জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদের। তিনি বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছোট ভাই। তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি নির্বাচন, জাতীয় পার্টির অবস্থান, নতুন সরকার ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিষয়ে নিজের মতামত জানান।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন রাহাত রূপান্তর।
এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর এখন আপনার সময় কেমন কাটছে?
জি এম কাদের: বর্তমানে বেশ ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। আমরা রাজনৈতিকভাবে দলকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার কাজ করছি। আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো, বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির। এমন একটি টালমাটাল সময়ে রাজনীতিতে একটা স্থিতিশীলতা থাকা খুব জরুরি ছিল। নির্বাচন হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে এটি সঠিক অর্থে নির্বাচন হয়নি। এটি আসলে একটি ‘বাছাইকরণ’ বা সিলেকশন ছিল। আমরা বিভিন্নভাবে দেখেছি যে আমাদেরকে অত্যন্ত অন্যায়ভাবে এবং সুপরিকল্পিতভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং করে নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমাদের কাছে সব ধরনের যৌক্তিক প্রমাণ আছে। তবুও দেশের বৃহত্তর স্থিতিশীলতার স্বার্থে আমরা অনেক কিছু মেনে নিয়েছিলাম। কারণ, বিশ্ব পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত জটিল। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের উত্তেজনার ফলে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই অস্থিরতা অনেকটা ভূমিকম্পের কম্পনের মতো। এই অনিশ্চয়তার মাঝে আমাদের বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি এই কম্পনে ধ্বংস হয়ে যাব নাকি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব? আমরা সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতার কথা বলেছি, যাতে সবাই মিলে দেশটাকে একটি স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়া যায় এবং মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
এশিয়া পোস্ট: জাতীয় পার্টির বর্ধিত সভায় আপনি নেতাকর্মীদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন—‘জাতীয় পার্টি কি আছে?’ আপনার নিজের কাছেই জানতে চাই, জাতীয় পার্টি আসলে আছে?
জি এম কাদের: এই প্রশ্নটি আমি একটি বিশেষ কারণে করেছিলাম। নির্বাচনের পর থেকেই পরিকল্পিতভাবে একটি প্রচারণা চালানো হচ্ছিল যে জাতীয় পার্টি আর থাকবে না, জাতীয় পার্টিতে কেউ যাচ্ছে না। কিছু সংবাদপত্র উদ্দেশ্যমূলকভাবেই এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিল যাতে আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। আমি যখন মাঠে গিয়েছি। বিশেষ করে রংপুরে আমার এলাকায়, সেখানে আমি সাধারণ মানুষের যে বিপুল সাড়া পেয়েছি, তা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের সময় দেখা গেল আমাদের জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং দেশজুড়ে আমাদের ভোট দেখানো হয়েছে মাত্র ১ শতাংশের নিচে। পরবর্তীকালে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতরাই আমাদের জানিয়েছেন যে, আমরা হারিনি বরং আমাদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার পর নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের গভীর হতাশা তৈরি হয়েছিল। আমার প্রশ্নটি ছিল তাদের সেই জড়তা কাটাতে। যুদ্ধের ময়দানে সৈনিক যদি মনোবল হারিয়ে ফেলে তবে সে মৃত সৈনিকের সমান। আমি দেখতে চেয়েছিলাম আমার কর্মীরা এখনও জীবিত ও সজীব আছে কি না। আমি আনন্দিত যে সারা দেশ থেকে আসা নেতাকর্মীদের মধ্যে আমি সেই প্রাণের স্পন্দন দেখতে পেয়েছি। জাতীয় পার্টি শক্তিশালীভাবেই টিকে আছে এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
এশিয়া পোস্ট: আপনি বলছেন ষড়যন্ত্র করে হারানো হয়েছে। এই ষড়যন্ত্র আসলে কারা করেছে এবং আপনার এই দাবির ভিত্তি কী?
