Image description

পৃথিবী, তুমি একটু চেয়ে দেখো! তোমার বুকে আজ মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। মানুষের ঘরে থাকার ব্যবস্থা নেই, খাবার নেই, অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, স্কুলে সুশিক্ষা নেই। কারণ, মানুষের হাতে টাকা নেই।

অথচ সারা বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের জন্য অস্ত্রের অভাব নেই, যুদ্ধের উপকরণের অভাব নেই, অর্থের অভাব নেই। যুদ্ধের জন্য যত টাকা দরকার, তার ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে। অথচ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম চাহিদাগুলো পূরণ করতে গেলেই টাকার অভাব দেখা দেয়।

এই হচ্ছে বিশ্ব নেতৃত্ব! এই হচ্ছে জনগণের প্রত্যাশিত প্রতিনিধিত্ব! নিকুচি করি এই নেতৃত্বের!

যে পৃথিবীতে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয় না, সেই পৃথিবীতে যুদ্ধের জন্য এত আয়োজন কেন? যে পৃথিবীতে একজন অসুস্থ মানুষ টাকার অভাবে চিকিৎসা পায় না, সেই পৃথিবীতে যুদ্ধের ময়দানে মানুষ মারার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ হয় কীভাবে? যে পৃথিবীতে একটি শিশু সুশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, সেই পৃথিবীতে যুদ্ধের জন্য অস্ত্র কেনার টাকা আসে কোথা থেকে?

কী হচ্ছে পৃথিবীর? একটু চেয়ে দেখুন!

গত ৪ নভেম্বর সুইডেনের সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর টেলিভিশনের পর্দায় এসে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিলেন। সুদের হার বাড়ালেন, আরও বাড়ানোর আগাম বায়না দিয়েও গেলেন!

তার বক্তব্যে উঠে এসেছে, সুইডেনের অর্থনীতির গতি শক্তিশালী হলেও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে। ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে আগেভাগেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি বলেছেন। এমনকি বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর আরও সুদের হার বাড়তে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন।

অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিশ্বজুড়ে শুল্কনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব শেষ পর্যন্ত এসে পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে।

একটু ভাবুন তো, মানুষের অপরাধটা কী?

একজন সাধারণ মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বাড়ি কিনেছেন, পরিবারের জন্য ঋণ নিয়েছেন, সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে জীবন গুছিয়েছেন। হঠাৎ পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধ শুরু হলো, কোথাও তেলের দাম বাড়ল, কোথাও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা দেখা দিল। আর তার প্রভাব এসে পড়ল সেই মানুষের ঘাড়ে। মাসের শেষে বাড়তি সুদের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তাকে হয়তো সন্তানের কোনো প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হবে, নিজের চিকিৎসা বন্ধ রাখতে হবে, কিংবা পরিবারের খাবারের বাজেটে কাটছাঁট করতে হবে।

এ কেমন ব্যবস্থা? এ কেমন নেতৃত্ব?

যে বিশ্বাস নিয়ে জাতি এসব নেতাকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করে, সেই বিশ্বাসের ওপরই যেন বন্দুক চালানো হচ্ছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে জনগণের জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। জনগণের অর্থে যুদ্ধের আয়োজন, জনগণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি, আর জনগণের ঘাড়েই সব খেসারত!

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল নতুন করে বিশ্বরাজনীতির আলোচনায় এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন উঠছে, এই ফলাফল তার প্রশাসনের ওপর কতটা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে এবং বিশ্বরাজনীতিতে তার কী প্রভাব পড়বে।

টেলিভিশনের আলোচনায়ও উঠে আসছে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে থাকা মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে কি না। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেন, ন্যাটো এবং বিশ্ববাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের মনে নানা আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

এখানেই আমাদের ভাবতে হবে, রাজনীতির এই ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে সাধারণ মানুষের অবস্থান কোথায়? ক্ষমতার পালাবদল, নির্বাচনের ফলাফল, নেতাদের রাজনৈতিক চাপ কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রতিটি টানাপোড়েন নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলে, তখন সাধারণ মানুষ শুধু জানতে চায়, আগামীকাল তার জীবন কতটা নিরাপদ থাকবে। তার সন্তান কি নিরাপদে স্কুলে যেতে পারবে? তার পরিবার কি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে? তার ঘরের খাবার, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা থাকবে তো?

যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন ক্ষমতাবানরা, কিন্তু যুদ্ধের মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। যুদ্ধের ময়দানে প্রাণ হারায় সাধারণ মানুষের সন্তান, ঘরবাড়ি হারায় সাধারণ মানুষ, আর যুদ্ধের বাইরে থেকেও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার বোঝা বহন করে সাধারণ মানুষ।

আমরা যেন কলুর বলদের মতো ঘানি টেনে চলেছি। ঘানি ঘুরছে, তেল বের হচ্ছে, কিন্তু সেই তেলের সুফল আমাদের ঘরে পৌঁছাচ্ছে না। বরং ঘানি টানতে টানতে আমাদের জীবনটাই ক্ষয়ে যাচ্ছে।

আর নেতারা? তারা সভা করছেন, বিবৃতি দিচ্ছেন, যুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি সাজাচ্ছেন। কেউ নিরাপত্তার কথা বলছেন, কেউ অর্থনীতির কথা বলছেন, কেউ জাতীয় স্বার্থের কথা বলছেন। কিন্তু মানুষের জীবন কোথায়? মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? মানুষের মর্যাদা কোথায়?

বিশ্বের মানুষ কি এসব নেতাকে ভোট দিয়েছে যুদ্ধ করার জন্য, নাকি মানুষের জীবনকে নিরাপদ করার জন্য? মানুষ কি নেতাদের ক্ষমতায় বসিয়েছে মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস করার জন্য, নাকি মানুষের মাথার ওপর একটি নিরাপদ ছাদ নিশ্চিত করার জন্য? মানুষ কি তাদের নির্বাচিত করেছে মানুষের খাবার কেড়ে নেওয়ার জন্য, নাকি ক্ষুধামুক্ত জীবন নিশ্চিত করার জন্য?

জনগণের প্রত্যাশা ছিল শান্তি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন। কিন্তু সেই প্রত্যাশার জায়গায় যদি যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা, ঋণের বোঝা আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম এসে দাঁড়ায়, তাহলে এই নেতৃত্বের অর্থ কী?

আমি যুদ্ধ চাই না। আমি চাই না কোনো দেশের মানুষ যুদ্ধের শিকার হোক। আমি চাই না কোনো শিশু ক্ষুধার্ত থাকুক, কোনো অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা যাক, কোনো পরিবার ঋণের বোঝায় পিষ্ট হোক। আমি চাই পৃথিবীর সম্পদ মানুষের কল্যাণে ব্যয় হোক, মানুষের ধ্বংসের জন্য নয়।

বিশ্বের নেতাদের কাছে আমার প্রশ্ন, আপনারা কাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন? জনগণের, নাকি সেই ক্ষমতা ও স্বার্থের, যার জন্য মানুষের জীবনকে তুচ্ছ করে দেখা হয়?

যদি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতেই আপনাদের ক্ষমতায় আসা, তাহলে জনগণের জীবনকে নিরাপদ করা আপনাদের প্রথম দায়িত্ব। যুদ্ধের জন্য অর্থের অভাব নেই, অথচ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অর্থের অভাব—এই বৈপরীত্য কোনো সভ্য পৃথিবীর পরিচয় হতে পারে না।

পৃথিবী, তুমি জাগ্রত জনতার। তোমার মানুষ জেগে উঠুক। তারা প্রশ্ন করুক, তাদের ভোটে নির্বাচিত নেতারা তাদের জীবন নিয়ে কী করছেন। তারা জবাবদিহি দাবি করুক। কারণ, জনগণের ভোট কোনো নেতাকে মানুষের জীবন ধ্বংস করার অধিকার দেয় না।

আর যারা মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ক্ষমতায় এসে মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে, তাদের উদ্দেশে আমার শেষ কথা-

নিকুচি করি এই নেতৃত্বের!

রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন