ইসরায়েলের ডান ও বাম উভয় শিবিরের কাছে গত মঙ্গলবারের জাতীয় নির্বাচন দেশটির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ছিল। বাকি বিশ্বের মানুষের কাছে এই নির্বাচন খুব বেশি অর্থ বহন করে না। কারণ আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের তরুণদের সঙ্গে দূরত্ব দূর করার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো এই নির্বাচনের আলোচনার বিষয় ছিল না।
নির্বাচনে প্রায় ৯০ শতাংশ ইসরায়েলি নাগরিক ভোট দিয়েছেন। ১৯৯৯ সালের পর থেকে দেশটিতে ভোটারের উপস্থিতির হার এবারই ছিল সবচেয়ে বেশি।
পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর এবং গাজা ভূখণ্ডে সামরিক দখলের নিচে বাস করা প্রায় ৫০ লাখ ফিলিস্তিনির এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না। যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে তাদের পৌঁছানোর কোনো পথ নেই।
ইসরায়েলের নাগরিক প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনি। তাদের ভোট দেওয়ার হার ছিল উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর শাসনের অবসান ঘটাতে অনেক ইহুদি ভোটারের মতো তারাও অংশ নেন।
বুধবার কোনো প্রমাণ ছাড়াই নেতানিয়াহু দাবি করেন নির্বাচনে ভোট চুরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঘুষ, হুমকি, জালিয়াতি এবং নিষিদ্ধ সফটওয়্যার ব্যবহার করে সন্ত্রাসী আরব দলগুলো এই ভোট চুরি করেছে।’
এই নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, পশ্চিম তীরে দখলদারত্বের বিস্তার ও বসতি স্থাপন কর্মসূচি এবং গাজায় চালানো নিষ্ঠুর নীতি যে অপরিবর্তিত থাকবে, তা সবাই জানেন।
৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা ও গাজার ধ্বংসযজ্ঞ
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলার হয়। এরপর গোয়েন্দা ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করছে দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। বিরোধীরা এই ব্যর্থতার স্বাধীন তদন্ত দাবি করছেন। নেতানিয়াহু ও তাঁর অনুসারীরা উল্টো সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক তাণ্ডব বিশ্বমঞ্চে দেশটিকে একঘরে করে ফেলেছে। নেতানিয়াহু যাকে ‘ভয়ংকর প্রতিশোধ’ আখ্যা দিয়েছিলেন, সেই অভিযানে ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের প্রায় সবাই নিরীহ বেসামরিক মানুষ। গাজার প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী নিজেদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত হয়েছে।
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই পরোয়ানা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। ৭ অক্টোবরের গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায় নিয়ে দেশে ব্যাপক বিতর্ক চললেও গাজা যে ধ্বংস হয়ে গেছে তা নিয়ে কারোর কেউ দ্বিমত করেন না। বিশ্ববাসী এই হত্যাকাণ্ডে শিউরে উঠলেও ইসরায়েলি সমাজের বড় অংশ এতে কোনো অনুশোচনা বোধ করে না।
বিকল্পের নামে একই কট্টরপন্থা
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং গাদি আইজেনকোটের ইয়াসার পার্টি এই দুই দলই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ঘোর বিরোধী। আন্তর্জাতিক মহলের বহু বছরের দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে ইসরায়েলের প্রায় সব দল পুরোপুরি বর্জন করেছে। ১৯৯০-এর দশকের অসলো শান্তি আলোচনাকে তারা পুরোনো অবাস্তব ইতিহাস মনে করে।
গাদি আইজেনকোট ব্যক্তিগতভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি কখনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হতে দেবেন না। তিনি ঘোষণা করেছেন নির্বাচিত হলে ১৮ মাসের মধ্যে গাজা থেকে হামাসের শাসন সম্পূর্ণ উৎখাত করবেন।
গাদি আইজেনকোটের সম্ভাব্য জোটের অন্য শরিক কট্টর ডানপন্থী দলগুলো চরম ফিলিস্তিনিবিদ্বেষী। এভিগডোর লিবারম্যানের দল ‘ইসরায়েল বেইতিনু’ প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ভেঙে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। লিবারম্যান পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জর্ডানের হাতে ঠেলে দেওয়ার কথা বলছেন।
