এপির বিশ্লেষণ
বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থান। ২০১৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক যুদ্ধকে আখ্যা দিয়েছিলেন “বড়, মোটা ভুল” হিসেবে। নির্বাচনী সমাবেশে বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র আর “অন্তহীন যুদ্ধে” জড়াবে না। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত সেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকেই এখন নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
হামলা কেন?
প্রশাসনের দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের জন্য তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছিল। ট্রাম্প বলেছেন, ইরান চুক্তির কাছাকাছি গিয়ে “পিছু হটেছে” এবং দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলজুড়ে মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন-হুমকি কি সত্যিই আসন্ন ছিল? কংগ্রেসের কিছু ডেমোক্র্যাট সদস্য বলছেন, এ হামলা সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়েছে এবং যথেষ্ট জনসমর্থন বা ব্যাখ্যা ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বনাম বাস্তবতা
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ দর্শনের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল দেশীয় অর্থনীতি ও সীমান্ত নিরাপত্তায় অগ্রাধিকার, বিদেশি যুদ্ধে কম সম্পৃক্ততা। কিন্তু ইরানে হামলা দেখাচ্ছে, প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগে তিনি পিছপা নন বরং বেশ আগ্রহী।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির এক দ্বৈত চরিত্রকে সামনে এনেছে-একদিকে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী ভাষ্য ব্যবহার করেন, অন্যদিকে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ভূরাজনৈতিক বার্তা দেন।
রাজনৈতিক প্রভাব
যদিও রিপাবলিকানদের বড় অংশ প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়িয়েছে তবে দলের ভেতরেই মতভেদ আছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি যুদ্ধে জড়ানোর বিরোধিতা করে আসা নেতারা সতর্ক করেছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে তা রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা ইতোমধ্যে কংগ্রেসে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব আনার কথা বলছেন।
জনমত কী বলছে?
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, অনেক আমেরিকান ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের বিচারে উচ্চমাত্রার আস্থা রয়েছে এমন মতের হার তুলনামূলক কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিকভাবে ‘জাতীয় ঐক্য’ প্রভাব তৈরি হলেও যদি মার্কিন হতাহত বাড়ে বা সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, জনমত দ্রুত বদলাতে পারে।
অর্থনৈতিক ঝুঁকি
ইরান মধ্যপ্রাচ্যের একটি বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ এবং হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ। সংঘাত বিস্তৃত হলে তেলের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়া রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্প বলেছেন, অভিযান “যতদিন প্রয়োজন” চলবে। তবে স্পষ্ট রূপরেখা এখনো প্রকাশ হয়নি—এটি কি সীমিত প্রতিরোধমূলক হামলা, নাকি বৃহত্তর কৌশলের অংশ?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কৌশল হতে পারে সময়ক্ষেপণ করে টিকে থাকা। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান হামলা শুধু একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শন, সাংবিধানিক ক্ষমতার ব্যবহার, নির্বাচনী হিসাব এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নকে একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।