প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জনে বাংলাদেশের জন্য তুরস্ক ভালো বিকল্প হতে পারে বলে মনে করেন আলাউদ্দীন মোহাম্মদ। তিনি ছাত্র নেতৃত্বের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক।
স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপে আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেছেন, তুরস্ক বা মালয়েশিয়ার সঙ্গে এনসিপির কোনো বিশেষ রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে প্রতিরক্ষা, মানবিক সহযোগিতা, শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে তুরস্কের সাম্প্রতিক সম্পর্কোন্নয়নের পদক্ষেপকে ইতিবাচক মনে করছেন তিনি।
এনসিপির এই নেতার মতে, দীর্ঘদিন ভারতের ওপর বাংলাদেশ মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশের জনগণও আর এই ধরনের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি চান না। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও বৈচিত্র্যময় করা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য এখন বড় প্রয়োজন একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যালাইনমেন্ট’। আমাদের এমন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে, যেখানে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক থাকবে। তবে জাতীয় স্বার্থ হবে সেসবের কেন্দ্রবিন্দু। পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। অর্থনীতিতে যেমন রপ্তানি বৈচিত্র্য প্রয়োজন, তেমনি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি জরুরি।
বাংলাদেশ সফরে এসে গত ৫ জুন রাতে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এনসিপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। বৈঠকে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে আরও অংশ নেন সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম আহ্বায়ক আতিক মুজাহিদ, যুগ্ম সদস্যসচিব ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক আলাউদ্দীন মোহাম্মদ, যুগ্ম সদস্যসচিব হুমাইরা নূর, রাফে সালমান রিফাত প্রমুখ।
বৈঠকের বিষয়ে আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা তুরস্কের কাছে বিশেষ কিছু দাবি করিনি। তাদের আশ্বস্ত করেছি– বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে তাদের যে নতুন সম্পর্ক ও বোঝাপড়া তৈরি হচ্ছে, সেটিতে আমরা ইতিবাচক। কারণ, পররাষ্ট্রনীতি কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়, রাষ্ট্রের। বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির উচিত রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সাধারণ অবস্থানে পৌঁছানো।
সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে স্থবির। বর্তমানে দুদেশই এটি এগিয়ে নিতে আগ্রহী। আঙ্কারার সঙ্গে যেসব কৌশলগত চুক্তি ও সহযোগিতার উদ্যোগ নিচ্ছে ঢাকা, সেগুলোর প্রশংসা করেছে এনসিপি। তুরস্কের পক্ষ থেকেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এনসিপি নেতাদের ভূমিকার প্রশংসা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, তুরস্ক রোহিঙ্গাদের প্রত্যর্পণ নিয়ে সক্রিয় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এনসিপি দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে তুরস্ক কীভাবে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে, সে বিষয়ে বৈঠকে আমরা আলোচনা করেছি।
তুরস্কের সঙ্গে সরকারের সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রসঙ্গে এনসিপির অবস্থান ব্যাখ্যা করে আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের আকাশসীমা ও সীমান্ত নিরাপদ রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ কারও সঙ্গে যুদ্ধ চায় না। কিন্তু আত্মরক্ষার সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। এতদিন আমরা চীন, ভারত ও রাশিয়ার সামরিক সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করেছি। ইউরোপীয় প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল হওয়ায়, সামরিক সরঞ্জামে তুরস্ক তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের জন্য কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতি হবে ঢাকাকেন্দ্রিক
এক প্রশ্নের জবাবে আলাউদ্দীন মোহাম্মদ জানান, তাদের প্রত্যাশা পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘ঢাকাকেন্দ্রিক’। ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ হবে কেন্দ্রবিন্দু এবং সেই স্বার্থের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন খাতে সম্পর্ক গড়ে উঠবে।
এনসিপির এই নেতার ভাষ্যে, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত, জ্বালানি ও বাণিজ্য সম্পর্ক থাকবে; চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতা; যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক; রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা থাকবে। সঙ্গে এখন তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গভীর হতে দোষ নেই।
এক্ষেত্রে তুরস্ক এবং মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশ শিখতে পারে বলে জানান তিনি, ‘তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে এনসিপির কোনো বিশেষ রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে আধুনিকতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে দেশ দুটি গুরুত্বপূর্ণ।’
আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, মালয়েশিয়া বাজার অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলেছে। আর তুরস্ক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশেও এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে ধর্মীয় গোঁড়ামি থাকবে না, ধর্মীয় মূল্যবোধকেও অস্বীকার করা হবে না। আধুনিকতা থাকবে। পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্য সুরক্ষিত থাকবে।
তিনি সাফ বলেন, আমরা তুরস্কের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে শিখতে চাই। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সহযোগিতা বা হস্তক্ষেপ আমরা চাই না। তুরস্ক কিংবা মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আরও বেশি বৃত্তি, গবেষণা, অ্যাকাডেমিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হোক– আমরা এটিই চাই।