আল জাজিরা’র বিশেষ নিবন্ধ
চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের মধ্যে চলতি সপ্তাহে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। উল্লেখ্য, এই সংঘাতের জের ধরে ইতোমধ্যে সাইপ্রাসে অবস্থিত ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়াও ওই অঞ্চলে সামরিক "সরঞ্জাম" পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে, তবে তারা ঠিক কী পাঠাচ্ছে তা সুনির্দিষ্ট করে জানায়নি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ অভিযান 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-এর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ শুক্রবার সপ্তম দিনে গড়িয়েছে এবং ইরান, ইসরায়েল ও ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশে ক্রমাগত হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত ক্রমশ তীব্র আকার ধারণ করছে।
ইউরোপের কোন কোন দেশ মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সহায়তা পাঠাচ্ছে?
যুক্তরাজ্য:
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইরানে 'প্রতিরক্ষামূলক' হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কথা জানানোর পর সোমবার রাতে সাইপ্রাসের আকরোতিরিতে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা হয় বলে জানিয়েছেন দ্বীপরাষ্ট্রটির (সাইপ্রাস) প্রেসিডেন্ট ও ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা "সাইপ্রিয়ট অংশীদারদের ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে" পূর্ব ভূমধ্যসাগরে দুটি ওয়াইল্ডক্যাট হেলিকপ্টারের পাশাপাশি 'এইচএমএস ড্রাগন' (HMS Dragon) নামে একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে।
মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রয়্যাল নেভির ছয়টি 'টাইপ-৪৫' আকাশ প্রতিরক্ষা ডেস্ট্রয়ারের মধ্যে একটি হলো এইচএমএস ড্রাগন। এতে 'সি ভাইপার' মিসাইল সিস্টেম যুক্ত আছে, যা ১০ সেকেন্ডের কম সময়ে আটটি মিসাইল নিক্ষেপ করতে পারে এবং একই সাথে ১৬টি মিসাইলের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে দিতে সক্ষম। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ডাউনিং স্ট্রিটে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, যুক্তরাজ্য কাতারের প্রতিরক্ষায় সহায়তা করতে আরও চারটি টাইফুন ফাইটার জেট (যুদ্ধবিমান) পাঠাবে।
ফ্রান্স:
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ মঙ্গলবার জানান, এই সংঘাত ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে ফ্রান্স একটি বিমানবাহী রণতরী (এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার) ভূমধ্যসাগরে পাঠাচ্ছে। ইউরোপের সীমান্ত পেরিয়ে এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করার একদিন পর টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, "আমি বিমানবাহী রণতরী শার্লস ডি গল, এর আকাশযান (যুদ্ধবিমান) এবং সুরক্ষায় থাকা ফ্রিগেটগুলোকে ভূমধ্যসাগরের দিকে রওনা হওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।"
ম্যাখোঁ আরও জানান, ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ সাইপ্রাসের আকরোতিরিতে ব্রিটিশ বিমান ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোন হামলার একদিন পর তিনি সেখানেও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছেন। তিনি বলেন, "আমি অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং একটি ফরাসি ফ্রিগেট, 'ল্যাংডক', পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা আজ সন্ধ্যায় সাইপ্রাস উপকূলে পৌঁছাবে।"
গ্রিস:
গ্রিস দুটি ফ্রিগেট এবং চারটি এফ-১৬ ফাইটার জেট সাইপ্রাসে পাঠিয়েছে। তারা ক্রিট দ্বীপের 'সুদা বে'-তে অবস্থিত তাদের সামরিক ঘাঁটিও যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।
ইতালি:
রোম জানিয়েছে, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং স্পেনের পাশাপাশি তারাও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সাইপ্রাসে 'নৌ সরঞ্জাম' পাঠাবে। ইতালি উপসাগরীয় অংশীদারদের 'আকাশ-প্রতিরক্ষা, অ্যান্টি-ড্রোন এবং অ্যান্টি-মিসাইল সিস্টেম' দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ইতালীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এই সহায়তার মধ্যে 'এসএএমপি/টি' (SAMP/T) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো বলেছেন, বর্তমান চুক্তির আওতায় "যুদ্ধে অংশ নেবে না এমন উড়োজাহাজগুলোর লজিস্টিক্যাল বা আনুষঙ্গিক সহায়তার" জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইতালির বিমান ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে পারবে।
পর্তুগাল:
পর্তুগাল সরকার নির্দিষ্ট কিছু শর্তে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে আজোরেসে অবস্থিত তাদের 'ল্যাজেস' ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টিনিগ্রো বুধবার বলেন, এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে এই শর্তে যে, "এই অভিযানগুলো প্রতিরক্ষামূলক বা পাল্টা আক্রমণমূলক হতে হবে, সেগুলো প্রয়োজনীয় এবং আনুপাতিক হতে হবে এবং এর লক্ষ্যবস্তু হবে শুধুই সামরিক স্থাপনা।"
স্পেন:
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ট্রাম্পের সাথে এক উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে এই যুদ্ধের প্রতি তার সরাসরি বিরোধিতার কথা স্পষ্ট করেছেন। ইরানে হামলার সাথে সম্পর্কিত মিশনের জন্য স্পেনের সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে না দেওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির সাথে সব বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দিয়েছিলেন। এরপর মঙ্গলবার স্পেন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত।
তবে এসবের পরও স্পেন জানিয়েছে যে, সাইপ্রাস রক্ষায় সাহায্য করার জন্য তারা তাদের সবচেয়ে অত্যাধুনিক ফ্রিগেট, ক্রিস্টোবাল কোলন, পাঠাবে। বৃহস্পতিবার স্পেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই যুদ্ধজাহাজটি "সুরক্ষা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা প্রদান করবে" এবং "বেসামরিক নাগরিকদের যে কোনো ধরনের সরিয়ে নেওয়ার (ইভাকুয়েশন) কাজে সহায়তা করবে।"
ইউরোপীয় দেশগুলো কেন এমনটা করছে?
