বিগত এক বছরের কিছু বেশি সময়ে বাংলাদেশ, নেপাল, মাদাগাস্কার, মরক্কো, পেরুসহ বিভিন্ন দেশে জেনারেশন জেডের (১৯৯০-এর দশকের শেষ ভাগ থেকে ২০০০-এর শুরুর দিকে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম) তরুণেরা রাস্তায় নেমেছেন। দুর্নীতি, পুলিশি নির্যাতন, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক সুযোগের ঘাটতির কারণে সৃষ্ট হতাশা তাঁদের ক্ষোভের কারণ। অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তাঁরা সংগঠিত হয়েছেন, পরিকল্পনা করেছেন, বার্তা ছড়িয়েছেন এবং নিজেদের আন্দোলনকে বৈশ্বিক আলোচনায় তুলে ধরেছেন।
সম্প্রতি মেক্সিকোয় তরুণ সংগঠকেরা ‘গ্লোবাল জেন জেড’ আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে নভেম্বরের মাঝামাঝিতে বিক্ষোভে নেমেছিলেন। একজন মেয়র নিহত হওয়ার পর তাঁরা সরকার ও মাদক চক্রবিরোধী কর্মসূচি হাতে নেন। ওই মেয়র প্রকাশ্যে মাদক চক্র ও সরকারের নিরাপত্তানীতির সমালোচনা করেছিলেন।
তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত এমন বিক্ষোভের ফলাফল হয়েছে একেক দেশে একেক রকম। কোথাও (যেমন বাংলাদেশ ও নেপালে) বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামো সফলভাবে ভেঙে গেছে। কোথাও (যেমন ইন্দোনেশিয়ায়) দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীনেরা প্রভাবশালীই থেকেছে। আবার অনেক সরকার বিতর্কিত নীতি প্রত্যাহার, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কিছু কর্মকর্তাকে অপসারণ ও একই সঙ্গে বলপ্রয়োগ করে আন্দোলন দমিয়ে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এসব আন্দোলনের জেরে কিছু দেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলেও বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, নতুন সরকারগুলো কি সত্যিই তরুণদের চাওয়া দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করতে পারবে?
দুর্নীতি, বৈষম্য, বেকারত্ব ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এসব আন্দোলন কোথাও সরকার বদলে দিয়েছে; কোথাও আবার কঠোর দমন-পীড়নের মুখে পড়েছে। তবে টেকসই সংস্কার কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
বড় ধরনের জেন-জি বিক্ষোভ হয়েছে কোন কোন দেশে
তরুণদের সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো প্রকৃতপক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক রাজনৈতিক ঢেউয়েরই ধারাবাহিকতা। এর শুরু অন্তত ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’ থেকে। সময়ের সঙ্গে অনলাইন প্রতিবাদ বাস্তবে রাস্তায় নেমে আন্দোলনে গড়িয়েছে।
২০২০ সালে হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন ও থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্রবিরোধী বা রাজতন্ত্রের সমালোচনা–সংক্রান্ত আইন নিয়ে বড় বিক্ষোভ ছড়ায়। থাইল্যান্ডের এ আইনে রাজপরিবারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ায় বিধিনিষেধ রয়েছে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার আরাগালায়া আন্দোলনেও শিক্ষার্থীরাই ছিলেন মূল চালিকা শক্তি। এ আন্দোলন ছিল সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে।

২০২৪ সালে বাংলাদেশ, কেনিয়া, সার্বিয়াসহ কয়েকটি দেশে বড় রকমের সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়। পরের বছর (বিদায়ী ২০২৫ সাল) ইন্দোনেশিয়া, মাদাগাস্কার, মেক্সিকো, মরক্কো, নেপাল, পেরু, ফিলিপাইন ও তিমুর-লেস্তেতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মরক্কো ও মাদাগাস্কারে তরুণদের সংগঠনের জন্য আলাদা নাম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মরক্কোয় নাম হয় ‘জেন জেড ২১২’ (দেশের ডায়ালিং কোড), আর মাদাগাস্কারে ‘জেন জেড মাদা’। সম্প্রতি মেক্সিকোয় যুব নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ বয়স্ক প্রজন্ম ও বিরোধী দলগুলোর সমর্থন পেয়েছে।
এসব বিক্ষোভের পেছনে কারণ
