Image description
 

গত বছরের মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায় প্রতিবেশি ভারত। প্রথমে ৭ মে ভোরে পাকিস্তানে হামলা চালায় ভারত। তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলে পাকিস্তানও। এতে ভারতের অত্যাধুনিক রাফাল যুদ্ধবিমানসহ বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। একই সঙ্গে হামলার কঠোর জবাব দেয় পাকিস্তান। দেশটি ভারতের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হামলা শুরু করে। এতে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। অবশেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, তার হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় ভারত ও পাকিস্তান।

এদিকে, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের এই প্রতিরোধ শুধু সামরিক শক্তির প্রদর্শনই ছিল না, দেশটির জন্য তা হয়ে উঠেছে অস্ত্র রফতানির বড় মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। ওই সংঘাতে যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত (ব্যাটল-টেস্টেড) হিসেবে নিজেদের তৈরি যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও রকেট ব্যবস্থার কার্যকারিতা তুলে ধরতে সক্ষম হয় ইসলামাবাদ। এরপর থেকেই একের পর এক দেশ পাকিস্তানি অস্ত্রে আগ্রহ দেখাচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু অস্ত্রধারী এই দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য ডন বলছে, গত বছরের মে মাসে ভারতের সঙ্গে চার দিনের সংঘাতে পাকিস্তান শুধু চীনা সামরিক সরঞ্জামের কার্যকারিতাই নয়, নিজেদের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অস্ত্রের সক্ষমতাও তুলে ধরেছে। এই সংঘাতে পাকিস্তান জেএফ-১৭ থান্ডার মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান, আল-খালিদ যুদ্ধট্যাংক এবং ফাতাহ সিরিজের গাইডেড মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম (জি-এমএলআরএস) ব্যবহার করেছিল।

বিশেষ করে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ২০১৯ সালে ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং গত বছরের মে মাসের যুদ্ধে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। গত বছরের যুদ্ধে এই যুদ্ধবিমান ভারতের পাঞ্জাবের আদমপুরে মোতায়েন অত্যাধুনিক এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে বলে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। একইসঙ্গে গত বছরের দুবাই এয়ারশোতেও জেএফ-১৭ শক্ত উপস্থিতি জানান দেয়।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, অস্ত্র শিল্পের এই সাফল্য দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। জিও নিউজকে খাজা আসিফ আরও বলেন, “আমাদের বিমানগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত। আমরা এত বেশি অর্ডার পাচ্ছি যে, ছয় মাসের মধ্যে পাকিস্তানের হয়তো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আর প্রয়োজন হবে না।”

এখানে গত বছরের মে মাস থেকে পাকিস্তান যেসব দেশের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি চূড়ান্ত করেছে বা আলোচনা চালাচ্ছে, তার সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন নিচে তুলে ধরা হলো।

 

পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে যুদ্ধবিমান ও ড্রোন বিক্রি সংক্রান্ত একটি সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স। এই চুক্তির আওতায় আধুনিক কমব্যাট ফাইটার জেট ও মানববিহীন আকাশযান তথা ড্রোনও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে যুদ্ধবিমান ও ড্রোন কেনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

একটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স বলছে, ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধানের মধ্যকার আলোচনার মূল বিষয় ছিল জেএফ-১৭ থান্ডার মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান বিক্রি। এই যুদ্ধবিমানটি পাকিস্তান ও চীনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি। পাশাপাশি নজরদারি ও আঘাত হানার কাজে ব্যবহৃত ড্রোন নিয়েও বৈঠকে কথা হয়েছে।

আরও দুটি সূত্র জানিয়েছে, আলোচনা এখন বেশ অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। উভয় দেশের এই চুক্তিতে ৪০টির বেশি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। একই সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া পাকিস্তানের শাহপর ড্রোনের প্রতিও আগ্রহ দেখিয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী— উভয় পক্ষই নিশ্চিত করেছে যে, ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্যাফ্রি শামসোউদ্দিন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, বৈঠকে সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, কৌশলগত সংলাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানায়, ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। সেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

১০ জানুয়ারি ২০২৬: জেএফ-১৭ কিনতে ‘গভীর আগ্রহ’ ইরাকের

চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি ইরাক সফরে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে বৈঠকে ইরাকি বিমানবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্টাফ পাইলট মোহানাদ ঘালিব মোহাম্মদ রাদি আল-আসাদি মে মাসের সংঘাতে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পেশাদারিত্বের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ শাখা আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়, ইরাকি বিমানবাহিনী প্রধান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সুবিধা নিতে আগ্রহী এবং জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ও সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান কেনার বিষয়েও আগ্রহ দেখিয়েছেন।

৭ জানুয়ারি: ঋণকে যুদ্ধবিমানে রূপান্তর নিয়ে আলোচনায় সৌদি আরব

চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান ও সৌদি আরব প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিতে রূপান্তর নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন পাকিস্তানের দুটি সূত্র। গত বছর দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের কয়েক মাস পর এই আলোচনা শুরু হয়েছে।

একটি সূত্র জানায়, আলোচনাটি মূলত জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান সরবরাহ ঘিরেই চলছে। পুরো চুক্তির মূল্য প্রায় ৪০০ কোটি ডলার, যার মধ্যে ঋণ রূপান্তরের বাইরে আরও ২০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত সরঞ্জামে ব্যয় হতে পারে।

৬ জানুয়ারি: জেএফ-১৭ কিনতে আগ্রহ জানায় বাংলাদেশ

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর প্রধানরা জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বলে আইএসপিআর জানিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, এয়ার চিফ মার্শাল সিধু বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধানকে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাম্প্রতিক অগ্রগতির কথা জানান এবং প্রাথমিক থেকে উন্নত উড্ডয়ন ও বিশেষায়িত কোর্সসহ পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

একইসঙ্গে বাংলাদেশকে তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান সরবরাহ, পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার আশ্বাসও দেন। তাদের বৈঠকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।

২২ ডিসেম্বর ২০২৫: লিবিয়ার সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি চূড়ান্ত

গত মাসে পাকিস্তান লিবিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে প্রচলিত সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির জন্য মাল্টি বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি সই করে। এর মাধ্যমে প্রচলিত অস্ত্র ও সরঞ্জাম রফতনিকারক দেশগুলোর সীমিত তালিকায় জায়গা করে নেয় পাকিস্তান।

চুক্তির একটি কপি রয়টার্স দেখেছে এবং সেখানে একাধিক জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ও সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান কেনার কথা উল্লেখ রয়েছে।

পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, এই চুক্তিতে স্থল, নৌ ও আকাশ— তিন ক্ষেত্রের সামরিক সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং এগুলো প্রায় আড়াই বছর ধরে সরবরাহ করা হবে। এতে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানও থাকতে পারে। সূত্র: ডন নিউজ

বিডি প্রতিদিন