মার্কিন আদালতের মাধ্যমে কুখ্যাত জেফরি এপস্টেইনের বিভিন্ন গোপন নথি প্রকাশ্যে আসতে থাকায় এই কেলেঙ্কারি আন্তর্জাতিক স্তরে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। এতে আবারও স্পষ্ট হয়েছে— ক্ষমতাবান মানুষেরা কত দ্রুতই না নিজের ও অন্যদের সুনামের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারেন। সেই অস্বস্তি নয়াদিল্লিতেও পৌঁছেছে। মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এআই ইমপ্যাক্ট সামিটের প্রধান বক্তা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি সম্মেলনে অংশ নেননি। নানা সমালোচনা ও এপস্টেইনের সঙ্গে তার অতীতের সম্পর্ক নিয়ে মোদি সরকারের মধ্যে স্পষ্ট অস্বস্তির কারণেই তার এই অনুপস্থিতি।
এই বিষয়টি বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ। যখন কোনো কেলেঙ্কারি সুনাম ও কূটনৈতিক ভাবমূর্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন নৈতিক ক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সেই সংবেদনশীল ঘটনার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা। খোদ ভারতে নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা নিত্যদিনের ঘটনা, তা নিয়ে জাতীয়ভাবে লজ্জা বা রাজনৈতিক জবাবদিহিতার বিষয় তেমনভাবে কোথাও চোখে পড়ে না। এই বৈপরীত্য ভয়াবহ। একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি যা বিশ্বব্যাপী কেলেঙ্কারির প্রতি অস্বস্তি জানাতে পারে, কিন্ত দেশের নারীরা যে প্রতিদিন নির্মমতার শিকার সেই বিষয়ে একেবারেই উদাসীন।
মোদি প্রশাসনের আমলে, ভারতীয় গণমাধ্যমে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের খবর যেন কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের মতো বাজারে আসতেই থাকে। এটা যেন এক অন্তহীন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব খবর এতটাই সাধারণ হয়ে গেছে যে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো শোনায়: তাপপ্রবাহে মৃত্যু। হঠাৎ বন্যা। পাঁচ বছরের শিশুকে অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যা। আর আবহাওয়ার মতোই দায় যেন ঈশ্বরের—ধর্ষকের নয়, আদালতের নয়, পুলিশের নয়, অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর নয়।
এই লেখা শুরুর পর থেকে প্রকাশ পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই উত্তর প্রদেশের মীরাটে পাঁচ বছরের এক শিশুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে; ফরিদাবাদে ২৬ বছর বয়সি এক নারী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন; ওডিশায় ১৭ বছর বয়সি এক কিশোরী; দিল্লির উপকণ্ঠে ৪২ বছর বয়সি এক নারী; রাজস্থানের বিকানেরে ১২ বছরের এক শিশুকে অপহরণ করে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে। বিহার, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, কানপুর— তালিকা দীর্ঘ। পরিসংখ্যান দেওয়া যায়, কিন্তু সংখ্যা কখনোই সেই সর্বগ্রাসী আতঙ্কের ছবি আঁকতে পারে না, যার মধ্যে নারীরা বেঁচে থাকেন। যৌন সহিংসতার হুমকি মাধ্যাকর্ষণের মতোই স্থায়ী।
ঘটনাগুলো খুবই জঘন্য— নাড়িভুঁড়ি বের করে দেওয়া, রড ঢুকিয়ে দেওয়া, জিব কেটে ফেলা, অ্যাসিড নিক্ষেপ, শিরশ্ছেদ, গলা টিপে হত্যা ও পুড়িয়ে মারার মতো ঘটনা ঘটে। যখন আমি সরকারি তথ্যের দিকে তাকাই দেখি ভারতে প্রতিদিন গড়ে ৮৬ জন নারী ধর্ষিত হন—তখন মনে হয় যেন এক্সেল শিটে একটি গণকবরে হোঁচট খাওয়ার মতোই বীভৎস ব্যাপার।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কঠোরতার কথা বললেও, তাদের শাসনামলে ভারত যে কার্যত ‘সংঘবদ্ধ ধর্ষণের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে, তা নিয়ে দৃশ্যমান উদ্বেগ খুব কমই দেখা যায়।
এর এক জ্বলন্ত উদাহরণ হলো বিজেপি নেতা কুলদীপ সিং সেনগারের ঘটনা। ২০১৭ সালে এক অপ্রাপ্তবয়স্ককে ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত এই রাজনীতিককে উচ্চ আদালত জামিন দিলে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে সর্বোচ্চ আদালত সেই জামিন স্থগিত করেন, তাও দিল্লিতে নারীদের বিক্ষোভের পর। ওই কিশোরী শুধু তারই নয়, তার সহযোগীদের দ্বারাও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। মেয়েটির বাবা পুলিশ হেফাজতে নিহত হন। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে আত্মাহুতির হুমকি না দিলে মামলা পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। এই গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটাই যেন এই ব্যবস্থার নিজস্ব ভাষা।
