ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে অংশ না নেওয়ায় সৌদি আরবের তীব্র সমালোচনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। গত সোমবার তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রিয়াদসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই অভিযানে শরিক না হয়, তবে তাদের এর ‘পরিণাম’ ভোগ করতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে লিন্ডসে গ্রাহাম লেখেন, ‘আমার জানা মতে, এই অঞ্চলে সন্ত্রাস ছড়ানো ও সাতজন মার্কিন সেনাকে হত্যাকারী বর্বর ইরানি সরকারকে নির্মূল করার লড়াইয়ে সৌদি আরব তাদের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।’
লিন্ডসে পোস্টে প্রশ্ন তোলেন, ‘যে দেশ পারস্পরিক স্বার্থের লড়াইয়ে যোগ দিতে অনিচ্ছুক, তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কি কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি করা উচিত?’
গ্রাহামের এই পোস্টের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সেই তথ্যেরই সত্যতা মিলল, যা আগেই মিডল ইস্ট আই প্রকাশ করেছিল। আর তা হলো, রিয়াদ তাদের ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলার অনুমতি দেয়নি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেনটকম) সোমবার জানিয়েছে, ১ মার্চ সৌদি আরবে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলায় আহত আরও এক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। এ নিয়ে নিহত সৈনিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতে। ওই দিন সৌদি আরবে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি ও রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ অংশে হামলা চালিয়েছিল ইরান।
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের অন্যতম কট্টর সমর্থক ও রূপকার লিন্ডসে গ্রাহাম। গত মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে এই যুদ্ধে রাজি করানোর জন্য তিনি রিয়াদ সফর করেছিলেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রাহাম নিজেই তাঁর সফরের উদ্দেশ্য নিশ্চিত করেন।
তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, গ্রাহামের এই বক্তব্য ‘আগুনে ঘি ঢালার’ মতো কাজ করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো আগে থেকেই ক্ষুব্ধ যে, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষা করছে এবং প্রয়োজনীয় আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দিচ্ছে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতিসংঘ প্রতিনিধি জামাল আল-মুশারখ জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বারবার আলোচনা ও উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছি। আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি, আমাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানে কোনো হামলা চালানো যাবে না। তা সত্ত্বেও আমাদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত অনভিপ্রেত।’
সংঘাত শুরুর আগেই সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যুদ্ধ না করার অনুরোধ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধ শুরু হলে তাদের তেলক্ষেত্র ও অবকাঠামোগুলো আক্রান্ত হবে। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও কাতার এখন ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এরপরও লিন্ডসে গ্রাহাম বলছেন, ‘আশা করি উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) দেশগুলো এই লড়াইয়ে আরও সক্রিয় হবে। কারণ, এটি তাদের দোরগোড়ায় হচ্ছে। এখনই যদি সামরিক বাহিনী ব্যবহার না করেন, তবে আর কবে করবেন? আশা করি দ্রুতই আপনাদের অবস্থানের পরিবর্তন হবে। তা না হলে এর পরিণাম ভোগ করতে হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এমন এক যুদ্ধে জড়াতে চায় না, যা জেতার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের আছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে পা দিলেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো অটুট।
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানিদের গণ–অভ্যুত্থানের যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, তার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। উল্টো ট্রাম্পের আত্মসমর্পণের আহ্বানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আয়াতুল্লাহ খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করেছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘পুরো বিষয়টি অবিশ্বাস্য। মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র গত এক বছর ধরে এক কাল্পনিক জগতে পরিকল্পনা করেছে। উপসাগরীয় শাসকেরা ও স্বয়ং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ট্রাম্পকে এই পরিণতির বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছিল।’ সূত্র: মিডল ইস্ট আই
শীর্ষনিউজ/