ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযানের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র বৃহস্পতিবার দেশটির বিরুদ্ধে নতুন ও বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। এর আওতায় শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা, বন্দিদের নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত একটি কারাগার এবং তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল বিক্রি থেকে পাওয়া শত শত কোটি ডলার পাচারের সঙ্গে জড়িত ভুয়া কোম্পানির একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে টার্গেট করা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ট্রেজারি দপ্তরের অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) যৌথভাবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হলো ইরানি শাসনের সেই ‘মূল পরিকল্পনাকারীরা’, যারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস দমনপীড়ন চালাচ্ছেন এবং সেই আর্থিক কাঠামো, যা সরকারের দমননীতিকে টিকিয়ে রাখছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে বলেন, এটি ইরানি জনগণের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্ন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে ট্রেজারি বিভাগ ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে নির্মম দমনের সঙ্গে জড়িত প্রধান নেতাদের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনছে। মানবাধিকারের ওপর শাসকের স্বৈরাচারী নিপীড়নের পেছনে থাকা ব্যক্তিদের লক্ষ্য করতে ট্রেজারি সব ধরনের হাতিয়ার ব্যবহার করবে।
ফারদিস কারাগার নিষেধাজ্ঞার কেন্দ্রে
বৃহস্পতিবারের ঘোষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফারদিস কারাগার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এই কারাগারে নারীসহ বহু বন্দিকে ‘নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের’ শিকার হতে হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার ফলে কারাগারটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যুক্তরাষ্ট্রের অধীনস্থ যেকোনো সম্পদ জব্দ হবে এবং মার্কিন নাগরিকদের এর সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ থাকবে। একই সঙ্গে ওএফএসি ইরানের কয়েকজন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ মোকাবিলায় বলপ্রয়োগের কৌশল নির্ধারণে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের আহ্বান জানানো প্রথম নেতাদের একজন ছিলেন।
বিক্ষোভ ও দমনপীড়নের চিত্র
অর্থনৈতিক দুরবস্থা, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ইতিমধ্যে বহু প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী জনতার ওপর সরাসরি গুলি চালিয়েছে এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত বিক্ষোভকারীদের ওপরও হামলা করেছে। ইলাম প্রদেশের এক ঘটনায় ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সদস্যরা হাসপাতাল চত্বরে কাঁদানে গ্যাস ও ধাতব ছররা গুলি নিক্ষেপ করে এবং রোগী, স্বজন ও চিকিৎসাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। লারিজানির পাশাপাশি লোরেস্তান প্রদেশের মোহাম্মদ রেজা হাশেমিফার ও নেমাতোল্লাহ বাঘেরি, এবং ফার্স প্রদেশের আজিজোল্লাহ মালেকি ও ইয়াদোল্লাহ বুয়ালি–সহ কয়েকজন প্রাদেশিক কমান্ডারকেও নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। ট্রেজারি জানায়, এসব এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী বহু বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে পরিবারের কাছ থেকে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য নিহতদের মৃতদেহ আটকে রাখা হয়েছে।
শ্যাডো ব্যাংকিং নেটওয়ার্কে আঘাত
নিষেধাজ্ঞা কেবল ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কর্মকর্তাদের ভাষায়, এটি ইরানের আর্থিক জীবনরেখায় বড় ধরনের আঘাত। ওএফএসি ইরানের তথাকথিত ‘শ্যাডো ব্যাংকিং’ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ১৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যারা ভুয়া কোম্পানি ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় অর্থ স্থানান্তর করে চলমান নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে আসছিল। ট্রেজারি জানায়, এই নেটওয়ার্কগুলোই ইরানের বার্ষিক কয়েক হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য পরিচালনার প্রধান মাধ্যম। এসব অর্থ ইরানি জনগণের কল্যাণে ব্যয় না হয়ে দেশের ভেতরে দমনপীড়ন ও বিদেশে সামরিক তৎপরতায় ব্যবহার হয়।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক মেল্লি ও শাহর ব্যাংককে এই কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্যাংক মেল্লি একাধিক দেশে ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেন পরিচালনা করে, যার কেন্দ্রে রয়েছে ইরানভিত্তিক নিকান পেজভাক আরিয়া কিশ কোম্পানি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এম্পায়ার ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং এফজেডই এবং সিঙ্গাপুরের গোল্ডেন মিস্ট পিটিই লিমিটেড। এগুলো তেলের আয় থেকে কোটি কোটি ডলার স্থানান্তরে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ। ট্রেজারি আরও জানায়, ২০২৪ সাল থেকে ব্যাংক মেল্লির এই নেটওয়ার্ক জাতীয় ইরানি তেল কোম্পানি, আইআরজিসি ও ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হয়ে বহু বিলিয়ন ডলারের লেনদেন সম্পন্ন করেছে। অনেক সময় জাল চালান ও বহুদেশীয় ট্রান্সফারের মাধ্যমে অর্থের উৎস গোপন করে।
শাহর ব্যাংকও একই ধরনের কার্যক্রম চালিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এইচএমএস ট্রেডিং এফজেডই ও ইরানের তেজারাত হারমেস এনার্জি কেশম–এর মাধ্যমে, যা এশিয়ায় ইরানি তেল রপ্তানির বিপরীতে কোটি কোটি ডলারস্থানান্তরে ব্যবহৃত হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার আইনি প্রভাব
মার্কিন আইনের আওতায় তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সব সম্পদ জব্দ হবে এবং মার্কিন নাগরিকদের তাদের সঙ্গে ব্যবসা করা নিষিদ্ধ থাকবে। তালিকাভুক্ত পক্ষগুলোর সঙ্গে লেনদেন অব্যাহত রাখলে বিদেশি কোম্পানি ও ব্যাংকও শাস্তির মুখে পড়তে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, ইরানি জনগণকে দমন অব্যাহত রাখার সময় শাসকগোষ্ঠীকে বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করাই এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জনগণের পাশে রয়েছে, যারা তাদের ন্যায্য অধিকারের জন্য আন্দোলন করছে। শাসকগোষ্ঠী দেশের মানুষের কল্যাণে বিনিয়োগ না করে বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয় করছে।
লক্ষ্য আচরণ পরিবর্তন
মানবাধিকার লঙ্ঘন, ইরানের নেতৃত্ব এবং জ্বালানি ও আর্থিক খাতকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন নির্বাহী আদেশ ও আইনের আওতায় এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এটি প্রশাসনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রেসিডেন্সিয়াল মেমোরেন্ডাম-২ এর অংশ, যাকে ট্রেজারি ‘সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ’ অভিযান বলে অভিহিত করছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য কেবল শাস্তি নয়, বরং ইরানের আচরণ পরিবর্তন। তবে বিক্ষোভ চলমান এবং তেহরান নমনীয়তার কোনো ইঙ্গিত না দেয়ায়, বৃহস্পতিবারের এই ব্যাপক পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে প্রস্তুত।