Image description

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান এবং কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক রাডার ব্যবস্থায় সফল হামলার দাবি করেছে ইরানের সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপি-র বরাত দিয়ে শুক্রবার এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

আইআরজিসি-র নিজস্ব সংবাদ ওয়েবসাইট ‘সেপাহ নিউজ’-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, তাদের ড্রোন ও মিসাইল ইউনিট অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই হামলা পরিচালনা করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জর্ডানে মোতায়েন করা মার্কিন উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাড)-এর রাডার এবং কাতারে অবস্থিত মার্কিন কৌশলগত আর্লি ওয়ার্নিং রাডার এফপিএস-১৩২ (যাকে ‘ডেজার্ট আই’ বলা হয়) সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।’ মার্কিন বার্তা সংস্থা সিএনএন-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে জানানো হয়েছে, জর্ডান, কাতার, সউদী আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত বেশ কয়েকটি মার্কিন রাডার স্থাপনা সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সুরক্ষাবলয় মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।

প্রতিবেদনে জানা গেছে, কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত অত্যাধুনিক এএন/এফপিএস-১৩২ আর্লি–ওয়ার্নিং রাডারটি ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সউদী আরবের এএন/টিপিওয়াই-২ রাডার সাইট সরাসরি হামলার শিকার। রাডার রাখা যে হ্যাঙ্গারটি, সেটি হামলার পর সম্পূর্ণ পুড়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। জর্ডানের মুওয়াফ্ফাক সালতি এয়ার বেসে অবস্থিত এএন/টিপিওয়াই-২ রাডার সাইট সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত, স্যাটেলাইট ছবিতে ক্ষতি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত মার্কিন একটি সাইটের নিকটে থাকা এএন/টিপিওয়াই-২ রাডার ও থাড–সম্পর্কিত স্থাপনা হামলার শিকার হয়েছে। পার্শ্ববর্তী ভবনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত।

রেইথিওন কোম্পানির তৈরি এই রাডারগুলো মূলত ‘থাড’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চোখ হিসেবে কাজ করে। এটি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন শনাক্ত করে সেগুলোকে ধ্বংস করার সংকেত পাঠায়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাঁচটি বড় ট্রেলারে রাখা এই রাডার ব্যবস্থার অধিকাংশ অংশই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মোতায়েন থাকা এই রাডারটি সম্ভবত মার্চের শুরুর দিকে হামলার শিকার হয়। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র আটটি ‘থাড’ ব্যাটারি কার্যকর রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মিত্রদের সুরক্ষায় এই ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই রাডারগুলো অকেজো হয়ে পড়ার অর্থ হলো ওই অঞ্চলের আকাশসীমা এখন অনেকটা অরক্ষিত।

হরমুজ প্রণালী ছেড়ে পালাল মার্কিন বিমানবাহী রণতরী : ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ড্রোন বহরের ধাওয়ায় পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর কাছ থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’। গতকাল ইরানের পক্ষ থেকে এমন দাবি করা হয়েছে। ইরানি সংবাদ সংস্থা মিজান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসির খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, মার্কিন রণতরীটি হরমুজ প্রণালীর প্রায় ৩৪০ কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছিল। সে সময় ইরানি নৌবাহিনীর ড্রোনগুলো সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করলে রণতরীটি পিছু হটে। তবে এ ঘটনার বিষয়ে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

