Image description

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে ফেলানী হত্যা ও সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি আলাদা বিভাগ যুক্ত করার প্রস্তাব থাকলেও পরে তা রাখা হয়নি। কেন রাখা হয়নি, এ ব্যাপারে কথা বলেছেন জাদুঘরটির নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব।

‎দৃক পিকচার লাইব্রেরির আয়োজনে ‘জুলাই ৩৬: একটি জাদুঘর নির্মাণের গল্প’ শিরোনামে গোলাম কাসেম ড্যাডি লেকচারে দেওয়া বক্তব্যে তানজিম ওয়াহাব বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জাদুঘরে ফেলানী হত্যা ও সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি আলাদা বিভাগ যুক্ত করার প্রস্তাব ছিল। তবে পরবর্তীতে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন ওঠে— সীমান্ত হত্যা তো ১৯৭১ সালের পর থেকেই চলমান; তাহলে কীভাবে শুধু গত ১৬ বছরের সময়কে কেন্দ্র করে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে? এ কারণে শেষ পর্যন্ত ওই প্রস্তাবটি বাদ দেওয়া হয়।’

গতকাল ‎শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার দৃকপাঠ ভবনে লেকচারটি উপস্থাপন করেন তানজিম ওয়াহাব। এতে তিনি তুলে ধরেন, কীভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ‘গণভবন’ রূপান্তরিত হয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে পরিণত হলো, কেন এই পরিবর্তন জরুরি ছিল, কীভাবে এর বাস্তবায়ন হয়েছে এবং কীভাবে দেশের মানুষের আত্মত্যাগ ও কষ্টকে সামষ্টিকভাবে জাতীয় স্মৃতির অংশ হিসেবে ধারণ করা হয়েছে।

‎তিনি বলেছেন, ‘জুলাই জাদুঘরে প্রবেশের শুরুতেই একটি লেখা চোখে পড়ে— ‘বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই’। মূলত এই জাদুঘর কোনো স্মৃতিকাতরতা থেকে নয়, বরং প্রতিরোধের চেতনা থেকে নির্মিত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি স্থান বা স্পেস তৈরি করা, যেখানে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের আত্মসমালোচনার সুযোগ থাকবে।’

‎তিনি উল্লেখ করেন, ‘‘২০২৪ সালের জুলাইয়ে ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ পরে ‘লংমার্চ টু গণভবন’-এ পরিণত হয়েছিল। এই গণভবনকে ঘিরে মানুষের যেমন ক্ষোভ ছিল, তেমনি ছিল নানা প্রশ্ন। এটি কি শুধুই শেখ হাসিনার বাসভবন ছিল, নাকি অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহৃত হতো? সেখানে কি সরকারের নিপীড়ন ও অপরাধের কোনো চিহ্ন ছিল?”

‎তানজিম ওয়াহাব বললেন, শুরুতে যখন তাদের হাতে গণভবনের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়, তখন তারা সেখানে একটি ধ্বংসস্তূপ দেখতে পান—যার দেয়ালে দেয়ালে ছিল গ্রাফিতি এবং মেঝেতে ছড়িয়ে ছিল হাজারো গুরুত্বপূর্ণ নথি ও নথির অংশবিশেষ। তারা প্রথমেই সেসব সংগ্রহ, স্ক্যান ও সংরক্ষণ করে একটি আর্কাইভ তৈরি করেন। পরে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব উপাদান একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্কাইভে রূপ নেয়।

‎জাদুঘর নির্মাণের ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “এটিকে প্রচলিত অর্থে শুধু একটি জাদুঘর হিসেবে নয়, বরং একটি ‘মেমোরিয়াল’ হিসেবে ভাবা হয়েছে। এই জাদুঘর শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের গল্প তুলে ধরে না; একই সঙ্গে এটি একটি ফ্যাসিবাদী সরকারের ১৬ বছরের উত্থান ও পতনের সাক্ষ্য বহন করে।”

‎তিনি জানিয়েছেন, জাদুঘরের ওপরের তলায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং জুলাই যোদ্ধাদের স্মারক, অডিও, ভিডিও ও ছবি সংরক্ষণ করা হয়েছে। অন্যদিকে নিচতলায় তুলে ধরা হয়েছে বিগত সরকারের আমলে গুম, খুন ও হত্যার শিকার মানুষের গল্প, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি, আয়নাঘরের বিভিন্ন সাক্ষ্য ও প্রতিরূপ।

‎তিনি আরও বলেছেন, ‘এই জাদুঘরের প্রতিটি অংশ আলাদা আলাদা ভাবনা, স্পিরিট ও থিমকে ধারণ করে নির্মিত হয়েছে এবং এর কাজ এখনো চলমান।’

‎এই জাদুঘরকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এটিকে সেমিনার, আলোচনা, টক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের স্থান হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে স্কুলের শিক্ষার্থীরা এখানে আসছে, ইতিহাস দেখছে এবং ফ্যাসিবাদের বিভিন্ন অধ্যায় সম্পর্কে জানতে পারছে।

‎জাদুঘরের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এখানে একটি ‘হিলিং রুম’ তৈরির পরিকল্পনা ছিল। দীর্ঘ সময়ের সহিংসতা, ক্ষতি ও হারানোর যে ট্রমা মানুষের মধ্যে রয়েছে, তা মোকাবিলায় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেই এই উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল। তবে এখনো তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, যদিও এ নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে।

‎জাদুঘরের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্ত নয়। জাদুঘর নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত অনেক তরুণ শিক্ষার্থী ও গবেষক এখনো স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন, তবে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা এখনো যথাযথভাবে যুক্ত হতে পারেননি। জাদুঘরের সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু সবসময় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।’

‎তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘জাদুঘরটি এখনো নির্মাণ ও বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৭ একর এই জায়গাকে আরও বেশি জনবল, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও নতুন নতুন বিষয় সংযোজনের মাধ্যমে একটি কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্মৃতিস্থানে পরিণত করা সম্ভব।’

অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য দেন আলোকচিত্রী, অ্যাক্টিভিস্ট ও দৃকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল আলম। ছবি: আগামীর সময়অনুষ্ঠানের শুরুতে আলোকচিত্রী, অ্যাক্টিভিস্ট ও দৃকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল আলম গোলাম কাসেম ড্যাডিকে নিয়ে বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে দৃকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ধারাবাহিকভাবে শুরু হওয়া এই লেকচার সিরিজের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আলোকচিত্রের ইতিহাসে অগ্রণী ব্যক্তিত্ব গোলাম কাসেম ড্যাডির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানো হয়ে আসছে। তিনি যেমন একজন অসাধারণ আলোকচিত্রী ছিলেন, তেমন ছিলেন লেখক। ১০১ বছরে ই-মেইল ব্যবহার করে দেখিয়েছিলেন যে শেখার জন্য বয়স কোনো বাধা হতে পারে না।’

‎তানজিম ওয়াহাবকে নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘তানজিম একসময় পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের ছাত্র ছিলেন। পরে আলোকচিত্রী হিসেবে তার পরিচয়, সৃজনশীলতা ও নিরলস কাজের মধ্য দিয়ে তিনি আজ বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি পাঠশালার ভাইস-প্রিন্সিপাল এবং ইন্টারন্যাশনাল প্রোগ্রামের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।’