ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একদিকে হুমকি-পাল্টা হুমকি চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে আলোচনা ও বার্তা আদান-প্রদান চলছে। একে অপরকে নানা শর্তের বিনিময়ে আশ্বাস দিয়েও চলেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি গতকাল সোমবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ‘বৈধ’ দাবিগুলো মেনে নিলে দুদিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া সম্ভব।
তেহরানে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে বাঘায়ি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে কোনো পরোক্ষ আলোচনার ভিত্তি হিসেবে এখনও সেপ্টেম্বরে তেহরানের প্রস্তাব করা সাত দিনের পরিকল্পনাটি বহাল রয়েছে। তবে সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে ইরান পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের সময়সীমা কমিয়ে দুদিন করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা জানিয়েছি, ইরানের দাবিগুলো পূরণ করা হলে অল্প সময়ের মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং আলোচনা শুরু করার সুযোগ তৈরি হবে।’ তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে পরবর্তী প্রক্রিয়া কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর।
বাঘায়ি বলেন, ইরান তাঁর দাবিগুলো ‘স্পষ্ট, যুক্তিসংগত ও যৌক্তিকভাবে’ তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না করে এবং তেহরানের ‘বৈধ’ দাবিগুলো মেনে না নেয়, তাহলে কোনো সমঝোতা হবে না। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিও খুলে দেওয়া বা সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
চীনা বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার খবর বলছে, যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্তসংবলিত সাত দিনের পরিকল্পনাটি গত ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠিয়েছিল ইরান। এরপর প্রস্তাবটি নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে যৌথ হামলা চালায়। জবাবে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে দেশটি।
নতুন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে: তেহরান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকি দেওয়ার পর রোববার ইরান সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা আগের সংঘাতের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
মিডল ইস্ট আইয়ের খবর বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে নতুন করে বোমা হামলা শুরুর হুমকি বারবার সামনে আসছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, ‘ভবিষ্যতে সম্ভাব্য কোনো যুদ্ধ আগের সংঘাতের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সেই যুদ্ধ কখন শেষ হবে বা কী শর্তে শেষ হবে, তা নির্ধারণের অবস্থানে থাকবেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট।’
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের বাকি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে দ্রুত হামলা চালানো সম্ভব। এর পরিপ্রেক্ষিতেই আকরামিনিয়া এ মন্তব্য করেন।
৩১ অক্টোবর ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের এখনও একটি বা দুটি স্থাপনার কাজ বাকি আছে। তবে সেগুলোতে হামলা চালাতে আমাদের ১০ মিনিটই যথেষ্ট।’
এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে তিনি বিশেষভাবে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের কথা উল্লেখ করেন। এটি ইরানের একটি সন্দেহভাজন ভূগর্ভের পারমাণবিক স্থাপনা। ১ নভেম্বর আইওয়ায় এক নির্বাচনী সমাবেশেও তিনি এ স্থাপনায় হামলার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ৩১ অক্টোবর এক ফোনালাপে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে হামলা চালানোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প আলোচনার জন্য আরও সময় দেওয়ার পক্ষে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পারমাণবিক হামলা হতে পারে
এদিকে, মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন গত রোববার গভীর রাতে দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত কয়েক দিনের মধ্যেই নিতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন।
তার অভিযোগ, মধ্য ইরানের একটি সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার অনুমোদন দিতে ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন নেতানিয়াহু। খবর আনাদোলু এজেন্সির।