Image description

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ খাতের চুক্তিগুলো তদন্তে গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (এনআরসি) এমন শক্ত প্রমাণ সংগ্রহ করেছে, যার ভিত্তিতে বাংলাদেশ আদানি পাওয়ার লিমিটেডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে—এমনটাই জানিয়েছেন কমিটির একাধিক সদস্য। গতকাল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) তারা এ তথ্য জানান।

কমিটির সদস্যদের মতে, চুক্তি স্বাক্ষরের সময় বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার ঘটনায় সরাসরি ও পরিস্থিতিগত—উভয় ধরনের প্রমাণই সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা বিদেশে সরকারি কর্মকর্তাদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সংঘটিত সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের নথি পেয়েছেন। এসব নথিতে হিসাব নম্বর, লেনদেনের তারিখ ও সময় এবং সুবিধাভোগীদের পরিচয়সহ বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।

কমিটির সদস্যরা জানান, এসব তথ্য কয়েক মাস আগে কমিটির সুপারিশে বিদ্যুৎ বিভাগের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া যুক্তরাজ্যভিত্তিক একজন কিংস কাউন্সেলের নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ আইনজীবী দলের কাছে পাঠানো হয়। তারা স্বাধীনভাবে প্রমাণগুলো যাচাই ও মূল্যায়ন করেন। পর্যালোচনা শেষে ওই আইনি দল সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগে আদানি পাওয়ার লিমিটেডের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা দায়ের করার মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি বাংলাদেশের রয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অনুসন্ধানের ফলাফল প্রকাশ করে।

আন্তর্জাতিক আইনি বিশেষজ্ঞদের যাচাই করা প্রমাণ

ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে কমিটির সদস্য ও ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতিবিদ মোশতাক হোসেন খান বলেন, তদন্তের শুরু থেকেই হুইসেলব্লোয়ার এবং আদানির বৈশ্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

"বিশ্বজুড়ে অনেক সংস্থা রয়েছে যারা আদানিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদের চুক্তিগুলো নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছে। তারা আমাদের বিপুল পরিমাণ তথ্য দিয়েছে," বলেন মোশতাক। "...এর বড় একটি অংশ ছিল অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য—বিস্তারিত ও স্পষ্ট নথিপত্র।"

তিনি বলেন, এসব তথ্য পরে আন্তর্জাতিক আইনি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয় এবং তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, আন্তর্জাতিক ফোরামে জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগ আনতে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড এই প্রমাণ পূরণ করে।

"আদানি চুক্তিটিই নিজেই দুর্নীতির প্রাথমিক (প্রাইমা ফেসি) প্রমাণ স্থাপন করে," বলেন মোশতাক। "কোনো যুক্তিবাদী রাজনীতিক বা আমলা সৎ বিশ্বাসে এমন একটি চুক্তিতে সই করতে পারেন না।"

ব্রিফিংয়ের পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান টিবিএসকে নিশ্চিত করেন যে, আদানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের আর্থিক লেনদেনের সুস্পষ্ট প্রমাণ কমিটি সংগ্রহ করেছে।

তিনি বলেন, "হ্যাঁ, আদানিকে অভিযুক্ত করার মতো শক্ত প্রমাণ কমিটির হাতে রয়েছে। আদানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের মধ্যে অর্থ লেনদেন হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলে এই প্রমাণ আদালতে উপস্থাপনের জন্য কমিটি প্রস্তুত।"

তবে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা বা পরিচয় প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান।

দুদকে পাঠানো হয়েছে অনুসন্ধানের ফল

কমিটির সদস্য এবং বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, পরিস্থিতিগত প্রমাণসহ সব তথ্য ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে তারা আরও তদন্ত করতে পারে।

"কিংস কাউন্সেলের কাছে উপস্থাপিত প্রমাণ এবং আমরা যে আইনি মতামত পেয়েছি, তার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—সরকারের উচিত এই মামলা করা এবং এতে সরকারের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি," টিবিএসকে বলেন ড. জাহিদ।

এর আগে সোমবার টিবিএসের টক শো 'কেমন সংসদ চাই'-এ যোগ দিয়ে ড. জাহিদ আদানি চুক্তিকে "ক্যানসারের ক্ষত" হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

যেসব কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে

কমিটির সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত চুক্তি প্রক্রিয়ার সময়ে সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী আহমদ কায়কাউস এই চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। তদন্তকারীদের দাবি, আদানি কর্মকর্তারা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়েই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কায়কাউসের বিদেশি ব্যাংক হিসাবগুলোতে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ জমা হয়েছে। তার এবং অন্যান্য কর্মকর্তার লেনদেন ইতিহাস ও ভ্রমণ রেকর্ড বিশ্লেষণ করে কমিটি যে চিত্র পেয়েছে, তা তাদের ভাষায় "বৃহৎ পরিসরের দুর্নীতির" ইঙ্গিত দেয়। এতে দেখা যায়, দরকষাকষি ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময় একাধিক সরকারি কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন।

আরও যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন—শেখ হাসিনার সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ; বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সাবেক চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ ও মো. মাহবুবুর রহমান; পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া; এবং বিদ্যুৎ বিভাগ, বিপিডিবি ও পাওয়ার সেলের একাধিক কর্মকর্তা।