বিক্ষোভের প্রধান কারণগুলোর একটি হলো, দুর্নীতির অভিযোগ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। অনেক দেশের তরুণ বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাতরা রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করছেন। তাঁরা আবাসন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা নিচ্ছেন। অথচ সাধারণ মানুষ বাড়তি ব্যয় ও সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগের চাপে জীবন কাটাচ্ছেন। ইন্দোনেশিয়ায় আগস্টের আন্দোলনের সূত্র ছিল, সংসদ সদস্যদের বেতনের বাইরে বাড়িভাড়া বাবদ বাড়তি তিন হাজার ডলারের ভাতা। সাকল্যে এটি রাজধানী জাকার্তার মানুষের ন্যূনতম বার্ষিক মজুরির ১০ গুণের বেশি।
ইতিমধ্যে নেপালে সেপ্টেম্বরে বিক্ষোভ শুরু হয় রাজনৈতিক নেতাদের সন্তানদের বিলাসী ছুটি কাটানো, বিলাসবহুল বাড়ি বা ম্যানশনে জীবনযাপন ও দামি উপহার গ্রহণ করা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে।
অবকাঠামোগত দুর্বল ব্যবস্থাপনা থেকে তৈরি হওয়া দুর্নীতি ও সরকারের অবহেলাও বিক্ষোভের বড় কারণ। সার্বিয়ায় ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে চলা বিক্ষোভের শুরু নোভি সাদ শহরের রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে। অভিযোগ ওঠে, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে দেশটির প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় নির্মিত ওই স্টেশনের কাজ ছিল নিম্নমানের।
মরক্কোয় একটি হাসপাতালে আটজন নারী প্রসবকালে মারা যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ও শত কোটিপতি আজিজ আখানুশের পদত্যাগের দাবি তোলেন বিক্ষোভকারীরা। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সরকার ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলারের বেশি ব্যয় করছে। অথচ স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ নেই।
বিক্ষোভের আরেকটি কারণ, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও তরুণদের বেকারত্ব। তরুণদের হতাশার একটি বড় উৎস অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উত্থান অনেক প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরি কমিয়ে এ ক্ষেত্রে (অসন্তোষে) উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) ডিজিটাল ও সাইবারস্পেস পলিসির বিশেষজ্ঞ ক্যাট ডাফি বলেন, ‘এআই ও অটোমেশন চাকরির বাজারে আরও চাপ তৈরি করবে। এতে তরুণেরা যে উন্নতির আশা করেছিলেন, তা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।’
কয়েকটি দেশে তরুণদের বেকারত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। মরক্কোতে ২০২৪ সালে এ হার ছিল ২২ শতাংশ, সার্বিয়াতেও ছিল ২২ শতাংশ, নেপালে ২০ শতাংশ (দেশটিতে ১৬-৪০ বছর বয়সীদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশ)।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিক্ষোভের পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশও আংশিক দায়ী। সিএফআরের আফ্রিকা নীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মিশেল গ্যাভিন বলেন, ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো, বড় অর্থনৈতিক কাঠামোগত ইস্যুগুলো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেই। এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ, যা অনেক দেশেই কাজ করছে না।’ ফলে মানুষ রাস্তায় নামছে।
প্রচলিত রাজনৈতিক দল থেকে তরুণদের দূরত্বও একটি কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণেরা মূলধারার দলগুলোর সঙ্গে কম সংযুক্ত হচ্ছেন। তাঁরা ভিন্ন উপায়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা বেশি রাখছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নপুষ্ট গবেষণা গোষ্ঠী ‘দ্য ২০২৫ গ্লোবাল ইয়ুথ পার্টিসিপেশন ইনডেক্স’ বলেছে, ৩০ বছরের কম বয়সীরা অনলাইন এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে বেশি সক্রিয়; যদিও নির্বাচনে ভোটদানে তাঁদের অনীহা বেশি।
