ঢাকা ও কলকাতা—ভৌগোলিক মানচিত্রে কাঁটাতারের এপারে-ওপারে থাকা দুটি শহর। ভাষা এক, আবেগের টানও এক। কিন্তু সাহিত্যের অন্দরমহলে এই দুই বাংলার লেনদেনের সমীকরণটা সব সময় সমান রেখায় চলেনি। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের আলোচনা উঠলে একটি নাম সবার আগে, সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ভেসে ওঠে। তিনি হুমায়ূন আহমেদ। এপার বাংলায় তাঁকে ঘিরে যে উন্মাদনা ছিল বা আজও আছে, তার তুলনা মেলা ভার। বইমেলায় তাঁর নতুন বইয়ের জন্য মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইন, বইয়ের দোকানে তাঁর প্রমাণ সাইজ কাটআউট—এসবই এদেশের চেনা দৃশ্য।
কিন্তু কাঁটাতারের সীমানা পেরিয়ে কলকাতার পাঠকের মনে হুমায়ূন আহমেদ কতখানি জায়গা জুড়ে আছেন? এ শহরের কোন বয়সিরা পড়েন তাঁর বই? আর বইপাড়ার ঠিক কোন ঠিকানায় মিলবে তাঁর সৃষ্টি? সেই প্রশ্নের সূত্র ধরেই কলকাতার প্রকাশক এবং বিভিন্ন বয়সের পাঠকদের কথাবার্তায় উঠে এল এক আকর্ষণীয় খতিয়ান।
কলকাতায় হুমায়ূন আহমেদের গ্রহণযোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তা নিঃসন্দেহে রয়েছে। তবে বাংলার বাঁধভাঙা উন্মাদনার সঙ্গে এর চরিত্রগত কিছুটা তফাত আছে। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্থা ‘দে'জ পাবলিশিং’-এর কর্ণধার শুভঙ্কর দে বলেন, হুমায়ূন আহমেদের বইকে ঘিরে যে পরিমাণ উন্মাদনা বাংলাদেশে আছে, আমাদের পশ্চিমবঙ্গে অতটা নেই। কিন্তু তবুও তিনি মারা যাওয়ার পরে তাঁর পাঠকের সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে, পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাঁর বইয়ের মধ্যে হিমুর বইয়ের চাহিদা আমাদের এখানে বেশি। মিসির আলি বলে আরেকটা সিরিজ আছে, সেটাও আমাদের এখানে জনপ্রিয় হয়েছে।
শুভঙ্কর দে আরও যোগ করেন, বাংলাদেশে তিনি নিজে যখন এসেছিলেন, তখন হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে পাঠকদের যে বিপুল উন্মাদনা দেখেছেন, তা পশ্চিমবঙ্গে সচরাচর চোখে পড়ে না। তবে তাঁর চলে যাওয়ার পর কলকাতার পাঠকদের মনে তাঁর লেখালেখির বিষয়বস্তু নিয়ে বড় কৌতূহল ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। যার ফলে এখন হুমায়ূন আহমেদের বই কলকাতায় ভালোই বিক্রি হয়।
প্রায় একই ধরনের মন্তব্য পাওয়া গেল কলকাতার প্রকাশনা সংস্থা ‘বৈভাষিক’-এর সঙ্গে যুক্ত অদ্বয় চৌধুরীর কথায়। তিনি এই জনপ্রিয়তার ধরনটিকে একটু অন্য চোখে দেখছেন। তাঁর মতে, গত ১০-১৫ বছরে বাংলাদেশে প্রকাশিত বই কলকাতায় অনেক বেশি সহজলভ্য হয়েছে এবং সে কারণেই হুমায়ূন আহমেদের পাঠকসংখ্যা ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী।
অদ্বয়ের ভাষায়, ‘আমার মনে হয় হুমায়ূন আহমেদ কলকাতায় জনপ্রিয় নিঃসন্দেহে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো সর্বগ্রাসী জনপ্রিয় হয়তো নন। যাঁরা শীর্ষেন্দু, সুনীল, সমরেশ, বুদ্ধদেব গুহ পড়ে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে হুমায়ূন আহমেদের চাহিদা প্রায় সমতুল। যেহেতু হুমায়ূন আহমেদ ভার্সেটাইল লেখক, সমস্ত বয়সি পাঠকদের জন্য এবং বিভিন্ন জনরা ধরে ধরে তাঁর লেখার সাম্রাজ্য বিস্তৃত, তাই পাঠকও নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। কিন্তু তারপরেও, বাংলাদেশের নিরিখে কলকাতায় তিনি হয়তো সেই অর্থে ‘ম্যাস’ লেখক নন, বরং তাঁর একটি স্থায়ী, নিবেদিত পাঠকগোষ্ঠী রয়েছে, যাঁদের আমরা ‘নিশ’ পাঠক বলি।
