Image description
 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেবার পর ইউরোপের আটটি দেশে শুল্ক আরোপের হুমকি দেন।  এমনকি সামরিক শক্তি প্রয়োগের কথাও বলেছিলেন।  কিন্তু হঠাৎ সেই পরিকল্পনা বাতিল করে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, একটি চুক্তির রূপরেখা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।  যেটি বাস্তবায়িত হলে গ্রিনল্যান্ডে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকারের দুই আকাঙ্ক্ষাই পূরণ হবে। যদিও চুক্তিটির বিস্তারিত এখনও জানা যায়নি।  

 

তিনি  বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডেও একটি গোল্ডেন ডোম থাকা জরুরি। এটি স্থাপনের জন্যই ভূখণ্ডটির নিয়ন্ত্রণে নেওয়া দরকার।  গ্রিনল্যান্ডকে একপাশে রেখে ট্রাম্প হঠাৎ গোল্ডেন ডোমের ওপর জোর দিচ্ছেন কেন?

গোল্ডেন ডোম কি?

গোল্ডেন ডোম সিস্টেমটি দখলদার ইসরাইলের আয়রন ডোম দ্বারা অনুপ্রাণিত, যা ২০১১ সাল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট থেকে স্থলভিত্তিক সুরক্ষা দিয়ে আসছে।

ধারণা করা হচ্ছে, গোল্ডেন ডোমের স্থল ও মহাকাশ উভয় ক্ষেত্রেই সক্ষমতা থাকবে। এটি সম্ভাব্য হামলার চারটি প্রধান ধাপে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও প্রতিহত করতে পারবে। 

অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের (এএসপিআই) প্রতিরক্ষা সক্ষমতাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ম্যালকম ডেভিস বলছেন, গোল্ডেন ডোম এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যে, এটিতে কোনো ফাঁক রাখা হয়নি। কোনো ক্ষেপণাস্ত্র একটি নির্দিষ্ট সুরক্ষা বলয় অতিক্রম করতে পারবে না।

ম্যালকম আরও বলেন, সমরশক্তিতে রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত। তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে।  সেগুলো প্রতিহতে গোল্ডেন ডোমকে সক্ষম করে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।  যদিও পুরোপুরি ফাঁকহীন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।  কিন্তু এই ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে অন্তত পরমাণু ওয়ারহেড পৌঁছানোর সম্ভাবনা কমাতে পারে।

কিন্তু কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন যে, এটি নির্মাণে চড়া মূল্যে এবং প্রয়োজনীয় সময়ের জন্য এটি অবাস্তব। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের টড হ্যারিসন অনুমান করে বলেন, এটি তৈরিতে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ও ২০ বছর সময় লাগতে পারে।  পরিপূর্ণ মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য খরচ দাঁড়াতে পারে ৩.৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে।   

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, তিনি এই কর্মসূচির জন্য ১৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছেন। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ব্যবস্থাটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।  গত বছরের জুনে সেন্টার ফর আর্মস কন্ট্রোল অ্যান্ড নন-প্রলিফারেশনের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কার্যক্রমটি এখনো ধারণাগত পর্যায়ে রয়েছে।  মার্কিন কংগ্রেস গবেষণা এবং কাঠামোগত উন্নয়ন ট্র্যাকের জন্য তহবিল বরাদ্দ শুরু করেছে।

 

 

গ্রিনল্যান্ডের গোল্ডেন ডোমের প্রয়োজীয়তা রয়েছে কিনা? 

যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) কিংবা পরমাণু হামলা চালানো হলে সেটি গ্রিনল্যান্ডের ওপর দিয়ে উত্তর মেরু অতিক্রম করবে।  ফলে গোল্ডেন ডোম স্থাপনের লক্ষ্য মূলত গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষা করা নয়, যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছানোর আগেই সেটিকে ভূপাতিত করা। 

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পিটুফিক স্পেস বেস  গ্রিনল্যান্ড থেকে রাডার ব্যবস্থা পরিচালনা করা হয়।  সেখান থেকে যেকোনো হামলার আগাম সতর্ক সংকেত পায় ওয়াশিংটন।  যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকারী রাডার ব্যবস্থা আছে কানাডার উত্তরে ও আলাস্কায়।  সেটি পরিচালনা করে নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড (নোরাড)।

নোরাড যে সীমা পর্যন্ত রাডার পরিচালনা করতে পারে, তার উত্তরে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান।  ম্যালকম ডেভিস মনে করেন, গোল্ডেন ডোমের মহাকাশভিত্তিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা হলে কোনো ক্ষেপণাস্ত্রকে বুস্ট ও মিড-কোর্স পর্যায়েই ভূপাতিত করা সম্ভব।  বুস্ট বলতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উড্ডয়নের প্রাথমিক স্তরকে বোঝায়।  এর স্থায়িত্ব হয় উৎক্ষেপণের পর ১ থেকে ৫ মিনিট। 

ম্যালকম ডেভিস বলেন, বাস্তবতা হলো উৎক্ষেপণ করা প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা প্রায় অসম্ভব।  তাই যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ডেন ডোম প্রকল্পের বিপরীতে চীন, রাশিয়ার কৌশল হতে পারে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ওয়ারহেডের সংখ্যা আরও বাড়ানো।

 

 

প্রতিরক্ষা নাকি রাজনীতি?

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের অধ্যাপক স্টিফেন ফ্রুহলিং বলছেন, গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন গোল্ডেন ডোম কর্মসূচি যতটা সামরিক তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক।  যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আগে থেকেই কিছু মহাকাশভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও রাডার আছে। তারা সেগুলো আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও নিয়েছে। এখন নিরাপত্তার কথা বলে গ্রিনল্যান্ডে গোল্ডেন ডোম স্থাপন করতে চাইছে। একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই গোল্ডেন ডোম কেবল একটি নির্দিষ্ট উপাদান নয়। এর সঙ্গে আরও কিছু আছে।  

ম্যালকম ডেভিস বলছেন, সম্ভাব্য চুক্তিটি ইঙ্গিত দেয়- গ্রিনল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ঘাঁটিগুলোর আশপাশে কিছু ‘সার্বভৌম এলাকা’ থাকবে। সেখানে মোতায়েন থাকবে মার্কিন সেনা। তবে সামগ্রিকভাবে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনেই থাকবে।

সূত্র: এবিসি নিউজ