Image description

ভারতের বিহার রাজ্যের সুপৌল জেলার শঙ্করপুর গ্রামের বাসিন্দা খুরশিদ আলম।  তিনি একই রাজ্যের মধুবনী জেলায় সরকারী এক ড্রেনেজ প্রকল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন।

গত ৩০ ডিসেম্বর কাজের ফাঁকে তিনি পাশের এক দোকানে গেলে বাংলাদেশি সন্দেহে ‘মব’ তৈরি করে ‘হত্যার উদ্দেশ্যে’ মারধর করা হয়।  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি খুরশিদ আলমের মুখে বারবার আঘাত করছেন। ভিডিওতে খুরশিদ আলমকে মাটিতে পড়ে হাত জোড় করে থাকতে দেখা যায়; তার মুখ ও নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে। এ সময় হামলাকারী ধর্মীয় স্লোগান দেন এবং আলমের কাছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মোবাইল নম্বর আছে বলে অভিযোগ তোলেন।

“কাজের ফাঁকে আমি পাশের এক দোকানে গিয়েছিলাম। তখন এক ব্যক্তি আমাকে জয় শ্রী রাম, জয় সীতা রাম এবং ভারত মাতা কি জয় স্লোগান দিতে বলে। আমি তাকে বলি আমি শুধু ভারত মাতা কি জয়, স্লোগান দিতে পারবো। এরপর ঐ ব্যক্তি আমার ভিডিও করে চলে যান এবং ঘণ্টাখানেক পরে এসে আমাকে হুমকি দিতে থাকে। এক পর্যায়ে কিছু ব্যক্তি আমাকে ‘বাংলাদেশি’ বলে মারধর করতে থাকে।“ এমনটি বলছিলেন মবের হাত থেকে বেঁচে ফেরা খুরশিদ আলম।

এদিকে পুলিশ স্পষ্ট করেছে যে, ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোনে পাকিস্তানি বা বাংলাদেশি কোনো নম্বরসহ কোনো আপত্তিকর তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে একটি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে এবং দুইজন অভিযুক্তকে শনাক্ত করা হয়েছে; তবে শুক্রবার পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

খুরশিদ আলম বলেন, “তারা আমাকে মারতে মারতে দুই থেকে তিন কিলোমিটার হাঁটিয়ে কালি মন্দিরের দিকে নিয়ে যারা। তারা বলছিলো, তারা মন্দিরে আমাকে বলি (হত্যা) দিবে। তারা বলছিলো, আমরা তোমাকে কেটে ফেলবো।“

ভারত-বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেই গত ডিসেম্বরেই অন্তত তিনজন ভারতীয় মুসলিমকে বাংলাদেশি সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা সামনে আসে।

সিগারেট চাইতে এসে বাংলাদেশী সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা

ভারতের ওড়িশার সম্বলপুর জেলায় ২৪ ডিসেম্বর রাতে 'বাংলাদেশি' সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এক মুসলমান নির্মাণ শ্রমিককে। তার দুই সহকর্মীকেও পিটিয়ে আহত করা হয়।

নিহত ওই যুবক, ১৯ বছর বয়সী জুয়েল রানা পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের সুতি অঞ্চলের বাসিন্দা। খুন হওয়ার মাত্র পাঁচদিন আগে তিনি বাড়ি থেকে কাজ করতে ওড়িশা গিয়েছিলেন।

জুয়েল রানার সহকর্মী পরিযায়ী নির্মাণ শ্রমিক পল্টু শেখ বিবিসিকে জানান, জুয়েল আর বাকি দুজন ঘরে রান্নাবান্না করে খেয়ে বাইরে বেরিয়েছিল বিড়ি খেতে। আমাদের ঘরের একেবারেই পাশে ওরা থাকত। একদল স্থানীয় প্রথমে এসে ওদের কাছ থেকে বিড়ি চায়। ওই দলটা বিড়ি চাওয়ার পরে তাদের বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করে এবং আধার কার্ড দেখতে চায়। একজন আধার কার্ড আনতে ঘরে গেছে, এরমধ্যেই মারধর করে জুয়েল রানা কে হত্যা করা হয়।“

কাজের খোঁজে এসে গণপিটুনিতে মৃত্যু

ভারতের কেরালা রাজ্যে বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করে এক ভারতীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

রামনারায়ণ বাঘেল নামে ৩১ বছর বয়সি ওই মৃত ব্যক্তি ছত্তিশগড়ের বাসিন্দা ছিলেন এবং কাজের খোঁজে কেরালার পালাক্কাডে গিয়েছিলেন। তিনি দলিত শ্রেণীর মানুষ ছিলেন।

কেরালার পুলিশ বিবিসিকে জানিয়েছে, "তাকে বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করে কয়েকজন তাকে ঘিরে ধরে মারতে থাকে। তবে কয়েকজন আবার বলছে যে তাকে চোর বলে সন্দেহ করে মারা হয়।"