কলকাতার পাঠক কারা
কলকাতায় হুমায়ূন আহমেদের পাঠক কারা, এই প্রশ্নের উত্তরে শুভঙ্কর দে জানান, হুমায়ূনের পাঠকের একটা নির্দিষ্ট বয়সসীমা বা ‘এজ লিমিট’ চোখে পড়ে। নতুন প্রজন্মের পাঠকদের মধ্যেই তাঁর লেখা পড়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। মূলত ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সিদের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদের লেখার এক বিপুল গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।
এই তরুণ ও নতুন প্রজন্মের পাঠকদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, কেন তাঁরা হুমায়ূন আহমেদের লেখার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং চরিত্রগুলিকে কীভাবে নিজেদের মতো করে বিশ্লেষণ করেন।
কলকাতার পাঠক দিয়া ঘোষাল নিজেকে ‘নাইন্টিজ কিড’ (নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকের সন্তান) হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তিনি জানান, শুরুর দিকে দুই বাংলার শব্দচয়ন, উচ্চারণ বা কিছু ভাষাগত পার্থক্যের কারণে পড়তে সামান্য অস্বস্তি হলেও, হুমায়ূন আহমেদের গল্পের প্রবাহ এতটাই স্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় যে খুব দ্রুত সেই দূরত্ব কেটে যায়।
দিয়া ঘোষাল বলেন, ‘আমার প্রজন্মের, এমনকী আমার আগের কয়েকটি প্রজন্মের বহু ছেলের মধ্যেই হিমু হওয়ার এক অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা কাজ করেছে। হলুদ পাঞ্জাবি, উদাসীন জীবনদর্শন, সামাজিক নিয়মের প্রতি অনীহা এবং আবেগকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রবণতা—সব মিলিয়ে হিমু নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ সাহিত্যিক সৃষ্টি। কিন্তু বাস্তব জীবনে হিমুর মতো একজন মানুষ থাকা খুব সুখকর হবে বলে আমার মনে হয় না। ব্যক্তিগতভাবে হিমুকে কখনোই খুব রিলেটেবল মনে হয়নি, বরং আমার মনে হয়েছে অত্যন্ত ছন্নছাড়া, রহস্যময় এবং আবেগের দিক থেকে প্রায় অনুপস্থিত একজন মানুষ। কখনো কখনো মনে হয়, এই চরিত্রের প্রতি অতিরিক্ত মুগ্ধতা একটি প্রজন্মের অনেক তরুণের কাছে আবেগ প্রকাশ না করাকেই এক ধরনের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।’
হিমুর চেয়ে দিয়ার কাছে অনেক বেশি বাস্তবিক ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে ‘মিসির আলি’ চরিত্রটিকে। তাঁর মতে, যুক্তিবাদ, পর্যবেক্ষণশক্তি, মানব মন নিয়ে কৌতূহল এবং রহস্যের পিছনে ছুটে বেড়ানোর প্রবণতা মিসির আলিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, একই লেখকের কলম থেকে জন্ম নিয়েছে এমন দুটি চরিত্র, যাদের দর্শন, জীবনবোধ এবং ব্যক্তিত্ব—প্রায় সব দিক থেকেই একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত; অথচ দুজনেই সমানভাবে কালজয়ী এবং পাঠকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।
২৬ বছর বয়সি কলকাতার শিক্ষার্থী দীপান্বিতা মুখোপাধ্যায়ের জীবনে হুমায়ূন আহমেদের প্রবেশ ঘটেছিল লকডাউনের দিনগুলোতে, এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে। করোনার সময়ে যখন টেলিগ্রামের পাতা বিভিন্ন বইয়ের পিডিএফ কপিতে ছেয়ে গিয়েছিল, ঠিক তখনই তাঁর হাতে আসে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম’।