সাম্প্রতিক কিছু আন্দোলনে লোকজন দুর্নীতির কারণে তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং ক্ষোভের আঙুল ক্ষমতাসীন সরকার ও নেতাদের দিকে তুলছেন। এসব নেতা ও সরকারের কোনো কোনোটি দশকের পর দশক ক্ষমতা আঁকড়ে আছে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালে তরুণদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের পর আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসন শেষ হয়। শান্তিতে নোবেলজয়ী ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আসে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। শিক্ষার্থীরা একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে নিজস্ব দলও (এনসিপি) গঠন করেছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশন চাকরির বাজারে আরও চাপ তৈরি করবে। এতে তরুণেরা যে উন্নতির আশা করেছিলেন, তা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা
সামাজিকমাধ্যম সাম্প্রতিক আন্দোলনে প্রধান সাংগঠনিক ভূমিকা রেখেছে। এটি মানুষকে সরাসরি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে, সাধারণ সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে, পরস্পরের মধ্যে একতার অনুভূতি তৈরি করতে ও অন্যান্য আন্দোলন থেকে কৌশলগত শিক্ষা নিতে সাহায্য করেছে।
তরুণেরা পপ কালচার, হ্যাশট্যাগ, নাচের ট্রেন্ড, ছবি ও মিম ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের বিক্ষোভের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জাপানি কমিকস ও অ্যানিমেশন সিরিজ ‘ওয়ান পিস’-এর জলদস্যু পতাকা ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, নেপাল, পেরু ও তিমুর-লেস্তের বিক্ষোভে দেখা গেছে। এ পতাকায় অন্যায় ও নিপীড়ক সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা রয়েছে।
ডিসকর্ডের মতো বিকেন্দ্রীকৃত নেটওয়ার্কের কিছু প্ল্যাটফর্ম জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যের ফলে সরকারগুলোর পক্ষে এসবের ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করা বা তাঁদের ওপর দমন–পীড়ন চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। মরক্কো ও নেপালের তরুণেরা ডিসকর্ড ব্যবহার করে আন্দোলনের পরিকল্পনা করেছেন। ডিসকর্ড একটি ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন ইউজার নেম ব্যবহার করে তাঁদের অ্যাকাউন্ট থেকে একাধিক পাবলিক সার্ভারে যুক্ত থাকতে পারেন। ফলে নিজেদের কিছুটা আড়ালে রাখতে পারেন।
মরক্কোর ‘জেন জেড ২১২’-এর ডিসকর্ড সার্ভারে সদস্যসংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। আন্দোলনকারীরা জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলেকে বলেন, পুলিশ এখনো প্ল্যাটফর্মটি বুঝে উঠতে পারেনি। তাই এটি ব্যবহারকারীদের কাছে ‘নিরাপদ’ মনে হয়।
তরুণদের নেতৃত্বে এসব বিক্ষোভের ফলাফল একেক দেশে একেক রকম। কোথাও (যেমন বাংলাদেশ ও নেপালে) বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামো সফলভাবে ভেঙে গেছে। আবার কোথাও (যেমন ইন্দোনেশিয়ায়) দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীনেরা প্রভাবশালীই থেকেছে। অনেক সরকার বিতর্কিত নীতি প্রত্যাহার, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কিছু কর্মকর্তাকে অপসারণ এবং একই সঙ্গে বলপ্রয়োগ করে আন্দোলন দমিয়ে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জার্মান ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যান্ড এরিয়া স্টাডিসের গবেষক জানজিরা সোমবাতপুনসিরি বলেন, ‘বিকেন্দ্রীকৃত নেটওয়ার্ক আন্দোলনকে সমতার পরিবেশ দেয় ঠিকই, কিন্তু তাতে টেকসই সাংগঠনিক কাঠামোর আন্দোলন তৈরি হয় না। এটি আন্দোলনকারীদের সহজেই তাঁদের প্রকৃত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে।’
নেপালের সংসদে অগ্নিসংযোগ করার পর ‘ইয়ুথ এগেইনস্ট করাপশন’ ডিসকর্ড চ্যানেলে ১০ হাজারের বেশি তরুণ অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে অনলাইনে ভোট দেন। তাঁরা সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে বেছে নেন এবং এক সপ্তাহ পর অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। তবে ১ লাখ ৬০ হাজার সদস্যের এ চ্যানেল নেপালের ৩ কোটি মানুষের তুলনায় খুবই ছোট অংশ।