২০১২ সালে দিল্লিতে ‘নির্ভয়া’ নামে পরিচিত তরুণীর ওপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের খবর পড়েছিলাম। তার সঙ্গে যা যা হয়েছিল শুনে মনে হয়েছিল—এবার পৃথিবী থমকে দাঁড়াবে। প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল, সারা দেশ তার নাম জানত। মনে হয়েছিল, আর কখনো এমন হবে না।
কিন্তু শিগগিরই সব ঢেকে যায় ‘সব পুরুষ এমন নয়’ এই স্লোগানে। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো বিভীষিকাময় ঘটনাকেও তখন সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল করে হ্যাশট্যাগে ঝুলিয়ে রাখার উপাদানে পরিণত করা হয়েছিল। সেই স্লোগান আসলে যারা নির্দোষ তাদের রক্ষার জন্য ছিল না; বরং জবাবদিহিতার প্রশ্ন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পুরুষের স্বস্তির দিকে আবারও আলো ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
প্রতিটি ঘটনার খবর শুনলেই প্রশ্ন জাগে—যদি সেটা আমি হতাম? আমার শরীর। সেই রড। সেই মানুষগুলো। নারীর ওপর নির্যাতন ও তাদের অঙ্গহানির ঘটনা এতটাই নিয়মিত যে ভয় কমাতে নিরাপত্তা অ্যাপ, পেপার স্প্রে ও পরিধানযোগ্য অ্যালামের্র বাজার তৈরি হয়েছে। আমি যখন এ বিষয়ে লিখতে বসি তখন যারা ধর্ষণের ভিডিও করে, সেগুলো নিয়ে গর্ব করে আবার সমাজে পুনর্বাসিতও হয়েছে এমন পুরুষদের সম্বোধনের জন্য সঠিক বাক্য খুঁজে পাই না।
এ শুধু নজিরবিহীন নয়, এটি অস্তিত্বের সংকট। যুক্তরাষ্ট্র হোক বা ভারত ক্ষমতা নিজেকে রক্ষা করছে, প্রভাবশালী পুরুষেরা একজোট হয়ে ঝড় থামার অপেক্ষায় থাকে। পার্থক্য প্রেক্ষাপটে, কিন্তু মিল প্রতিষ্ঠানগত আচরণে। যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাদের লড়াই একাকী আর ক্ষমতাবানদের জন্য নিরাপত্তা বলয় থাকে। কিছু সময় ধরে, কথিত বৃহত্তম ও প্রাচীনতম গণতন্ত্রের দুটি দেশই নিজকে ধ্বংসের পথে হাঁটছে। মোদি হোন বা ট্রাম্প রাজনীতির মঞ্চে ধর্ষণ যেন আর কেবল অপরাধ নয়, হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা। নারীরা শুধু পুরুষের হাতে নয়, আদালত, হাসপাতাল, গণমাধ্যম সবখানেই অপমানের শিকার। এ যেন দানবের যুগ। এপস্টেইন, গেটস বা সেঙ্গার তারা এই সময়ের প্রতীক মাত্র।
মধ্যবিত্ত যখন ক্যারিয়ার, শহরতলিতে দুইরুমের ফ্ল্যাট নিয়ে উন্নতির স্বপ্নে ব্যস্ত, তখন আমরা দুষ্কৃতীদের একটি পাইকারি নারী-বিদ্বেষী সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে দিয়েছিলাম যা নারীদের প্রতি ঘৃণার ওপর চলে। আমি যে ক্ষোভ অনুভব করি, তার সঙ্গে কী করব—তা আমি জানি না। যখন বারবার আপনাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে আপনার শরীর, আপনার মানুষ, আপনার লিঙ্গ সবই তুচ্ছ, বদলানো যায়, ফেলে দেওয়া যায় তখন আপনি কী করবেন, আমি জানি না।
আমি যা জানি তা হলো—সেঙ্গারের হাত থেকে বেঁচে ফেরা সেই কিশোরী এখনও ন্যায়বিচারের জন্য লড়ে যাচ্ছে। এপস্টেইনের যৌন পাচারচক্র থেকে বেঁচে ফেরা নারীরাও ন্যায়বিচারের দাবিতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। এই নারীরা হৃদয়, আত্মা আর রক্ত-মাংস এক করে সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়ছেন। তারা যখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন ঠিক নায়িকার মতো তখন হতাশ হওয়ার কোনো অধিকার আমার নেই। আর এটাও জানি, নিজের বোনদের প্রতি গভীর ভালোবাসা না থাকলে কেউ এভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে না।
এই অন্ধকার সময়ে এ কথা লিখে রাখা জরুরি যে, যখন মোদি প্রশাসন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এপস্টেইন কেলেঙ্কারির ছায়া থেকে নাটকীয়ভাবে সরে দাঁড়ানোর ভান করে, তখন তা হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে সরকার তার নারীদের রক্ষা করতে পারে না বা করবে না, তাদের লজ্জিত হওয়া উচিত সেই ঘটনার জন্য যা প্রতিদিন ঘটছে, এপস্টেইন কেলেঙ্কারির জন্য নয়।
আলজাজিরার কলাম
লেখক: অনুসন্ধানী সাংবাদিক।