কায়কাউস ও আজাদ—উভয়েই বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব থাকার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য সচিব হন। বর্তমানে কায়কাউস যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, আর আজাদ আওয়ামী লীগ আমলের অনিয়ম সংক্রান্ত একাধিক মামলায় অভিযুক্ত হয়ে জেলে আছেন।

পরবর্তী পদক্ষেপে পরামর্শ দেবেন কিংস কাউন্সেল

কমিটির প্রধান মঈনুল ইসলাম চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, এনআরসির সুপারিশে বিদ্যুৎ বিভাগ যুক্তরাজ্যভিত্তিক একজন কিংস কাউন্সেলের নেতৃত্বে একটি বিশেষায়িত আইনি দল গঠন করেছে, যারা আদানি চুক্তি বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন।

কিংস কাউন্সেল হলো জ্যেষ্ঠ ব্যারিস্টার বা সলিসিটরদের জন্য একটি সম্মানসূচক উপাধি, যারা জটিল বাণিজ্যিক, আন্তর্জাতিক ও জালিয়াতি সংক্রান্ত মামলায় বিশেষ দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে এটি পান।

মঈনুল ইসলাম বলেন, কমিটির অনুসন্ধান সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে (এসআইএসি) মামলা শুরুর জন্য যথেষ্ট শক্ত। তিনি জানান, আদানি চুক্তি পর্যালোচনার প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

ঘুষের মামলার শক্ত ভিত্তি

মোশতাক বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কমিটি অস্বাভাবিক ধরনের শক্ত প্রমাণ সংগ্রহ করতে পেরেছে।

"আমাদের কাছে অত্যন্ত নির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে—সুবিধাভোগীদের নাম, ব্যাংক হিসাবের বিবরণ, সরকারি কর্মকর্তাদের পরিচয়, ভ্রমণ প্যাটার্ন এবং চুক্তি সময়কালের লেনদেন আচরণ," তিনি বলেন। "কয়েক মিলিয়ন ডলার এভাবে সরানো হয়েছে।"

তিনি জানান, যুক্তরাজ্যভিত্তিক জালিয়াতি বিশেষজ্ঞরা এই প্রমাণের শক্তিকে দুর্নীতির মামলায় বিরল বলে অভিহিত করেছেন।

মোশতাক হোসেন খান জোর দিয়ে বলেন, আদানি চুক্তি বাতিলের যেকোনো সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও সেই অবস্থান অটুট থাকতে হবে।
"একটি সাধারণ জালিয়াতির মামলায় যতটা নথি প্রয়োজন হয়, তার চেয়েও অনেক বেশি আমাদের হাতে রয়েছে," বলেন তিনি।

আদানির আন্তর্জাতিক রেকর্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে চলমান মামলা, শ্রীলঙ্কায় একটি বিদ্যুৎ চুক্তির সমঝোতা স্মারক বাতিল এবং অন্যান্য বিচারব্যবস্থায় নজরদারির কথা উল্লেখ করেন।

"আদানি বৈশ্বিকভাবে একটি বিতর্কিত ব্যবসায়িক সত্তা হিসেবে পরিচিত," বলেন মোশতাক। তবে চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) এবং বিচার বিভাগ নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে গৌতম আদানির বিরুদ্ধে বড় পরিসরের ঘুষ ও জালিয়াতির অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে।

কেন চুক্তিটি সন্দেহের জন্ম দেয়

সোমবারের ব্রিফিংয়ে মুশতাক আদানি চুক্তির তিনটি মৌলিক ত্রুটি চিহ্নিত করেন—বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থান নির্বাচন, বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ এবং চুক্তির শর্তাবলি।

তিনি বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রথমে কক্সবাজারের মহেশখালী অথবা ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় স্থাপনের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু কোনো নথিভুক্ত ব্যাখ্যা ছাড়াই শেষ পর্যন্ত এটি গোড্ডাতেই নির্মাণ করা হয়।

"বিদ্যুতের ট্যারিফ (দাম) নিয়ে কোনো টেকনিক্যাল আলোচনা, ডকুমেন্টেশন বা যৌক্তিকতা ছিল না," যোগ করেন তিনি। প্রশ্ন তোলেন, ভারতের ভেতরে অবস্থিত একটি কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ওপর বাংলাদেশ কেন কর দেবে।

তিনি আরও বলেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতায় যদি কেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলেও আর্থিক ঝুঁকি বহন করবে বাংলাদেশ।

"এই সব বিষয় একত্রে বিবেচনা করে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি—দুর্নীতি ছাড়া এই চুক্তি সই হওয়ার আর কোনো যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা নেই," বলেন মোশতাক।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও আদানি পাওয়ার লিমিটেড ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে ২৫ বছরের জন্য এই বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সই করে। এর আওতায় ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানির ১,৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করার কথা। এর ৮০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে উৎপাদন শুরু করে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশে আদানি পাওয়ারের জনসংযোগ দেখভালকারী প্রতিষ্ঠান ফাইভ ডব্লিউ কমিউনিকেশনস কোনো বার্তা বা ফোনকলের জবাব দেয়নি।