Image description
ইউটিউবের একটি চ্যানেল ‘Chaarcha’–এর একটি প্রোগ্রামে জনাব জুলকারনাইন সায়ের মন্তব্য করেছেন যে, “তারা ঝুলন্ত পার্লামেন্ট বানাতে চায়”। কথাটি নতুন নয়—এর আগেও বিভিন্নজনের মুখে এমন বক্তব্য শুনেছি। প্রশ্ন হলো, আসলেই কি এটি গাণিতিকভাবে সম্ভব? আসুন, বিষয়টি একটু ঠান্ডা মাথায় বিশ্লেষণ করি।

‘হাং পার্লামেন্ট’ বা ঝুলন্ত সংসদ বলতে বোঝায়—কোনো দল এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন না পাওয়া। ব্যক্তিগতভাবে আমি এটাকে ভয়ের কোনো কারণ মনে করি না। ইতিহাস বলছে, ছোট দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন নতুন কিছু নয়। বিশ্বের বহু দেশে যেমন হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশেও হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে ১৯৯১ সালের কথাই ধরা যায়। সে বছর বিএনপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জামায়াতে ইসলামীর ১৮টি আসনের সমর্থনে তারা সরকার গঠন করে। জামায়াত মন্ত্রিসভায় না থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল। পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে জামায়াত সমর্থন প্রত্যাহার করলে বিএনপি সরকার কার্যত অচল হয়ে পড়ে—যার পরিণতি হিসেবে ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন করতে হয় তৎকালীন সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করানোর জন্য। এই ইতিহাস আমাদের সবারই জানা।

তবে এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঝুলন্ত পার্লামেন্ট সাধারণত তখনই হয়, যখন দুইয়ের বেশি বড় রাজনৈতিক শক্তি তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকে। ১৯৯১ সালে সেই বাস্তবতা ছিল। সে বছর বিএনপি প্রায় ১৪০টি, আওয়ামী লীগ প্রায় ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি এবং জামায়াত ১৮টি আসন পেয়েছিল। অর্থাৎ চারটি দলই উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। এবার সেই চিত্র নেই।

এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই, জাতীয় পার্টি আগের অবস্থানে নেই—২-৪টি আসন পাওয়াও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাস্তবতা হলো, বিএনপি এবং জামায়াত–এনসিপি জোটের বাইরে তৃতীয় কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তি চোখে পড়ছে না। এনসিপি যেহেতু জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে মাত্র ৩০টি আসনে নির্বাচন করছে, তাই আলাদাভাবে তাদের ‘তৃতীয় শক্তি’ বলারও সুযোগ নেই।

যুক্তির খাতিরে ধরেই নিলাম—বিএনপি জোট ও জামায়াত জোটের ফলাফল হতে পারে ১৩৫–১২৫, ১৪০–১২০, ১৪৫–১২৫ কিংবা ১৪০–১৩০। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে—জাতীয় পার্টি কি বাকি ৩০–৪০টি আসন জিততে পারবে? বাস্তবতা হলো, এমন কোনো সম্ভাবনা দৃশ্যমান নয়। অর্থাৎ সংখ্যার হিসাবেই ঝুলন্ত পার্লামেন্টের সম্ভাবনা তৈরি হয় না তো!

সুতরাং, আমি মনে করি যে পক্ষই এবারের নির্বাচনে জয়ী হোক—এককভাবে না হলেও জোটগতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই সরকার গঠন করবে, এটাই স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত। ‘হাং পার্লামেন্ট’ গঠনের এই তত্ত্ব বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না—ঠিক যেমন মেলেনি “ইউনুস নির্বাচন করবে না, আমেরিকার সমর্থনে ক্ষমতায় থেকে যাবে”–জাতীয় আরও বহু গালগল্প ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।

রাজনীতিতে সংখ্যার হিসাব কথা বলে, যাচ্ছে তাই অনুমান নয়। প্রফেসর ইউনুস সরকারের প্রায় পুরোটা সময়ই দেখলাম কত কত নতুন নতুন রাজনৈতিক বোদ্ধা এসেছেন বাজারে নানান ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে যার প্রায় ৯৯ ভাগই আষাঢ়ে গল্প প্রমাণিত হয়েছে।