Image description

বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী অবস্থান ও ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে চীন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির কারণে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ডলারের মান চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন, যার দাম আউন্সপ্রতি সাড়ে ৫ হাজার ডলারেরও বেশি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে নিজস্ব মুদ্রা রেনমিনবিকে বিকল্প বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে দেখছে চীন।

 

বুধবার (০৪ ফেব্রুয়ারি) সিএনএনের এক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান আদর্শিক সাময়িকী কিউশিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে তিনি রেনমিনবিকে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রায় রূপ দেয়ার পরিকল্পনার কথা বলেন। বর্তমানে এই ভূমিকা পালন করছে মার্কিন ডলার, যা অধিকাংশ আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রধান মুদ্রা এবং বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত।

যদিও খুব শিগগিরই ডলারের অবস্থান বদলে যাবে- এমনটা কেউই আশা করছে না, তবে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ডলারের মূল্যে বড় ধরনের পতন সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে। চিউশির প্রতিবেদন বলছে, শি জিনপিং সরকারি কর্মকর্তাদের বলেছেন, চীনের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি “শক্তিশালী মুদ্রা” গড়ে তোলা, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হবে। এর পাশাপাশি একটি “ক্ষমতাশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক” থাকবে, যা বিনিয়োগ আকর্ষণ ও বৈশ্বিক মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারবে।

২০২৪ সালে ব্যক্তিগতভাবে দেয়া এই মন্তব্য এখন প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। অর্থাৎ চীন নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তার ফলও পাচ্ছে।

কেন এখন চীনের পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ?
এক দশকের বেশি সময় ধরে রেনমিনবিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করছে চীন। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে উদ্বেগ এবং তথাকথিত “ডি-ডলারাইজেশন” প্রবণতা চীনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ট্রাম্পের ধারাবাহিক শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মুদ্রার ওপর আস্থা কমিয়েছে। একই সঙ্গে ফেডারেল রিজার্ভে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা (জেরোম পাওয়েলের সঙ্গে দ্বন্দ্বের পর ট্রাম্পের কেভিন ওয়ার্শকে মনোনয়ন) মার্কিন মুদ্রানীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।

 

গত বছর থেকেই বিনিয়োগকারীরা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছেন। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দ পর্যন্ত ইউরোর বড় ভূমিকার আহ্বান জানিয়েছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার হুমকিতে ডলারের বিকল্প খুঁজতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে অনেক দেশ।

কেন রিজার্ভ মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডলার বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে কম সুদে বিদেশ থেকে ঋণ নেয়া এবং অন্যান্য দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতা দেয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ডলারের পাশাপাশি ইউরো, রেনমিনবি, জাপানি ইয়েন, কানাডীয় ও অস্ট্রেলীয় ডলার, পাউন্ড স্টার্লিং এবং সুইস ফ্রাঁসহ আরও ৭টি মুদ্রাকে রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। চীন রেনমিনবির অবস্থান শক্তিশালী করে মার্কিন আর্থিক আধিপত্য থেকে নিজেকে সুরক্ষিত করতে চায়। পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থায়নে নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির পরিকল্পনায় এগোচ্ছে বেইজিং।

রেনমিনবিকে শক্তিশালী করতে চীনের পদক্ষেপ
চীন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ার, বন্ড ও পণ্যের মতো আর্থিক খাতে প্রবেশাধিকার বাড়িয়েছে এবং সীমান্তপারের লেনদেন সহজ করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার হওয়ায় আন্তর্জাতিক লেনদেনে রেনমিনবির ব্যবহার বেড়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যে রেনমিনবির ব্যবহার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে।

গত গ্রীষ্মে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পান গংশেং বলেন, রেনমিনবি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অর্থ মুদ্রা এবং তৃতীয় বৃহত্তম পেমেন্ট মুদ্রা। তিনি ডলার আধিপত্যের পরিবর্তে “বহুমুখী মুদ্রা ব্যবস্থা” গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

ডলারকে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে এই ব্যাপারে বেশ বিচলিত ট্রাম্পও। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে গঠিত ব্লক ‘ব্রিকস’ একটি নতুন রিজার্ভ মুদ্রা তৈরির ধারণা উত্থাপনের পর যুক্তরাষ্ট্রের মাথা ব্যথা বেড়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, যদি কখনও এ ব্যাপারে এগিয়ে যায় তবে তিনি ১০০ শতাংশ শুল্ক দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাবেন।

রেনমিনবি কি সত্যিই ডলার প্রতিস্থাপন করতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিকট ভবিষ্যতে ডলারের জায়গায় রেনমিনবি আসার সম্ভাবনা খুবই কম। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক রিজার্ভে ডলারের অংশ প্রায় ৫৭ শতাংশ, ইউরোর ২০ শতাংশ এবং রেনমিনবির মাত্র ২ শতাংশ। চীনও সরাসরি ডলারকে সরিয়ে দেয়ার কথা বলছে না, বরং নিজের মুদ্রার ভূমিকা বাড়াতে চায়।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চীনে অর্থ প্রবাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় বাধা। পাশাপাশি রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি ধরে রাখতে চীন হয়তো রেনমিনবির মান তুলনামূলক কম রাখতেই আগ্রহী থাকবে।

ট্রিভিয়াম চায়নার বাজার গবেষণা প্রধান ডিনি ম্যাকমাহন বলেন, ‘ডলার বা ইউরোর মতো পর্যায়ে রেনমিনবির গ্রহণযোগ্যতা পৌঁছাবে- এমন বিশ্ব কল্পনা করা কঠিন। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় বেইজিং অন্তত কিছুটা জায়গা করে নেয়ার সুযোগ দেখছে।’