Collected

তার ভাই শশীকান্ত বাঘেল ১৭ই ডিসেম্বর ওয়ালাইয়ারের পুলিশের কাছ থেকে একটি ফোন পান, তাকে জানানো হয় যে রামনারায়ণকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাকে লাঠি, পাইপ এবং আরও কিছু মারাত্মক জিনিস দিয়ে মেরেছে একদল ব্যক্তি।

ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে সহিংসতার ভয়াবহতা স্পষ্ট। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে রামনারায়ণের শরীরে ৮০টিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

৩১ সেকেন্ডের ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয়রা বারবার তাকে ‘বাংলাদেশি’ বলে সম্বোধন করছে। ভিডিও ধারণকারী একজন তাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার ভাষা কী? এরপর তার গ্রামের নাম জানতে চান। রামনারায়ণ ঠিকভাবে উত্তর দেওয়ার আগেই আশপাশের লোকজন বলে ওঠে, তুমি বাংলাদেশি। এরপরই শুরু হয় গণপিটুনি।

মারধরের ফলে প্রায় অচেতন অবস্থায় রামনারায়ণ বলতে শোনা যায়, তার বোন তার গ্রামেই থাকেন। তখন ভিডিও করা ব্যক্তি বিদ্রূপ করে বলেন, তোমার বোনও বাংলাদেশি। এরপরও হামলাকারীরা ‘তুমি বাংলাদেশি’ বলতে বলতে আবার তাকে বেধড়ক মারধর শুরু করেন।

স্থানীয় প্রশাসন মন্ত্রী এমবি রাজেশ বলছেন যে আরএসএস-বিজেপির রাজনীতিই এই ঘটনার জন্য দায়ী।

তার কথায়, "যতজন গ্রেফতার হয়েছেন, প্রত্যেকেই আরএসএসের শাখায় যেত। একজন সিপিআইএম সদস্যকে হত্যা করা ছাড়াও এরা নানা ঘটনায় জড়িত ছিল। আরএসএস যে ঘৃণার রাজনীতির প্রচার করে, এই ঘটনা তারই ফলাফল।"

অপ-তথ্যে ভর করে অনলাইনে বাংলাদেশ বিরোধী সঙ্ঘবদ্ধ প্রচারণা

ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষত এক্স এ নানা অসত্য দাবিতে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চলছে। পুরোনো বা ভিন্ন ঘটনার ভিডিও বা ছবি ছড়িয়ে বাংলাদেশীদের মারধরে উল্লাস, বাংলাদেশীদের উৎখাতের দাবি, এবং বাংলাদেশিদের নানান অপরাধে জড়িয়ে ফেলার প্রচারণা চলছে।

সম্প্রতি, ভারতের গুজরাটে আলোচিত এক হত্যাকান্ডে জড়িত সন্দেহে ৬ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও মারধর করে স্থানীয় পুলিশ।

ভিডিওটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স এ ভিন্ন দাবিতে ছড়িয়ে পড়ে। ভারত থেকে পরিচালিত একাধিক এক্স অ্যাাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি শেয়ার করে ভারতের আসামে বাংলাদেশিদের ‘চিকিৎসা’ করা হচ্ছে দাবিতে উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা যায়।

যাচাই করে দেখা যায়, দাবিটি সত্য নয়।

ভিডিওটির কিছু স্ক্রিনশট রিভার্স ইমেজ অনুসন্ধানে গুজরাট থেকে পরিচালিত মিডিয়া আউটলেট “Palanpur Media” তে ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ এ প্রকাশিত মূল ভিডিওটি পাওয়া যায়।

ভিডিওটির ক্যাপশন থেকে জানা যায়, ঘটনাটি গুজরাটের বানাসকাঁঠা জেলার পালানপুর শহরে ঘটেছে।

Palanpur Media–এর পোস্টের বিবরণ অনুযায়ী, ভিডিওটি ভারতভাই হত্যা মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভারতভাই চৌধুরীকে ২০ ডিসেম্বর পালানপুর–আহমেদাবাদ মহাসড়কে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর পুলিশ মূল সন্দেহভাজন লালো মন্দোরাসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে।

আরো অনুসন্ধানে ভারতের একাধিক গণমাধ্যমে থেকেও ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ পাওইয়া যায়।  News18–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্তদের অপরাধস্থলে নিয়ে গিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাদের মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ কারণে অভিযুক্তদের পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশি বর্বরতার অভিযোগ তোলা হয়।

এছাড়া বোম্বে সমাচার ও দৈনিক ভাস্করের মতো পত্রিকার প্রতিবেদনেও নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ঘটনাটির সঙ্গে বাংলাদেশি বা আসামের কোনো সম্পর্ক নেই।

