রহমান : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুর দিনে সংসদের চারপাশের দর্শক গ্যালারিগুলো ছিল আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ। সংসদ সচিবালয় বিশিষ্ট নাগরিক, কূটনীতিক, সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের আমন্ত্রণ জানায়।

স্পিকারের ডান পাশের গ্যালারিতে বসেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান, শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু, মেয়ে জাইমা রহমান এবং ছোট ভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিণী শামিলা রহমান সিঁথি। এ ছাড়া বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তাঁর স্ত্রী কানিজ ফাতেমা এবং জুবাইদা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান বিন্দুও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। ভিভিআইপি গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। বাঁপাশের গ্যালারিতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক, চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা, পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দারসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ গোলাম নাফিজকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রিকশায় করে হাসপাতালে নেওয়া রিকশাচালক নুর মুহাম্মদকেও দর্শক গ্যালারিতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে দেখা যায়।