ইরানে ১৬০ স্কুলছাত্রী হত্যায় জড়িত থাকতে পারে যুক্তরাষ্ট্র : ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরে একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভয়াবহ বিমান হামলায় অন্তত ১৬০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। হামলার শিকার হওয়া শিশুদের অধিকাংশেরই বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী ইরানে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করার প্রথম দিনেই এই রক্তক্ষয়ী ঘটনাটি ঘটে। দক্ষিণ চীন মর্নিং পোস্ট (ঝঈগচ) এবং রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন তদন্তকারীরা প্রাথমিকভাবে মনে করছেন যে এই প্রাণঘাতী হামলার জন্য মার্কিন বাহিনীই দায়ী হতে পারে। তবে পেন্টাগন বা মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এখনও চূড়ান্তভাবে এর দায় স্বীকার করেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুইজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র বা বোমা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে স্কুলটিতে আঘাত হেনে থাকতে পারে। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কুলটির পাশেই ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর একটি নৌঘাঁটি অবস্থিত। ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন বাহিনী ওই নৌঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানোর সময় ভুলবশত স্কুল ভবনটি ধসে পড়ে। স্যাটেলাইট চিত্র এবং ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, দোতলা বিশিষ্ট ‘শাজারেহ তাইয়েবেহ’ স্কুল ভবনটির অর্ধেকেরও বেশি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দরে হামলা : আমেরিকা ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রতিশোধ হিসেবে ইসরাইলের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার বেন গুরিয়ান বিমানবন্দরে সরাসরি মিসাইল হামলা চালিয়েছে ইরান। ইসরাইলি গণমাধ্যম ও ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (ওজএঈ) নিশ্চিত করেছে যে, তেহরান থেকে ছোঁড়া শক্তিশালী ‘খোররামশাহর-৪’ ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো তেল আবিবের উপকণ্ঠে অবস্থিত এই বিমানবন্দরে আঘাত হেনেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক ডজন ড্রোন এবং মিসাইল নিয়ে চালানো এই বড় ধরনের অভিযানে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।
আগ্রাসন চালিয়ে যেতে সাহায্য চাইছেন ট্রাম্প : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, কূটনৈতিক অঙ্গনেও নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক মন্তব্য করেছেন, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। তিনি জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে প্রয়োজন হলে যেকোনো দেশের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা নিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল ব্হৃস্পতিবার (৫ মার্চ) সংবাদ সংস্থা রয়টার্স-কে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে তিনি কি ইউক্রেন-এর সহায়তা নেবেন। জবাবে ট্রাম্প বলেন, “অবশ্যই। যেকোনো দেশ থেকে যেকোনো ধরনের সহায়তা আমি গ্রহণ করব।” তার এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ইরানবিরোধী অভিযানে মিত্র জোট সম্প্রসারণের পথে হাঁটতে পারে ওয়াশিংটন।

ভারতকে রুশ তেল কেনার অনুমতি দিল যুক্তরাষ্ট্র : বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা কমাতে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ভারতকে বড় ধরনের ছাড় দিল যুক্তরাষ্ট্র। মাঝসমুদ্রে আটকে থাকা রুশ তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলো থেকে তেল খালাস ও ক্রয়ের জন্য ভারতীয় শোধনাগারগুলোকে ৩০ দিনের বিশেষ অনুমতি দিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। গতকাল এক বিবৃতিতে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের প্রবাহ সচল রাখতেই এই সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) তিনি উল্লেখ করেন, ‘বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ট্রেজারি বিভাগ ভারতীয় শোধনাগারগুলোকে রুশ তেল কেনার জন্য ৩০ দিনের একটি অস্থায়ী লাইসেন্স প্রদান করছে।’

ইরানের সম্পদ জব্দ করতে পারে সংযুক্ত আরব আমিরাত : সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের ভূখ-ে থাকা ইরানি সম্পদ জব্দ করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ক এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ইরানের প্রবেশাধিকার মারাত্মকভাবে সংকুচিত হবে। মূলত ইরানের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ করাই এই সম্ভাব্য পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য।

আরও ২০৮ জন ইরানি নাবিককে উদ্ধার করেছে শ্রীলঙ্কা : শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে একটি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, আইআরআইএস বুশেহর নামের একটি ইরানি জাহাজ কলম্বো বন্দরের কাছে এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন এলাকায় নোঙর করা রয়েছে। তিনি জানান, জাহাজটি শ্রীলঙ্কার জলসীমায় প্রবেশের অনুমতি চেয়েছে এবং জাহাজের ক্রুদের উদ্ধার করে তীরে আনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শ্রীলঙ্কায় ইরানি দূতাবাস ও শ্রীলঙ্কা সরকারের মধ্যে আলোচনার পর ক্রুদের উদ্ধারের সিদ্ধান্ত নেন সংশ্লিষ্ট জাহাজের অধিনায়ক। সূত্র : মিডর ইস্ট মনিটর, সিএনএন, আল-জাজিরা, ডন।