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক থাকা সত্ত্বেও, ইউরোপীয় দেশগুলো মূলত সাইপ্রাস এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে (যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে) থাকা পশ্চিমা মিত্রদের ওপর হামলার কারণে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে।
মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের সামরিক মোতায়েনের ঘোষণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে স্টারমার বলেন, তার দেশ "সাইপ্রাসের নিরাপত্তা এবং সেখানে অবস্থানরত ব্রিটিশ সামরিক কর্মীদের রক্ষায় পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।" এক্স-এ (সাবেক টুইটার) তিনি লেখেন, "আমরা সব সময় যুক্তরাজ্য এবং আমাদের মিত্রদের স্বার্থে কাজ করব।"
তবে বৃহস্পতিবার ডাউনিং স্ট্রিটে এক সংবাদ সম্মেলনে স্টারমার জানান, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি অভিযানে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তে তিনি এখনও অটল রয়েছেন। তার এই প্রাথমিক প্রত্যাখ্যানের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেছিলেন, "আমরা এখানে উইনস্টন চার্চিলের সাথে কাজ করছি না।"
ম্যাখোঁ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে অভিযানের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন: "যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে গিয়ে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আমরা কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারি না।" তবে তিনি আরও যোগ করেন, "এই পরিস্থিতির জন্য প্রধানত দায়ী ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।" এর কারণ হিসেবে তিনি দেশটির "বিপজ্জনক" পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রক্সি বা ছায়া গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া এবং জানুয়ারি মাসে বিক্ষোভের সময় "নিজেদের জনগণের" ওপর গুলি চালানোর নির্দেশকে উল্লেখ করেছেন।
ম্যাখোঁ আরও জানান, সংঘাত শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফরাসি বাহিনী 'আত্মরক্ষার্থে' ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কাতার, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা অবিলম্বে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি এবং সংঘাতের প্রথম প্রহরে আমাদের মিত্রদের আকাশসীমা রক্ষায় আত্মরক্ষার্থে ড্রোন ভূপাতিত করেছি; যারা জানে যে তারা আমাদের ওপর নির্ভর করতে পারে।"
আর কোন দেশ মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে?
বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ দেশটির পার্লামেন্টে জানান, আটকে পড়া নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার ফ্লাইটের সমন্বয় করার পাশাপাশি তিনি মধ্যপ্রাচ্যে "সামরিক সরঞ্জাম" মোতায়েন করবেন। আলবানিজ ওই সরঞ্জাম সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে বলেন, "সহকর্মী অস্ট্রেলিয়ানদের সাহায্য করার জন্য যারা বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে যাচ্ছেন, আমি সেসব অস্ট্রেলিয়ানকে ধন্যবাদ জানাই।"
শুক্রবার অস্ট্রেলীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্সের সি-১৭এ (C-17A) গ্লোবমাস্টার এবং কেসি-৩০এ (KC-30A) মাল্টি-রোল ট্যাংকার ট্রান্সপোর্ট। তবে সরকার এগুলো বর্তমানে কোথায় আছে তা প্রকাশ করেনি বলে জানিয়েছে তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সামরিক বিশ্লেষক আল জাজিরাকে বলেন: "অস্ট্রেলিয়া ঐতিহ্যগতভাবেই এ ধরনের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করে এসেছে। আমার মনে হয় তাদের এই সহায়তা বেশ সীমিত, তবে এটি মূলত ইরানের সরকারের পতন ঘটানোর এবং তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির হুমকি দূর করার সামগ্রিক লক্ষ্যের প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সমর্থনকেই তুলে ধরে।"
সূত্র : আল জাজিরা