জি এম কাদের: এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত নির্বাচন। কাকে হারানো হবে আর কাকে জেতানো হবে তা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। নির্বাচনের আগে থেকেই বিভিন্ন সংস্থা বা এজেন্সির মাধ্যমে আমরা খবর পাচ্ছিলাম যে আমাদের নির্বাচনে নেওয়া হবে ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফেল করিয়ে দেওয়া হবে। আমরা বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। কারণ, আমাদের জনসমর্থনের ওপর বিশ্বাস ছিল। কিন্তু নির্বাচনের দিন আমরা দেখলাম সরকারি উদ্যোগে প্রিসাইডিং অফিসার, আনসার ও পুলিশ মিলে ব্যালটে সিল মেরেছে। এমনকি আমাদের আসল ফলাফল বদলে দিয়ে জাল ফলাফল শিট তৈরি করা হয়েছে। ঢাকায় ফেরার পর এই কাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তার নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে আমাকে খবর পাঠিয়েছেন যে, আমাকে পরিকল্পিতভাবে হারানো হয়েছে এবং তারা এর জন্য দুঃখিত। সুতরাং এটি কোনো ধারণা নয়, এটি ধ্রুব সত্য যে আমাদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: এই ষড়যন্ত্রের অভিযোগের তির আসলে কার দিকে? সে সময় তো অন্তর্বর্তী সরকার ছিল, এখন বিএনপি ক্ষমতায়। আপনি সুনির্দিষ্টভাবে কাকে দায়ী করছেন?
জি এম কাদের: দেখুন, ক্ষমতায় তখন যারা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিংটা মেইনলি তারাই করেছেন। প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সারা দেশে একইভাবে এই কারচুপি করা হয়েছে। কাকে কোথায় পাস করানো হবে তা আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। এটি এত বড় পরিসরের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ছিল যে সরকারের মদদ ছাড়া এটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমার মনে হয়, বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার লক্ষ্যেই তারা এটি করেছিলেন। এর ফলে দেশে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেই, আমাদেরও মাঠে আসতে দেওয়া হচ্ছিল না; এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষের মনে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে দেশ কি কোনো সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে চলে যাচ্ছে কি না। বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা, খেলাধুলা বা গান-বাজনার মতো স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে কি না, তা নিয়ে মানুষ ভয়ে ছিল। আমরাও চেয়েছিলাম একটি মধ্যপন্থি দল ক্ষমতায় আসুক, যাতে স্থিতিশীলতা ফেরে। কিন্তু নির্বাচনের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত ভীতিকর। আমাদের প্রার্থীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ভোটারদের আসতে দেওয়া হয়নি। প্রচুর টাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার করা হয়েছে। এমন নির্বাচনকে কোনোভাবেই ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ বলা যায় না। ইতিহাসে এমন একতরফা নির্বাচন কখনো পূর্ণ মেয়াদে টিকতে পারেনি। শেখ হাসিনার বিদায়ই এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
এশিয়া পোস্ট: রংপুর জাতীয় পার্টির দুর্গ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে আপনারা ফল বিপর্যয় ঠেকাতে পারলেন না কেন?
জি এম কাদের: প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের কারণে এটি ঠেকানোর ক্ষমতা আমাদের ছিল না। নির্বাচনের আগে থেকেই আমাদের প্রতীক ‘লাঙ্গল’ নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হয়েছিল, আমাদের প্রার্থীদের হয়রানি করা হয়েছিল। প্রচারণা চালানো হচ্ছিল যে জাতীয় পার্টি পাস করবে না। কিছু সংবাদমাধ্যমও নেতিবাচক আবহাওয়া তৈরি করেছিল। অথচ আমার এলাকায় মানুষ গিজগিজ করছিল, সাংবাদিকরা নিজেরা দেখেছে আমার জয়ের সম্ভাবনা কতটা উজ্জ্বল ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আমাদের ছিটকে দেওয়া হলো। আসলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এখনও খুব নাজুক অবস্থায় আছে। গত সরকারের মতো এখনও গণমাধ্যমগুলো এক ধরনের ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ বা স্ব-আরোপিত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। আমার অনেক বক্তব্য বা লেখা এখন মূলধারার গণমাধ্যমে ছাপা হতে দেওয়া হচ্ছে না। সত্য কথা যাতে জনগণের কাছে না পৌঁছায় তার জন্য এখনও একটি পরিকল্পিত চেষ্টা চলছে। মানুষ মনে করছে এক শাসকের পরিবর্তে অন্য শাসক এসেছে, কিন্তু মৌলিক পরিবর্তন কিছু হয়নি। অনেকে তো আশঙ্কা করছেন যে বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আবার কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি ফিরে আসে কি না।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই আন্দোলন নিয়ে আপনার এবং জাতীয় পার্টির দলীয় অবস্থান আসলে কেমন ছিল?