সিএফআরের ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালিসা আইয়ার্স বলেছেন, ‘সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া এ পরিবর্তন (এভাবে ভোট প্রদান) ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। এখন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হলো, সংবিধান অনুযায়ী একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা।’

সরকারগুলোর তরফে প্রতিক্রিয়া
অনেক সরকার অতিরিক্ত পুলিশি শক্তি প্রয়োগ, হামলা-সহিংসতা, গণগ্রেপ্তারের মতো দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে, যেমন সার্বিয়ায় আন্দোলনের অষ্টম মাসে (গত জুলাই) বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের পেটানোর ঘটনা ঘটে। মরক্কোয় দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হতেই দাঙ্গা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাদাপোশাকধারী সদস্যরা ব্যাপক গ্রেপ্তার শুরু করেন।
অনলাইনে সংগঠিত হওয়া ঠেকাতে অনেক সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ বা ইন্টারনেট বন্ধ করে। ফলাফল হয়েছে উল্টো। বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়েছে। বাংলাদেশে আন্দোলনকে আরও ত্বরান্বিত করে ২০২৪-এর ব্ল্যাকআউট। ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। নেপালে ২৬টির বেশি প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করা হয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ঠেকানোর পদক্ষেপ হিসেবে। কিন্তু মানুষ তা সেন্সরশিপ হিসেবে দেখেছে, ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছে।
কিছু সরকার উত্তেজনা থামাতে বিক্ষোভকারীদের দাবিগুলো দ্রুত মেনে নেয়। ইন্দোনেশিয়া আইনপ্রণেতাদের বেতন বৃদ্ধি বাতিল করে। ২০২৪ সালে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার কিছুদিনের মধ্যে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট বিতর্কিত আর্থিক বিল প্রত্যাহার করেন। ফিলিপাইন ও পেরুতে বিক্ষোভের পর উচ্চপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন।
অনেক দেশে আন্দোলনগুলো এখন কিছুটা শান্ত হয়ে গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রতিবাদগুলোতে সংস্কারের যে মূল দাবি তোলা হয়েছিল, তা বাস্তবে হয়নি।
এসব সাম্প্রতিক আন্দোলনে প্রায়ই ‘স্পষ্ট কৌশলের অভাব থাকে; যে কৌশলে আন্দোলনের দাবিগুলোকে আইন প্রণয়নের অগ্রাধিকার হিসেবে রূপ দেওয়া যায়, সরকার গঠনের পথ বের করা যায়, শাসনব্যবস্থা চালানো যায় ও নেতৃত্বের দক্ষতা দেখানো যায়।’
এসব বিক্ষোভের ফলাফল
বাংলাদেশ, নেপাল ও মাদাগাস্কারে সরকার পুরোপুরি ভেঙে গেছে। তরুণদের অভিযোগ, তাঁদের অন্তর্বর্তী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়ন করা। ডিজিটাল আন্দোলন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, কিন্তু সিএফআরের গ্যাভিন মনে করিয়ে দিয়েছেন যে এ ধরনের সফল ডিজিটালি সংগঠিত সামাজিক আন্দোলন সাধারণত বেশি স্তরবিন্যাসনির্ভর নয়। তাই একবার দেশের বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো ভেঙে গেলেও খুব নির্দিষ্ট পরিবর্তনের দিকে এগোনো কঠিন হয়ে পড়ে।
সিএফআরের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো জোশুয়া কারলানৎসিক ‘ওয়ার্ল্ড পলিটিকস রিভিউ’কে বলেছেন, এমন আন্দোলনে প্রায়ই ‘স্পষ্ট কৌশলের অভাব থাকে; যে কৌশলে আন্দোলনের দাবিগুলোকে আইন প্রণয়নের অগ্রাধিকার হিসেবে রূপ দেওয়া যায়, সরকার গঠনের পথ বের করা যায়, শাসনব্যবস্থা চালানো যায় এবং নেতৃত্বের দক্ষতা দেখানো যায়।’
এই গবেষক আরও বলেন, নাগরিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে পারলে জেন-জিদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে। থাইল্যান্ডে ২০২০-এর বিক্ষোভের পর তরুণদের নেতৃত্বে নতুন ‘পিপলস পার্টি’ গড়ে ওঠে। দলটি ২০২৩ সালের সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। নতুন বছরে (২০২৬) বাংলাদেশ, মরক্কো, নেপাল, পেরুসহ কয়েকটি দেশে নির্বাচন হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জেন-জিদের দুর্নীতিবিরোধী, বৈষম্যবিরোধী ও রাজনৈতিক অসন্তোষ মোকাবিলার দাবি সম্ভাব্য নতুন সরকার প্রতিষ্ঠায় বড় প্রভাব ফেলবে।