কলকাতার পাঠকদের সঙ্গে হিমুর সংযোগ নিয়ে দীপান্বিতার নিজস্ব একটা সংশয় রয়েছে। তিনি বলেন, ‘কলকাতার পাঠকরা হিমুর সঙ্গে কতটা রিলেট করতে পারেন এটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। হিমু বেশির ভাগটাই ফ্যান্টাসি। হুমায়ূনের ভাষার জাদুতে পাঠক বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের ঘরে ঘরে উপস্থিত হতে পারলেও কোথাও একটা দূরত্ব থেকেই যায় সামাজিক পরিকাঠামোগত পার্থক্যের জন্য। তবে হুমায়ূন আহমেদের লেখায় এক অদ্ভুত মাদকতা আছে। আমাদের সবার মনের মধ্যে থাকা বহু সুপ্ত ইচ্ছা আমরা খুঁজে পাই তাঁর লেখায়। এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারণ।’
পশ্চিমবঙ্গের আরেক শিক্ষার্থী ও পাঠক দেবদত্তা চেল জানান, তাঁর কাছে হুমায়ূন আহমেদ মানেই ‘হিমু’। কলকাতায় শরৎচন্দ্র, সুনীল বা শীর্ষেন্দুর একচেটিয়া জনপ্রিয়তার মধ্যে দেবদত্তা হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে জানতে পারেন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। তাঁর কথায়, একজন একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে তাঁর মনে হয়েছিল, হুমায়ূন আহমেদ কোনো না কোনোদিন তাঁর হাতে এসে পড়তই। কারণ তাঁর জনপ্রিয়তা আলাদা করে প্রমাণের প্রয়োজন হয় না।
কলকাতার কফি শপ বা চায়ের আড্ডার সংস্কৃতিতে হিমু চরিত্রটি কতটা প্রাসঙ্গিক? দেবদত্তার উত্তরটি ভারি সুন্দর—‘হিমু মূলত ঢাকার রাস্তাঘাট, রাত, চায়ের দোকান ও এক ধরনের অস্তিত্ববাদী ঘোরের চরিত্র। তাই তাঁর ভৌগোলিক বাস্তবতা বাংলাদেশকেন্দ্রিক। কিন্তু তাঁর যে বৈশিষ্ট্য—সমাজের প্রচলিত নিয়মকে প্রশ্ন করা, উদ্দেশ্যহীন হাঁটা, মানুষের সঙ্গে অদ্ভুত অথচ আন্তরিক সংযোগ—এসবের কোনো সীমান্ত নেই। কলকাতার চায়ের আড্ডা বা কফিশপের সংস্কৃতিতে একজন পাঠক যদি নিজেকে হিমুর সঙ্গে মিলিয়ে দেখে, তাহলে তা শুধু ফ্যান্টাসি নয়। সে হয়তো হিমুর মতো খালি পায়ে হাঁটবে না বা হলুদ পাঞ্জাবি পরবে না, কিন্তু উদ্দেশ্যহীনভাবে শহর ঘোরা, গভীর রাতের আড্ডা, জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলা, মানুষের গল্প শুনতে ভালোবাসা—এসবই মিলে যায় হিমুর সঙ্গে। ভাষার সহজতাই সব বিভেদ সহজেই মুছে দিয়েছে।
২৭ বছর বয়সি চলচ্চিত্র সমালোচক সৌমাল্য চট্টোপাধ্যায় হুমায়ূন আহমেদের পাঠকে একটু অন্য মাত্রায় বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি যখন স্কুল পাস করে ১৮-১৯ বছর বয়সে পা দেন, তখন নিছক অবসর কাটানো আর আনন্দের জন্য হুমায়ূন আহমেদের বই পড়া শুরু করেন। সৌমাল্য মনে করেন, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একাডেমিক বা ক্রিটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যারা ওপার বাংলার সাহিত্য পড়তে চান, তাঁদের জন্য হুমায়ূন আহমেদ হতে পারেন একটি চমৎকার ‘স্টার্টিং পয়েন্ট’।
সৌমাল্য তাঁর শুরুর দিনগুলির কথা মনে করে বলেন, ‘যখন আমি হুমায়ূন আহমেদকে পড়ছিলাম তখন সত্যিই ডমিনেন্সটা মূলত মেইনস্ট্রিম লিটারেচারই ছিল। বাংলাদেশের সাহিত্য বলতেও আমাদের ধারণা ছিল যে ওখানকার সাহিত্যজগৎ পুরোটাই হুমায়ূন আহমেদ দ্বারা পরিচালিত। পরবর্তী সময়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ দুজন লেখকের লেখার মাধ্যমে আমি বাংলাদেশকে চিনেছি—শহীদুল জহির এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। হুমায়ূন আহমেদ হয়তো ঠিক সেইভাবে বাস্তববাদী নিরিখে বাংলাদেশকে আমাকে চেনাতে পারেননি বটে, কিন্তু তিনি আমার কাছে পূর্ববঙ্গের সাহিত্যের একটা ইনট্রোডাকশন হিসেবে কাজ করেছিলেন। ওখানকার ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষার ব্যবহার বোঝার ক্ষেত্রে তিনি পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন।’
