জাতীয় সংসদে নিজের প্রথম ভাষণে বিভিন্ন গণআন্দোলন ও শহীদদের স্মরণ করেছেন সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। বক্তব্যে তিনি দেশের বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি ১১ জন শহীদের নাম উল্লেখ করেন।
বুধবার (১২ মার্চ) জাতীয় সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও জুলাই যোদ্ধাদের ওপর আনা শোকপ্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
ভাষণে নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি সময়ের ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস। এ সময় তিনি ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা, মোদিবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ের মোট নয়টি আন্দোলনের কথা তুলে ধরেন।
এছাড়া তিনি বক্তব্যে বিভিন্ন সময়ে নিহত ১১ জন শহীদের নামও স্মরণ করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন শরিফ ওসমান হাদী, আবু সাঈদ, আবরার ফাহাদ, ফেলানী খাতুন, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, স্বজন, শিশু আবদুল আহাদ ও রিয়া গোপ।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট—যা অনেকেই ‘৩৬শে জুলাই’ হিসেবে স্মরণ করেন। সেদিন শাহবাগ থেকে ছাত্রজনতার মিছিল নিয়ে আমি এবং আমার সহযোদ্ধারা এই জাতীয় সংসদের প্রাঙ্গণে এসেছিলাম। ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ শক্তির মধ্য দিয়ে আমরা এই মহান জাতীয় সংসদকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করেছিলাম। সেই দিনের আমাদের ভূমিকা ছিল বৈপ্লবিক। আজ ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে এই জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। এর জন্য মহান আল্লাহ তাআলার কাছে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সকল শহীদের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
মাননীয় স্পিকার, হাজারো শহীদের রক্তে রঞ্জিত এবং অসংখ্য আহত-পঙ্গু দেশপ্রেমিকের ত্যাগের ফসল এই সংসদ। আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই সব ভাই-বোনদের, যারা বুক উন্মুক্ত করে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন এবং আমাদের নতুন করে স্বাধীনতার স্বাদ দিয়ে নিজেরা স্মৃতিতে পরিণত হয়েছেন। আমরা মহান আল্লাহর কাছে তাদের শাহাদাত কবুলের জন্য দোয়া করছি। একই সঙ্গে আহত ও পঙ্গু জুলাই যোদ্ধা ভাই-বোনদের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা, আবেগ ও ভালোবাসা জানাই। তাদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি। তাদের অমূল্য রক্ত এবং অপরিসীম ত্যাগের ফলেই আজ আমরা সংসদ সদস্য হিসেবে এখানে বসতে পেরেছি।
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেন, মাননীয় স্পিকার, ‘২৪’ মানে শুধু একটি বছর নয়—এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। আমরা স্মরণ করছি ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার সংগ্রাম, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান। এই সব ঐতিহাসিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশ গৌরবের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। স্মরণ করছি পিলখানা হত্যাকাণ্ডের শহীদদের, শাপলা চত্বরের শহীদদের, মোদিবিরোধী আন্দোলনের শহীদদের এবং ফ্যাসিবাদী আমলে নিহত সকল মানুষকে। স্মরণ করছি ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ছাত্র-যুবকদের সাহসিকতাকে।
বিভিন্ন আন্দােলন সংগ্রমে শহিদদের স্মরণ করতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, স্মরণ করছি আমাদের সাহসী সহযোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদীকে, যিনি ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। আমরা তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। একই সঙ্গে শহীদ আবরার ফাহাদ এবং শহীদ ফেলানী খাতুনকেও স্মরণ করছি, যারা অন্যায় ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছেন। আমাদের সংগ্রামের সাথী শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ মুগ্ধ, শহীদ ওয়াসিব—তাদের স্মৃতি আজও আমাদের নাড়া দেয়।
চার বছরের শিশু আহাদ, ছয় বছরের শিশু রিয়াগোপসহ প্রায় দেড়শ শিশুও এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছে। পুলিশের এপিসি থেকে ফেলে দেওয়া শহীদ ইয়ামিন, আশুলিয়ায় জীবন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে মারা কিশোর শহীদ স্বজন—এমন অসংখ্য ঘটনার স্মৃতি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। স্মরণ করিয়ে দিতে চাই দশম শ্রেণির ছাত্র শহীদ আনাসের সেই চিঠির কথা। যা তিনি তার মাকে লিখেছিলেন, যদি একটি প্রতিবন্ধী কিশোর কিংবা সাত বছরের শিশু সংগ্রামে নামতে পারে, তবে আমি কেন ঘরে বসে থাকব? একদিন তো মরতেই হবে; তাই ভয়ে ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে বীরের মতো মৃত্যু বরণ করাই শ্রেয়। অন্যের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়াই প্রকৃত মানবতা।
মাননীয় স্পিকার, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া-এর দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। তার সংগ্রাম বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে অনুপ্রাণিত করেছিল। আমরা তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। আমি বিশ্বাস করতে চাই, আমরা যারা এই সংসদে বসার সুযোগ পেয়েছি, কেউই শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করব না। কারণ জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি আন্দোলন নয়; এটি নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা।
নহিদ ইসলাম বলেন, মাননীয় স্পিকার, আমরা বিচার চাই। জুলাই গণহত্যার বিচার চাই, শরিফ ওসমান হাদী হত্যার বিচার চাই, এবং বিগত সময়ের লুটপাট ও দুর্নীতির বিচার চাই। শেষে একটি কথা বলেই আমি শেষ করতে চাই। আজ সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের কারণেই আমরা এই সংসদে বসতে পেরেছি। তাই আমাদের প্রত্যাশা, কোনো ফ্যাসিস্ট বা ফ্যাসিবাদের দোসর যেন এই মহান সংসদকে কলুষিত করতে না পারে।