ভারতের নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী দেশটির ১২টি রাজ্যে ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোতে গত ২৮ অক্টোবর ২০২৫ থেকে শুরু হয় ভোটার তালিকায় ‘নিবিড় সংশোধনের’ প্রক্রিয়া, যা এসআইআর বা স্পেশাল ইনটেন্সিভ রিভিশন নামে অধিক পরিচিত। এই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় নথি না দেখাতে পারলে বহু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষমতাসীন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা দাবি করে আসছেন, পশ্চিমবঙ্গের মতো কিছু রাজ্যে বহু কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ভোটার তালিকায় নাম তুলে ফেলেছেন। ‘নিবিড় সংশোধন’ হলেই বাদ পড়বে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ও ‘রোহিঙ্গারা’।

এই প্রেক্ষিতে, ভারতের এক্স এ ভিন্ন ঘটনার একাধিক ছবি/ ভিডিও ছড়িয়ে ‘বাংলাদেশিদের’ ভারত থেকে তাড়ানো দাবিতে উল্লাস করতে দেখা যায়।   

একাধিক ভারতীয় অ্যাকাউন্ট থেকে “পাড়ায় পাড়ায় বাংলাদেশি তাড়া” ক্যাপশনে একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশীদের বের করে দেওয়া হচ্ছে। প্রচারিত ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, একজন যুবক কয়েকজন ব্যক্তিকে জোরপূর্বক কান ধরিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করছে। 

যাচাই এ দেখা যায়, আলোচিত ভিডিওটি ভারতের সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা সংশোধন বা দেশটিতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সাথে সম্পর্কিত নয়। প্রকৃতপক্ষে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরে অবৈধ গরু পাচারকারী সন্দেহে কয়েকজন মুসলিম ব্যক্তিকে বিজেপি নেতার নির্যাতনের ভিডিওকে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।

এছাড়াও, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় কালী প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্যকেও বাংলাদেশীদের তাড়ানো হিসেবে দাবি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার মোংলা ঘাটে নদী পারাপারে ভীড় হওয়ার ভিডিওকে অবৈধভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভারত ত্যাগের  দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।

এছাড়াও, বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার নির্বাচনী সীমানা পুনর্বিন্যাসের প্রতিবাদে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিক্ষোভের ভিডিওকে প্রচার করা হয়েছে ভারতে বাংলাদেশিদের সহিংস বিক্ষোভ হিসেবে।

একইভাবে বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাপুর গ্রামে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষের ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়েছে অবৈধ বাংলাদেশিরা হাতে তৈরি বর্শা নিয়ে ভারতের আসাম রাজ্যের গোলপাড়ায় পুলিশ এবং কর্মকর্তাদের আক্রমণ করতে প্রস্তুত হয়েছে। 

বাংলাদেশের মেহেরপুরে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় হতাশাগ্রস্ত কৃষকদের নিজ জমির ফুলকপি নষ্ট করার দৃশ্যকে ভারতের প্রোপাগান্ডা মিডিয়া রিপাবলিক বাংলা দাবি করেছে, ‘ভারতের মালদহ সুকদেবপুর সীমান্তে কিছু বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ করে রাতের আঁধারে কৃষিজমির ফসল নষ্ট করেছে’

এছাড়াও, বিহারের গোপালগঞ্জে ভারতীয় সন্ন্যাসীকে মারধরের ঘটনাকে ’বাংলাদেশি সন্ত্রাসীকে মারধর’ দাবিতে অসত্যভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

এছাড়াও, প্যারাগুয়ে তে চুরির একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হয়েছে বাংলাদেশিরা ভারতের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে এবং ভারতে চুরি করছে।

বাংলাদেশ বিদ্ধেশী আরো কিছু পোস্ট দেখুনদেখুনদেখুনদেখুন, এবং দেখুন

বিবিসিকে পরিযায়ী শ্রমিকদের একটি সংগঠন বলছে, কেন্দ্রীয় সরকার 'বাংলাদেশি' এবং 'রোহিঙ্গা' ধরার যে বিশেষ প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তারই ফলশ্রুতিতে বাংলাভাষী মুসলমানরা এভাবে একের পর এক বাংলাদেশি সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হচ্ছেন।

পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক আসিফ ফারুক বলছিলেন, "কেন্দ্রীয় সরকার সাত-আট মাস আগে যে বিশেষ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা খুঁজে বার করে বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করার নির্দেশ দিয়েছে, তার ফলেই এধরনের ঘটনা খুব বেড়ে গেছে। ওই নির্দেশ ছিল সব রাজ্যের পুলিশের প্রতি, কিন্তু সেই সুযোগটা নিয়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো এই কাজে নেমে পড়েছে। আর ওড়িশায় বিজেপি-ই তো এখন ক্ষমতায়। তাই বোঝাই যাচ্ছে যে কাদের প্রচ্ছন্ন মদতে এই গণপিটুনি আর হেনস্থার ঘটনা ঘটছে," বলছিলেন মি. ফারুক।