কলকাতার পাঠকদের হিমু সেজে ঘুরে বেড়ানো বা হিমুর সঙ্গে নিজেকে মেলানোর চেষ্টা প্রসঙ্গে সৌমাল্য একটু ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁর মতে, হিমু চরিত্রটির ভিত্তি চিরাচরিত বাস্তববাদে দাঁড়িয়ে নেই। কাফকা বা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের চরিত্রের মতোই হিমু আসলে কোনো সাধারণ চরিত্র নয়। সে একটি ‘আইডিয়া’ বা জীবনযাপনের বিশেষ দর্শন।
সৌমাল্য ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘হিমুকে নিয়ে কিছু অভ্যাস আমাদের মধ্যে দেখা যায়। যেমন হলুদ পাঞ্জাবি পরা, পাঞ্জাবিতে পকেট না রাখা ইত্যাদি। এটা সংস্কৃতির আদান-প্রদানে গড়ে ওঠে। এটা আসলে এক ধরনের মিমিক্রি বা পপুলার রিসেপশন। এটা কেউ করছে মানেই যে সে হিমুর ভেতরের দর্শনের সঙ্গে নিজেকে রিলেট করতে পারছে, তার কোনো মানে নেই। মহাশ্বেতা দেবীর ‘বসাঁই টুডু’র মতো চরিত্রের সঙ্গে কোনো বিপ্লবী নিজেকে মেলাতে পারেন, কিন্তু নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘ফ্যাতারু’ বা হুমায়ূন আহমেদের ‘হিমু’ চরিত্রগুলো মূলত একটা পার্টিকুলার ফিলোসফিকে প্রমোট করে। এদের উদ্দেশ্যটাই রিলেট করার নয়, বরং এক ধরনের দর্শনের মুখোমুখি দাঁড় করানো।’
ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিভাজন কীভাবে দুই বাংলার সাহিত্যের আদান-প্রদানকে প্রভাবিত করেছে, সেই বিষয়েও একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টি দেন সৌমাল্য চট্টোপাধ্যায়। দেশভাগের আগে তো আর এপার-ওপার বলে আলাদা কিছু ছিল না। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কারণে কাঁটাতারের যে বেড়া তৈরি হয়েছে, তা যেমন দক্ষিণ আমেরিকার স্প্যানিশভাষী দেশগুলোর মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেও একটা দূরত্ব তৈরি করেছে।
সৌমাল্যর ভাষায়, পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গের মধ্যেও যে দূরত্বটা তৈরি হয়েছে, সেটা যতটা না ভৌগোলিক দূরত্ব, তার চেয়ে অনেক বেশি মানসিক বা সাইকোলজিক্যাল ডিস্টেন্স। রাষ্ট্রব্যবস্থার এই নতুন ম্যাপিং আমাদের লিঙ্গুইস্টিকস, কালচার, রিলিজিয়নের দিক থেকে দূরে সরিয়ে এনেছে। আর ঠিক এই জায়গাতেই হুমায়ূন আহমেদ বা পূর্ববঙ্গের অন্যান্য লেখকেরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা এই মনস্তাত্ত্বিক গ্যাপটাকে ব্রিজ করার চেষ্টা করেন। আমাদের অতীতকে, আমাদের যৌথ সংস্কৃতি ও ভাষাকে নতুন করে রি-ইম্যাজিনের সুযোগ করে দেন। হিমু পড়ার মাধ্যমে কলকাতার নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের ভাষা, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে চিনতে পারছে। এটা এক ধরনের পলিটিক্যাল টাস্কও বটে।
ওটিটির যুগেও বইয়ের লাইনে কেন দাঁড়ায় তরুণ প্রজন্ম
আজকের যুগে নেটফ্লিক্স, হইচই বা বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিনোদন যখন হাতের মুঠোয়, তখন নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কেন এখনো বইয়ের দোকানে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের জন্য খোঁজ করে?
পাঠক দেবদত্তার মতে, ওটিটির যুগেও একটা বড় তফাত থেকে যায় বিনোদনের স্থায়িত্বে। একটি ওয়েব সিরিজ হয়তো কয়েক ঘণ্টার বিনোদন দিতে পারে, কিন্তু একটি প্রিয় বই বছরের পর বছর ধরে একজন পাঠকের মানসিক সঙ্গী হয়ে বেঁচে থাকে।
সৌমাল্য চট্টোপাধ্যায় আবার সাহিত্যের পদ্ধতিগত পার্থক্যের কথা মনে করিয়ে দেন। ভিজ্যুয়াল মিডিয়া আর সাহিত্যের আনন্দ সম্পূর্ণ আলাদা। ওটিটি বা সিনেমা মানুষের ফিজিক্যাল বা সোম্যাটিক সেনসেশন তৈরি করে। কিন্তু সাহিত্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। মানুষের স্বাভাবিক বিবর্তনের জন্য এই দুটি আনন্দেরই প্রয়োজন আছে। আর সেই কারণেই হুমায়ূন আহমেদের মতো জনপ্রিয় লেখকের বই লাইন দিয়ে কেনার তাড়না পাঠকদের মধ্যে চিরকাল ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
তাছাড়া কলকাতার পাঠকদের কাছে হুমায়ূন আহমেদকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন স্বয়ং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের বন্ধুত্বের অধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বেশ উজ্জ্বল। ফলে কলকাতার কফি হাউসের যে আড্ডায় সুনীল বা শীর্ষেন্দুকে নিয়ে আলোচনা হতে পারে, সেই একই আড্ডায় অবধারিতভাবেই চলে আসেন হুমায়ূন আহমেদও।
কলকাতার বইপ্রেমীদের জন্য সুখবর হলো, হুমায়ূন আহমেদের বই সংগ্রহের জন্য এখন আর শুধু বছরের নির্দিষ্ট সময়ে হওয়া বাংলাদেশ বইমেলার ওপর নির্ভর করে বসে থাকতে হয় না। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায় গেলেই অনায়াসে মিলবে হুমায়ূন আহমেদের বিপুল সম্ভার।
দেজ পাবলিশিংয়ের প্রধান সম্পাদক শুভঙ্কর দে কলকাতার পাঠকদের জন্য সেই সুনির্দিষ্ট ঠিকানার হদিশ দিলেন—‘দে’জ পাবলিশিংয়ে আমরা ওঁর বই সেভাবে নিজস্ব প্রকাশনা থেকে প্রকাশ না করলেও, আমাদের কাউন্টারে বা প্রকাশনীতে হুমায়ূন আহমেদের বই সবসময়ই পাওয়া যায়। বাংলাদেশ থেকে তাঁর যেসব বই প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো আমরা আনিয়ে রাখি পাঠকদের জন্য। পাশাপাশি, কলকাতা থেকেও বেশ কয়েকজন নামী প্রকাশক তাঁর বই প্রকাশ করেছেন। সেই বইগুলোও আমাদের প্রকাশনা থেকে পাওয়া যায়। যেমন—‘পত্রভারতী’ এবং ‘প্রতিভাস’ থেকে হুমায়ূন আহমেদের বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়াও ‘বৈভাষিক’ এবং কলেজ স্ট্রিটের বিভিন্ন বইয়ের দোকানে এখন সারাবছরই হুমায়ূন আহমেদের বই বেশ সহজলভ্য।
কলকাতায় হয়তো বাংলাদেশের মতো হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে মস্ত বড় কোনো হুজুগের সুনামি রোজ দেখা যায় না, কিন্তু ওই শহরের একটা বড় অংশের তরুণ ও মননশীল পাঠকের হৃদয়ে তাঁর জন্য একটা স্থায়ী আসন পাতা রয়েছে। হিমুর উদ্দেশ্যহীন মায়াবী হাঁটা আর মিসির আলির নিখাদ লজিক—দুই বাংলার মানসিক দূরত্বকে ঘুচিয়ে দিয়ে কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের তাকে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও জীবন্ত করে রেখেছে দুই বাংলার এই জাদুকরকে।