জি এম কাদের: জুলাই আন্দোলন ছিল মূলত বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি লড়াই। ৩ জুলাই পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে আমি স্পষ্টভাবে বলেছিলাম যে এটি শুধু কোটা সংস্কার নয়, এটি বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলন। বাঙালি জাতি কখনো বৈষম্যের কাছে মাথানত করেনি এবং এবারও করবে না। আমাদের দলীয় নির্দেশ ছিল স্টুডেন্ট ফ্রন্ট সরাসরি ব্যানার নিয়ে নামবে এবং বাকিরা সাধারণ মানুষের কাতারে শামিল হবে। রংপুরে আমাদের দুজন কর্মী এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন, অনেকেই গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আন্দোলনের পর এখন সাধারণ মানুষের মুখে ভিন্ন কথা শোনা যাচ্ছে। অনেকে বলতে শুরু করেছেন—‘আগের সরকারই ভালো ছিল’। এই কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং ভয়াবহ। মানুষ যখন নিরাপত্তার অভাবে ভোগে এবং পেটের ক্ষুধা মেটাতে পারে না, তখনই তারা এমন কথা বলে। বর্তমান সরকারের আমলে জানমালের নিরাপত্তা নেই, দ্রব্যমূল্য সাধারণের নাগালের বাইরে। মানুষ যখন বর্তমানকে প্রত্যাখ্যান করে অতীতকে শ্রেয় মনে করে, তখন জুলাই আন্দোলনের চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতাকে আবার বাড়িয়ে দিতে পারে, যা আমরা চাই বা না চাই—এটিই বাস্তবতা।
এশিয়া পোস্ট: শেখ হাসিনার সঙ্গে আপনার একটি ফোনালাপ নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এই যোগাযোগের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল?
জি এম কাদের: আমি একজন রাজনৈতিক নেতা, উনিও একজন রাজনৈতিক দলের প্রধান। আমি উনার মন্ত্রিসভায় ছিলাম, আমাদের মধ্যে পারিবারিক পরিচয়ও আছে। রাজনৈতিক শিষ্টাচারের খাতিরে যে কোনো সময় যে কারও সঙ্গে কথা হতে পারে। অতীতে তারেক রহমান বা অন্যান্য নেতারাও এমন যোগাযোগ রাখতেন। এই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে অপরাধ হিসেবে দেখা বা শাস্তি দেওয়া ঠিক নয়। তবে বর্তমানে আমি নতুন করে কোনো আলাপ করার পরিবেশ বা প্রয়োজন দেখছি না। কারণ, এখন যেভাবে পুলিশ বা রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ বিচার হচ্ছে, তা নিয়ে অনেক আইনি প্রশ্ন আছে। ৫ আগস্টের আগেও যেমন হত্যাকাণ্ড হয়েছে, ৫ আগস্টের পরেও কিন্তু সুপরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট শ্রেণিকে লক্ষ্য করে হামলা ও হত্যা চালানো হয়েছে। গাজী টায়ার্সের ঘটনা বা বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘু ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ—এগুলোও তো অপরাধ। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্য যদি স্বচ্ছ না হয় এবং একেকটি শ্রেণিকে নির্মূল করার ঘোষণা দিয়ে কাজ করা হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য শুভ নয়।
এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগ যদি আবার রাজনীতিতে ফিরে আসে, তবে জাতীয় পার্টি কি তাদের সঙ্গে জোট করবে?
জি এম কাদের: রাজনীতি হলো দাবার চালের মতো, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে বাস্তব কথা হলো, আওয়ামী লীগকে কোনোভাবেই ধ্বংস করা যাবে না। পাকিস্তান আমলেও তারা টিকে ছিল। বর্তমানে তাদের প্রতি জনসমর্থন হয়তো কমেছে, কিন্তু তাদের একটি বিশাল সাংগঠনিক শক্তি আছে। দেশে প্রায় ১১ কোটি ভোটার ভোট দিতে পারেনি, যাদের মধ্যে একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগের সমর্থক হতে পারে। এত বড় একটি জনসমর্থিত দলকে বাইরে রেখে দেশে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব নয়। যারা আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার কথা ভাবছেন, তারা আসলে বাস্তবতাবর্জিত স্বপ্নের মধ্যে আছেন। গণতন্ত্র মানে হলো সবাইকে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া এবং জনমতের ভিত্তিতে জয়-পরাজয় মেনে নেওয়া।
এশিয়া পোস্ট: জাতীয় পার্টিকে অনেকেই ‘আওয়ামী লীগের বি টিম’ বলে সমালোচনা করেন। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
জি এম কাদের: আমরা এই অপপ্রচারের জবাব দিই সত্য দিয়ে। জুলাই আন্দোলনে আমাদের যে সাহসী ভূমিকা ছিল, তা আমার লেখা বই এবং বিভিন্ন ডকুমেন্টে স্পষ্ট আছে। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় সমালোচক ছিলাম আমরাই। ৩ জুলাই আমিই পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের কথা বলেছিলাম। এই আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের নেতাকর্মীরা রাজপথে ছিল। যারা আমাদের বি টিম বলেন, তারা আসলে সত্য গোপন করেন। আমাদের ত্যাগ এবং জনমুখী রাজনীতিই প্রমাণ করে আমরা কোনো দলের পকেট সংগঠন নই।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমান সরকারের সংস্কার কার্যক্রম এবং সংবিধান পরিবর্তন নিয়ে আপনার অবস্থান কী?
