সেমিকন্ডাক্টর আর প্রতিরক্ষা—ভবিষ্যতের দুই শক্তিশালী অস্ত্র নিয়ে এবার একজোট হলো ভারত ও মালয়েশিয়া। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও আনোয়ার ইব্রাহিমের ঐতিহাসিক বৈঠকে এলো বিশাল বাণিজ্যিক অঙ্গীকার। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আর প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায় দুই দেশের এই বন্ধুত্ব এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
৭ ফেব্রুয়ারি দুই দিনের সফরে মালয়েশিয়ায় পৌঁছান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিমানবন্দরে মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। কুয়ালালামপুরে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের ১০০ জন শিক্ষার্থী দুই দেশের পতাকা নেড়ে তাকে স্বাগত জানায়। তার আগমন উপলক্ষে একটি বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়।
৮ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় পেরদানা পুত্রা কমপ্লেক্সে মোদিকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অফ অনার ও লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এরপর নরেন্দ্র মোদী ও আনোয়ার ইব্রাহিম এক একান্ত বৈঠকে মিলিত হন।
সেখানে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। দুই নেতার উপস্থিতিতে সেমিকন্ডাক্টর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সাইবার নিরাপত্তা সহ মোট ১১ টি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। দুই দেশের সীমান্ত বাণিজ্য সহজ করতে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার বিষয়েও একমত হয়েছেন দুই নেতা।
বৈঠক শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সন্ত্রাসবাদ দমন, গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা জোরদার করার ঘোষণা দেন নরেন্দ্র মোদী। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, দুই দেশের সম্পর্ক এখন আর সাধারণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তিনি বলেন:
"ভারত এখন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যে ভারতের এই উত্থান বিস্ময়কর। ফলে আসিয়ান অঞ্চলের দেশ হিসেবে মালয়েশিয়া ভারতের সাথে কাজ করে দারুণভাবে উপকৃত হবে। ২০২৫ সালে আমাদের দুই দেশের বাণিজ্য ১৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আমরা এখন এটিকেও ছাড়িয়ে যেতে চাই।"
এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে মালয়েশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের সাবা রাজ্যে ভারতের একটি কনসুলেট খোলার উদ্যোগ নিয়ে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি ভারতের নিছক কোনো প্রশাসনিক উদ্যোগ নয় বরং অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী কৌশলগত এবং ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপ।
১. ভৌগোলিক অবস্থান: সাবা রাজ্যটি দক্ষিণ চীন সাগরের কাছে অবস্থিত। সাভাতে কনসুলেট থাকার অর্থ হলো ভারত এই গুরুত্বপূর্ণ মেরিটাইম রুটের একদম কাছাকাছি তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। ২. লজিস্টিক সাপোর্ট: ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজগুলো যখন এই রুট দিয়ে চলাচল করবে, তখন এই কনসুলেটটি লজিস্টিক সাপোর্ট হিসেবে কাজ করবে। অর্থাৎ ঘাঁটি না বানিয়েও নৌবাহিনী মোতায়েনের সুযোগ পাবে ভারত। ৩. ব্লু ইকোনমি: সামুদ্রিক সম্পদ আহরণে যৌথ গবেষণার পথ প্রশস্ত হবে, যা ভারতের 'অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি'কে আরও শক্তিশালী করবে।
মালয়েশিয়া নিজেও এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্যে কিছুটা ভীত। সাবা দ্বীপের অবস্থান চীনের বিতর্কিত 'নাইন ড্যাশ লাইনের' খুব কাছে। ফলে ভারতের সেখানে কনসুলেট খোলাকে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রতি একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন অনেকে।