ফিলিস্তিনিদের নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার না দিয়ে পুরো পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের অংশ বানিয়ে নেওয়ার বিষয়ে লিকুদ ও ইয়াসার পার্টির মধ্যে কোনো তফাত নেই। পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন এবং বর্ণবাদী নিপীড়নের জটিল কাঠামো নিয়ে ইসরায়েলি রাজনীতিতে কোনো দ্বিমত নেই।
গাজার ধ্বংসযজ্ঞকে সব দলের সমর্থন
গাজার ওপর চালানো সামরিক তাণ্ডবকে ইসরায়েলি রাজনীতিকদের সবাই নৈতিকভাবে সঠিক এবং অপরিহার্য মনে করেন। গাজায় দুর্ভিক্ষ এবং ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের কারণে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর কোনো প্রভাব নেই।
গাদি আইজেনকোটের মতো বিরোধী নেতারা গাজায় অভিযানের বিরোধিতা করেননি। নেতানিয়াহু কেন যুদ্ধের শুরুতেই জিম্মিদের ছাড়িয়ে আনতে যুদ্ধবিরতি করেননি, কেবল সেই কৌশলগত বিষয়েই তাদের আপত্তি ছিল। ফিলিস্তিনের সম্পূর্ণ ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে ইসরায়েলি সমাজে কোনো রাজনৈতিক মতবিরোধ নেই।
পশ্চিম তীরে জমি দখল ও চরমপন্থী বসতি স্থাপন
এই নির্বাচনের পর ক্ষমতায় যে-ই আসুক না কেন পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জমি দখল ও নতুন নতুন ইহুদি বসতি নির্মাণের কাজ অব্যাহত থাকবে। লিকুদ পার্টির উগ্র ধর্মীয় শরিক দলগুলো পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালানো বসতি স্থাপনকারীদের প্রকাশ্য মদদ দিচ্ছে।
যদিও গাদি আইজেনকোট এই উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের তাণ্ডবকে ‘ইহুদি সন্ত্রাস’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি সংঘাত কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই প্রতিশ্রুতির পেছনে ফিলিস্তিনিদের প্রতি কোনো মানবিক সহমর্মিতা নেই। পশ্চিম তীরে রক্তক্ষয়ী সংঘাত মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নেমে আসবে, সেই আশঙ্কা থেকেই গাদি আইজেনকোট রাশ টানার কথা বলছেন।
ফিলিস্তিনের বিতর্কিত ‘ই-১’ অঞ্চলে নতুন বসতি গড়ার বিরোধিতা করলেও সার্বিক বসতি সম্প্রসারণ বন্ধের কোনো পরিকল্পনা গাদি আইজেনকোটের নেই। ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার দীর্ঘমেয়াদি সরকারি নীতিতে সব দলই একমত।
সামরিক দুর্গ ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে দেশকে ঘিরে কৃত্রিম ‘বাফার অঞ্চল’ (বাফার জোন) তৈরির নীতি নিয়েছে ইসরায়েল। গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ছাড়াও লেবানন এবং সিরিয়া সীমান্তে স্থানীয় অধিবাসীদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে সামরিক বলয় তৈরি করা হয়েছে। সব রাজনৈতিক দল এই সামরিক দখলদারত্বকে সমর্থন দিচ্ছে।
২০২৫ সাল থেকেই নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে প্রাচীন স্পার্টা নগরীর মতো ‘সুপার স্পার্টা’ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। গাদি আইজেনকোট এই চরমপন্থী ভাষা পরিহার করলেও সংঘাত বন্ধের কোনো কার্যকর পথ দেখাননি। অবিলম্বে নীতির বদল না ঘটালে নেতানিয়াহু থাকুন বা গাদি আইজেনকোট আসুন, দেশ অনন্ত যুদ্ধের পথেই হাঁটবে।
যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতি নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছে। ইসরায়েলের রাজনীতিকরা এইসব আন্তর্জাতিক নিন্দাকে গুরুত্ব না দিয়ে সরাসরি ইহুদিবিদ্বেষ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন।
নির্বাচনের চূড়ান্ত জয়-পরাজয়ে কার হাতে ক্ষমতা গেল, তা ফিলিস্তিনিদের কাছে সম্পূর্ণ অর্থহীন। লিকুদ পার্টির কট্টর ধর্মীয় জোট হোক কিংবা ইয়াসার পার্টির তথাকথিত মধ্যপন্থী সরকার হোক—দখলদারত্বের নির্মম বাস্তবতায় কোনো ছেদ পড়বে না।
ফিলিস্তিনিদের অধিকার পদদলিত করার এই সর্বসম্মত নীতি ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমশ একঘরে করে ফেলবে। বিশ্বজুড়ে মুক্তিকামী মানুষের চোখে ইসরায়েল আজ নিষ্ঠুর দখলদার শক্তির প্রতীক। নির্বাচনের ব্যালট পেপারে এই আগ্রাসী নীতি বদলানোর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
তথ্যসূত্র: এমএস নাও, ফরেন অ্যাফেয়ার্স, নিউইয়র্ক টাইমস