জি এম কাদের: সংস্কার আমরা চাই, তবে তা হতে হবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেককে বাদ দিয়ে কোনো সংস্কার করলে তা কোনোদিনই টিকবে না। আমি সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে অনেক আগে থেকেই লিখে আসছি। কারণ, আমাদের বর্তমান সংবিধান একনায়কতন্ত্র তৈরি করে। কিন্তু সংস্কারের নামে যদি ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা করা হয় বা জনগণকে ধোঁকা দিয়ে ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের মতো কোনো প্রহসন করা হয়, তবে তা হবে বিপজ্জনক। যে কোনো পরিবর্তন দেশের বেশির ভাগ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে, অন্যথায় ক্ষমতার পরিবর্তন হলেই সেই সংস্কার আবার বদলে যাবে।
এশিয়া পোস্ট: জাতীয় পার্টির শক্তির উৎস আসলে কোথায়?
জি এম কাদের: আমাদের শক্তির উৎস হলো জনগণ। আমরা সবসময় সঠিক পথে থাকার চেষ্টা করেছি। ২০১৪ সালের নির্বাচন আমরা বয়কট করেছিলাম, এমনকি আমাকে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী করার অফার দেওয়া হলেও আমি তা গ্রহণ করিনি। কারণ, আমরা সবসময় জনগণের আস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলাম। মানুষ জানে যে আমরা ভালো কাজ করেছি এবং বিপদের সময় তাদের পাশে ছিলাম। এই আস্থাই আমাদের এখনও টিকিয়ে রেখেছে।
এশিয়া পোস্ট: তরুণ প্রজন্ম নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী এবং সাধারণ মানুষের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
জি এম কাদের: তরুণদের প্রধান সমস্যা হলো কর্মসংস্থানের অভাব। আমরা চাই এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ যেখানে পেশিশক্তি বা লাঠিয়াল বাহিনী তৈরির রাজনীতি থাকবে না। ১৯৯০ সালের পর থেকে ছাত্র রাজনীতিকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, যা আমরা বন্ধ করতে চাই। আমি তরুণদের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে চাই। সাধারণ মানুষের প্রতি আমার একটাই কথা—আপনাদের অধিকার আদায়ে সচেতন হোন। অধিকার ছাড়া বেঁচে থাকা হলো দাসের মতো জীবন। দেশ আপনার, দেশের সম্পদ আপনার। নিজের পাওনা বুঝে নিন এবং প্রয়োজনে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকুন।
এশিয়া পোস্ট: আপনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে স্মরণীয় কোনো ঘটনা জানতে চাই।
জি এম কাদের: ১৯৯৬ সালে আমি যখন প্রথম এমপি নির্বাচিত হই, তখন এক গভীর রাতে একজন অতি সাধারণ দরিদ্র মানুষ আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। সবাই তাকে বাধা দিলেও তিনি দাবি করেছিলেন—‘আমি ভোট দিয়েছি, আমি কথা বলবই’। আমি যখন বেরিয়ে এসে তার কথা শুনলাম, তখন বুঝলাম মানুষের এই যে ভোট দেওয়ার অধিকার এবং জবাবদিহিতা চাওয়ার সাহস—এটিই গণতন্ত্রের প্রাণ। এটি আমার রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা যে জনগণের কাছে জবাবদিহি করাই একজন রাজনীতিবিদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
এশিয়া পোস্ট: ধন্যবাদ আপনাকে।