Image description

ইরানে ‘মেজর কমব্যাট অপারেশন’ বা বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছেন। মার-এ-লাগো রিসোর্ট থেকে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প বলেন, মার্কিন বাহিনী এই ‘দুষ্ট ও কট্টরপন্থী একনায়কতন্ত্র’ নির্মূল করতে একটি বিশাল অভিযান চালাচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে ধুলোয় মিশিয়ে দেব। অভিযান শেষে ইরানি জনগণই তাদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেবে।’

ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই তেহরানে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে, যার প্রথম লক্ষ্যবস্তু ছিল সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয়। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে এটিই আমেরিকার বৃহত্তম সামরিক সমাবেশ। তবে প্রশ্ন হলো, দুই দশক আগের ইরাক যুদ্ধের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে ট্রাম্প কি একটি মসৃণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করতে পারবেন?

সামরিক দিক থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের তুলনায় আমেরিকা যোজন যোজন এগিয়ে। দুটি বিমানবাহী রণতরী, শত শত যুদ্ধবিমান এবং সাবমেরিন নিয়ে গঠিত এই বিশাল শক্তির সামনে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। গত গ্রীষ্মের ১২ দিনের যুদ্ধেও তারা একটি ইসরায়েলি বিমান ভূপাতিত করতে পারেনি। ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিজ বলেন, ‘এটি কোনো অসম লড়াই নয়; ইরানের এমন কোনো বিমান বাহিনী নেই যা আমেরিকার এই অভিযান রুখতে পারে।’

তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো ইরানের পাল্টা আঘাত। আমেরিকা চারটি প্রধান লক্ষ্যবস্তু অর্জনের চেষ্টা করছে। প্রথমত, নেতৃত্ব নির্মূল করা। খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের হত্যা করে কমান্ড চেইন ধ্বংস করা। দ্বিতীয়ত, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ধ্বংস করা। ইরান যেন পাল্টা বড় কোনো হামলা করতে না পারে, সে জন্য তাঁদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করা।

 

তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার চেষ্টা রুখতে ইরানের নৌবাহিনীকে অকেজো করা। চতুর্থত, আইআরজিসি ধ্বংস করা। ইরানের প্রধান সামরিক শক্তি ও অভ্যন্তরীণ দমনের মূল হাতিয়ার রেভল্যুশনারি গার্ডসকে পঙ্গু করে দেওয়া।

 

বিকল্প কে

ইরাকের চেয়ে ইরান আয়তনে তিনগুণ বড় এবং এর জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আকাশপথে হামলা চালিয়ে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে সরাতে স্থলবাহিনীর প্রয়োজন হয়েছিল, যার ফলাফল সুখকর ছিল না। সিট্রিনোভিজ সতর্ক করে বলেন, ‘ধরা যাক, আমরা বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিলাম, কিন্তু তারপর কে ক্ষমতা নেবে? সেখানে কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল নেই। এর ফলে দেশটিতে চরম অরাজকতা ও গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে।’

 

আয়াতুল্লাহ খামেনির কোনো স্পষ্ট উত্তরসূরি নেই। বিশেষজ্ঞ হোলি ডাগরেস মনে করেন, খামেনিকে সরিয়ে দিলে হয়তো আইআরজিসির কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা বর্তমান স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ক্ষমতার কেন্দ্রে আসতে পারেন। তবে এদের কেউই জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত নন।

অন্যদিকে, নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি নিজেকে সম্ভাব্য নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি ইরানিদের বিপ্লবের আহ্বান জানিয়েছেন এবং গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনেক ইরানি বিক্ষোভে তার নাম ধরে স্লোগান দিচ্ছে। তবে ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা দ্বিধায় আছেন। তাদের ভয়, পাহলভি হয়তো ইরাকের আহমেদ চালাবির মতো হতে পারেন, যাকে মার্কিনীরা পছন্দ করলেও ইরাকি জনগণ মেনে নেয়নি। স্বয়ং ট্রাম্প পাহলভি সম্পর্কে বলেছেন, ‘তাঁকে দেখে ভালো মানুষ মনে হয়, কিন্তু নিজ দেশের মানুষ তাঁকে গ্রহণ করবে কি না তা আমি জানি না।’

 

যেকোনো শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় স্তম্ভ হলো সে দেশের জনগণ। গত জানুয়ারির গণবিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং দমন-পীড়ন ইরানিদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সাংবাদিক মরিয়ম মজরুই বলেন, ‘মানুষ এখন কেবল ৫০ বছর আগের রাজতন্ত্রে ফিরতে চায় না, তারা তাদের হারানো পরিচয় ফিরে পেতে চায়। তারা এই শাসনব্যবস্থার অবসান চায়।’

 

ইরানি পুরাণের অত্যাচারী রাজা ‘জহাক’-এর সাথে খামেনির তুলনা এখন মুখে মুখে। সাধারণ মানুষ মনে করছে, এই শাসনের সময় ফুরিয়ে এসেছে। তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ অনেক রক্ষণশীল নেতা মনে করেন, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন প্রায়শই হিতে বিপরীত হয়।

 

ট্রাম্পের লক্ষ্য যদি কেবল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা হয়, তবে শীর্ষ নেতৃত্বে একটি প্রতীকী পরিবর্তনই তার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু তিনি যদি সত্যিই ১৯৭৯ সাল থেকে চলে আসা পুরো ধর্মতান্ত্রিক কাঠামোটি উপড়ে ফেলতে চান, তবে ইরান এক দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মুখে পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত ইরানিরা কি আমেরিকার এই অভিযানকে মুক্তি হিসেবে দেখবে, নাকি জাতীয়তাবাদের টানে পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে—সেটিই এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।