ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দেশটির চারদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক প্রস্তুতি নিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যেকোনো সময়ে তারা ইরানে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল। এর ফলে ইরানি মুদ্রার রেকর্ড পতন হয়েছে। জনজীবনে নেমে এসেছে ভোগান্তি। এমন সময়ে সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি মোহাম্মদ বিন সালমানকে সতর্ক করেছেন। বলেছেন, ইরানে হামলা হলে তাতে কিছুই অর্জিত হবে না। শুধু এ অঞ্চল অস্থিতিশীল হবে। জবাবে মোহাম্মদ বিন সালমান ইরানকে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে সংহতির গুরুত্ব অপরিসীম এবং ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা উত্তেজনা সৃষ্টির উদ্যোগ সৌদি আরব প্রত্যাখ্যান করে।
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে ইরান। বলেছে, যদি তাদের বিরুদ্ধে ‘বাতাস’ প্রবাহিত করা হয়, তাহলে জবাবে তারা ‘ঘূর্ণিবাতাস’ প্রবাহিত করবে। একই সঙ্গে ইরান তার প্রতিবেশীদের বন্ধু বলে আখ্যায়িত করেছে।
ওদিকে ইরানে হামলা চালাতে আকাশ, স্থল ও জলপথ ব্যবহার করতে দেবে না সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে সৌদি আরব তার আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ইরানের অভ্যন্তরীণ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অভিযানের জবাবে তারা সামরিক হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এসব অভিযানে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন নামের যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী এই অঞ্চলে পাঠিয়েছেন। মঙ্গলবার সৌদি যুবরাজের সঙ্গে ফোনালাপে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এসব হুমকি এ অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার লক্ষ্যেই দেয়া হচ্ছে। যার ফল হবে কেবল অস্থিরতা। এর বাইরে কিছুই নয়।
পেজেশকিয়ানের কার্যালয় থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের প্রেসিডেন্ট সাম্প্রতিক চাপ ও শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন। যার মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক চাপ ও বাইরের হস্তক্ষেপ। তিনি বলেন, এসব পদক্ষেপ ইরানি জনগণের দৃঢ়তা ও সচেতনতা দুর্বল করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এই সংলাপকে স্বাগত জানান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রতি সৌদি আরবের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি অঞ্চলজুড়ে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় রিয়াদের প্রস্তুতির কথাও তিনি জানান।
ফোনালাপের পর সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) জানায়, যুবরাজ ফোনালাপে স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সৌদি আরব শ্রদ্ধাশীল এবং কোনো পক্ষই, যেখান থেকেই আসুক না কেন ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে সৌদি আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির যেকোনো উদ্যোগকে সৌদি আরব সমর্থন করে, যা অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করবে। ইরানের প্রেসিডেন্ট সৌদি আরবের এই অবস্থানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় মোহাম্মদ বিন সালমানের উদ্যোগ ও ভূমিকার প্রশংসা করেন।
এই ফোনালাপটি হয় এমন এক সময়, যখন এ মাসে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একাধিকবার হামলার হুমকি দিয়েছেন। গত সপ্তাহে তিনি ইরানের দিকে একটি ‘নৌবহর’ পাঠানোর কথা জানান। যদিও বলেন- তিনি আশা করেন সেটি ব্যবহার করতে হবে না। মঙ্গলবার আইওয়ায় দেয়া এক ভাষণে ট্রাম্প আবারও বলেন, একটি বিশাল ‘সুন্দর নৌবহর’ ইরানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নেয়ার আহ্বান জানান। ট্রাম্প বলেন, ওরা যদি চুক্তি করে, সেটাই ভালো। আগেই করা উচিত ছিল। তাহলে ওদের একটা দেশ থাকত।
এদিকে সম্ভাব্য নতুন যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যেই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) এক কমান্ডার দেশটির প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি সতর্কবার্তা দেন। আইআরজিসির নৌবাহিনীর রাজনৈতিক উপপ্রধান মোহাম্মদ আকবরজাদেহ বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো আমাদের বন্ধু। কিন্তু যদি তাদের মাটি, আকাশ বা জলসীমা ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তাদের শত্রু হিসেবে গণ্য করা হবে। ফার্স সংবাদ সংস্থা তার বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুনে ইসরাইল ইরানের ওপর একাধিক হামলা চালায়। এসব হামলায় শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, পরমাণু বিজ্ঞানী এবং পরমাণু স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রও ১২ দিনের যুদ্ধে যোগ দিয়ে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়। এই যুদ্ধ হয় এমন এক সময়ে যখন ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।
সংঘাতের পর ট্রাম্প আবারও ইরানের কাছে দাবি জানান, তেহরানকে তার পরমাণু কর্মসূচি ভেঙে ফেলতে হবে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। তবে এখনো আলোচনা পুনরায় শুরু হয়নি। সোমবার এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ওয়াশিংটন এখনো ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য উন্মুক্ত। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ওরা শর্তগুলো জানে। তারা শর্ত সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত।
আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ‘ইরান প্রজেক্ট’-এর পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এসব দাবির কাছে ইরানের নতি স্বীকার করার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। ভায়েজ বলেন, ইরানের নেতৃত্ব মনে করে চাপের মুখে আপস করলে চাপ কমে না, বরং তা আরও বাড়ে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যখন অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে, ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে- যদি হামলা চালানো হয়, তারা পাল্টা জবাব দেবে। মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইরানে হামলার পরিণতি পুরো অঞ্চলকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলো ভালোভাবেই জানে এ অঞ্চলে কোনো নিরাপত্তা ভাঙন হলে তা শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নিরাপত্তাহীনতা ছোঁয়াচে।