যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে ধ্বংস করার হুমকি দেওয়ার পর তেহরান তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করছে দেশটি। পাশাপাশি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে খামেইনির বার্তা পৌছে দেওয়া হয়েছে। এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা।
মার্কিন এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং তারা এখন ওয়াশিংটনের নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গণমাধ্যমকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো ইরানের বাকি অংশও ‘ধ্বংস’ করতে হতে পারে।
এদিকে ইরান হরমুজ প্রণালির কাছে কেশম দ্বীপের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করার পর তেহরান তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছিল। তখন ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি বড় ধরনের হামলা পুনরায় শুরু করে, তবে এর প্রতিশোধ হবে ভয়ানক।
কী ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ইরান
ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি পারমাণবিক ও শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে তেহরান এতে কড়া সাতটি দাবি তুলে ধরে। এসব দাবি পূরণ হলেই কেবল এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে তেহরানের এই প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে দেখছে।
ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ক আলোচনা পুনরায় শুরুর শর্ত হলো তাদের সাতটি দাবি পূরণ করা। এই দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের এলাকায় ইরানের বন্দরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া।
ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তার রাশিয়া সফর
ইরান রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি আলোচনার জন্য মস্কো সফর করেন। এই সফরের সময় রেজায়ি বলেন, ‘কূটনীতির ক্ষেত্রে আমরা আমেরিকানদের কাছে সাতটি শর্ত দিয়েছি। যতক্ষণ না তারা আমাদের এই সাতটি শর্ত পূরণ করছে, ততক্ষণ আমরা হরমুজ প্রণালি খুলে দেব না এবং কোনো আলোচনাতেও বসব না।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলেছে, বৃহত্তর শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরুর আগে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা বিষয়ক একটি চুক্তি যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হতে হবে।
ইরান কীভাবে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে
বৃহস্পতিবার ক্রেমলিনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রেজাই। এ সময় তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেইনির একটি বার্তা পুতিনের কাছে পৌঁছে দেন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এই বার্তার বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
ইরানি দূতাবাসের ভাষ্য অনুযায়ী, রেজাই এই আলোচনাকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে অভিহিত করলেও এ বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।
ইরানকে রাশিয়ার সামরিক সহায়তা
এদিকে দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধে নিজেদের অস্ত্রের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও, রাশিয়া ইরানকে নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য ৯০টি হেলিকপ্টার-মাউন্টেড লঞ্চার (ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র) সরবরাহ করতে রাজি হয়েছে।
পত্রিকাটি রাশিয়ার একটি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের উৎপাদন সময়সূচি পর্যালোচনা করেছে। সেখানে দেখা গেছে, হেলিকপ্টার-মাউন্টেড লঞ্চারের একটি অর্ডারের বিপরীতে এমন একটি কোড ব্যবহার করা হয়েছে, যা রাশিয়ার প্রতিরক্ষা নথিপত্রে ইরানকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। এ ছাড়া ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই দুই দেশ বর্তমানে সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে। ইরান রাশিয়াকে ‘শাহেদ’ ড্রোন সরবরাহ করেছে, যা রাশিয়া কিছুটা পরিবর্তন করে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। এর বিনিময়ে রাশিয়া ইরানকে সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করেছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া রাশিয়া ইরানের কাছে কাঁধে বহনযোগ্য ‘ভারবা’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করেছে এবং তেহরানের সঙ্গে এমন কিছু তথ্য শেয়ার করেছে, যা পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের অনাবাসিক স্কলার নিকোল গ্রাজেভস্কি দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘এটি প্রমাণ করে যে যুদ্ধের কারণে নিজেদের অস্ত্রের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখতে আগ্রহী। এ ছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোর আপত্তির বিষয়েও তারা আগের চেয়ে অনেক কম উদ্বিগ্ন।’
গত অক্টোবরের শুরুর দিকে পুতিন জানিয়েছিলেন, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে মধ্যস্থতায় অংশ নিতে রাশিয়া প্রস্তুত রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেজাই জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে রাশিয়া থেকে ইরান পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব গ্যাস পাইপলাইন ইরানের গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রির পথ সুগম করবে।
তেহরান জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র হামলার সময়—যা ৪০ দিন ধরে চলেছিল—ইরানের প্রাকৃতিক গ্যাস শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর পাশাপাশি, রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের নাগরিকদের ইরান ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করেছে; কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে যে, ইরানকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।
আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে ইরান আলোচনা করছে?
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যখন ইরানে হামলা শুরু করে, এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য স্থাপনায় আঘাত হেনেছিল।
ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করে বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় হামলা শুরু করে, তবে যেকোনো রাষ্ট্র যদি ইরানকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করে, তবে সেই রাষ্ট্রটিও একটি ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে গণ্য হবে।
বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।
আরাঘচির টেলিগ্রাম চ্যানেলের তথ্য অনুযায়ী, তারা আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আরাঘচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গেও কথা বলেছেন। তাদের আলোচনায় এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা উন্নয়নের প্রচেষ্টাগুলো উঠে এসেছে।
এ ছাড়া আরাঘচি কুয়েত ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও উত্তেজনা কমানোর (ডি-এসক্যালেশন) উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান বিন জাসিম আল থানির সঙ্গে এক ফোনালাপে আরাঘচি উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছেন। শেখ মোহাম্মদ সমুদ্রপথে অবাধ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আরাঘচি ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যকার ফোনালাপে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল।
ইরান এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে; সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সেখানে বেশ কয়েকটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের ইরাক ও কাতার, এবং সেই সঙ্গে ভারত ও চীনকে তাদের জাহাজ চলাচলের বিধিনিষেধ থেকে ছাড় দিয়েছে।
কী বলছেন ট্রাম্প
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। যার একটি বড় কারণ হলো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং এর ফলে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে জনগণের ক্ষোভ। তা সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর আরও হামলার সম্ভাবনা নাকচ করে দেননি।
বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তাকে হয়তো ইরানের ‘বাকি অংশটুকুও ধ্বংস’ করতে হতে পারে।
ইরানের সাবেক কূটনীতিক হাদি আফগাহি আল জাজিরাকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নমনীয়তা প্রদর্শন করে, তবে তেহরান একটি সমঝোতার পথ সহজ করতে পারে। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, ট্রাম্প আসলে যুদ্ধ চান না, কারণ যুদ্ধের ফলে তারই বেশি ক্ষতি হবে।
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা আগে থেকে বলা কঠিন।
আফগাহি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ট্রাম্প এখনও যুদ্ধবাজদের একটি দলের দ্বারা পরিবেষ্টিত, যার মধ্যে জ্বালানিমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীও রয়েছেন।