Image description

কুমিল্লায় ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে আইফোন ছিনিয়ে নিতেই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে তার বন্ধুরা। লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। খুনিদের সঙ্গে অপ্রতিমের বয়সের পার্থক্য ছিল। তারা সহপাঠী ছিল না; কিন্তু তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। প্রায় প্রতিদিনই তাদের আড্ডা-গল্প হতো। একসঙ্গে টিকটকও করত তারা। রোববার সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।

এদিন সকাল থেকেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্বজন ও এলাকাবাসী। যে মাঠে ছুটে বেড়াত অপ্রতিম, সেখানেই সকাল ১০টায় হলো তার প্রথম জানাজা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে মাঠের বাতাস। ছেলের কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমার একটাই ছেলে ও আপনাদের ভালোবাসায় বড় হয়েছিল।’ এরপর গন্ধমতি ঈদগাহে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বাড়ির পাশের কবরস্থানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হয় অপ্রতিম। মা ড. নাহিদা বেগম আদর করে ছেলেকে ডাকতেন ‘ঘণ্টু’। বিলাপ করে বলছিলেন, ‘ওর বই-খাতা আছে, বিছানায় জিনিসপত্র আছে, কিন্তু ও নেই। আমরা কীভাবে এই শূন্যতা মেনে নেব, জানি না।’

এদিকে আদরের অপ্রতিমকে অশ্রুসিক্ত বিদায়ের পর ঘাতকদের ফাঁসি এবং নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কয়েকশ শিক্ষার্থী। এ সময় স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মহাসড়ক।

আইফোনের জন্যই নির্জন পাহাড়ে খুন : পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে জানান, এ ঘটনায় তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলসহ মোট চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনার দিন শুক্রবার দুপুর ২টা থেকে সোয়া ২টার দিকে তুহিন অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা নামক স্থানে নিয়ে গিয়েছিল। লাশ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনাটি পর্যালোচনা করে তুহিনকে গ্রেফতার করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন স্বীকার করেছে, আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যই পরিকল্পিতভাবে অপ্রতিমকে পাহাড়ে নেওয়া হয়। সেখানে বিকাল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতিম বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। প্রথমে তুহিন এবং পরে তার আরেক বন্ধু ফাহাদ ও কামরুল শক্ত বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় জোরে আঘাত করে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তারা আইফোনটি নিয়ে পালিয়ে যায়। তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদ ও কামরুলকেও গ্রেফতার করা হয় এবং তুহিনের বাড়ি থেকে আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সুপার বলেন, তুহিন প্রথমে পুলিশকে ভুল পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আইফোন উদ্ধারে তিনটি স্থানে অভিযান চালানো হলেও সেখানে সেটি পাওয়া যায়নি। পরে তুহিনের স্বীকারোক্তি মতে বাসায় তার রুম থেকে আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সুপার আরও জানান, এছাড়াও সিয়াম নামের আরেকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তিনি জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি নিষ্পত্তির আবেদন করা হবে। ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো বিষয় জড়িত আছে কিনা তাও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখছি।

মেসেঞ্জারে ডেকে নেওয়া হয় : পুলিশ জানায়, শুক্রবার জুমার নামাজের পর অপ্রতিমকে কুমিল্লা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে দেখা যায়। পরে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করে তাকে এক ঘণ্টার জন্য বাইরে যাওয়ার কথা বলে ডেকে নেয় তুহিন। সিসিটিভি ফুটেজে বেলা সোয়া ৩টার দিকে তুহিনকে অপ্রতিমের সঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে দিয়ে সানন্দা এলাকার দিকে যেতে দেখা যায়। পরে অন্য পথ দিয়ে আরও কয়েকজন ওই এলাকার জঙ্গলের দিকে যায়।

ঘাতকরা ছিল বখাটে ও টিকটক বন্ধু : পুলিশ জানিয়েছে, নিহত অপ্রতিমের বয়স ১৩ বছর হলেও ঘাতকদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল এবং তারা মাঝেমধ্যে একসঙ্গে টিকটক করত। ঘাতকদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম তুহিন গত বছর কুমিল্লা সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে অকৃতকার্য হয়। মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ ও কামরুল ইসলাম ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আটক সিয়াম আবদাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র।

সবাইকে কাঁদিয়ে চিরনিদ্রায় অপ্রতিম : রোববার সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্বজনদের কান্নায় সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। জানাজার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান।

অপ্রতিমের বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার একটাই ছেলে। সামান্য একটা আইফোনের জন্য আমার ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে-একথা আমার মন কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না। আমি শুধু ঘাতকদের কঠোর বিচার চাই।

ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় কুবি শিক্ষক ড. নাহিদা বেগম। তিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। আর্তনাদ করে তিনি বলেন, আমি সারা জীবন জুলুম-অত্যাচারের প্রতিবাদ করেছি। কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি, এটা কি আমার অপরাধ? আমি তো কারও ক্ষতি করিনি। আমি এ হত্যাকাণ্ডের জবাব চাই। আমার বুক শূন্য। আমার সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে।’

অপ্রতিমের এক বন্ধু বলেন, শুক্রবারও অপ্রতিম আমাদের সঙ্গে নামাজ পড়েছিল। নামাজ পড়ার পর বলেছিল, সে বাড়িতে যাবে। এরপর বাড়িতে চলে যায়। কে জানত, সেটাই হবে তার সঙ্গে শেষ দেখা। বেলা ১১টায় গন্ধমতি ঈদগাহে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বাসার পাশের কবরস্থানে অপ্রতিমের লাশ দাফন করা হয়। এর আগে শনিবার রাতে ময়নাতদন্ত শেষে অপ্রতিমের লাশ গন্ধমতির বাড়িতে নেওয়া হয়। শেষবারের মতো তাকে একনজর দেখতে সেখানে ভিড় করেন স্বজন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।

মহাসড়ক অবরোধ, ৪ দফা দাবি : অপ্রতিম হত্যার দ্রুত বিচার ও ঘাতকদের ফাঁসির দাবিতে রোববার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। মিছিলে শিক্ষার্থীরা ‘জাস্টিস ফর অপ্রতিম’, ‘আমার ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিকুর রহমান বলেন, এ চিত্র শুধু কুমিল্লার নয়, সারা দেশের। আমরা ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফ ভূঁইয়া বলেন, এটা সম্পূর্ণই পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা।

জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে ফাঁসি নিশ্চিত করাসহ চার দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। অন্য দাবিগুলো হলো-নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকদের আবাসন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থতার কারণ দর্শানো।

অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা : অপ্রতিম হত্যায় শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে তার বাবা বাদী হয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম জানান, মামলায় আসামিদের নাম অজ্ঞাত হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শুক্রবার বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। এর প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরিবারকে সমবেদনা জানিয়েছেন জামায়াত আমির : অপ্রতিমের পরিবারকে ফোন করে সমবেদনা জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। রোববার সকালে তিনি মোবাইল ফোনো অপ্রতিমের বাবার সঙ্গে কথা বলে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

আদালতে ৩ ঘাতকের স্বীকারোক্তি : রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেগম আবিদা সুলতানা মলির আদালতে ঘাতক তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল ঘটনার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। কুমিল্লা আদালতের পরিদর্শক সাদিকুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। জবানবন্দিতে তারা তিনজনই অপ্রতিমকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। পরে আসামিদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।