Image description

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ  ও লুটপাটের ঘটনার পর রাজধানী প্যারিসের কেন্দ্রীয় অংশসহ বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে প্যারিসের কয়েকটি এলাকায় অননুমোদিত জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

বিবিসির খবরে জানা যায়, শহরের প্লাস দে লা রিপাবলিক ও লে আল এলাকায় স্থানীয় সময় রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ কার্যকর থাকবে বলে জানিয়েছে প্যারিস পুলিশ । সপ্তাহান্তে এসব এলাকায় বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়েছিলেন।

এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের মার্সেই, বোর্দো, নিস ও লিওঁ এবং উত্তরাঞ্চলের লিলসহ বিভিন্ন শহরে আংশিক কারফিউ জারি করা হয়েছে। কোথাও কোথাও চলাচল, আবার কোথাও জমায়েতের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়ে বিরোধী রাজনীতিকদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেছেন, কয়েকটি শহরে পুলিশ ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল’।

রোববার তিনি পদত্যাগের চেষ্টা করলেও প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রোঁ তা গ্রহণ করেননি।

সোমবার সংকট নিয়ে বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী কারফিউ জারির ক্ষমতা স্থানীয় মেয়রদের দেওয়া হচ্ছে। তবে কোন কোন শহরে এ ব্যবস্থা কার্যকর হবে, তা নির্দিষ্ট করে জানাননি তিনি। দেশে জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনাও নাকচ করেননি প্রধানমন্ত্রী।

সহিংস বিক্ষোভে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পুনরুদ্ধারে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন লেকর্নু। একই সঙ্গে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।  লুটপাটের কারণে যারা কাজে যেতে পারছেন না, তাদের জন্য আংশিক বেকারত্ব সহায়তা তহবিলেরও ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী।

 

এদিকে দাঙ্গায় জড়িত সম্ভাব্য উসকানিদাতাদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছেন ২০০ তদন্তকারী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের দপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে।

ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিআই) প্রধান অ্যালাঁ দি ক্রেসেনজো জানিয়েছেন, সহিংসতায় দুই হাজারের বেশি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ মিলিয়ন ইউরো বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মার্সেইয়ের সিসিআই শাখার প্রধান জ্যঁ-লুক শোভাঁ বলেন, শহরটির অনেক দোকানমালিক গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে শঙ্কায় আছেন।

ফ্রান্সের দুই মন্ত্রী জানিয়েছেন, লুট করা পণ্য বিভিন্ন অনলাইন বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে। অনলাইন মার্কেটপ্লেস ভিন্টেডের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, চুরি করা পণ্য বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া তাদের নীতিমালায় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ ধরনের পণ্যের বিজ্ঞাপন শনাক্ত ও সরিয়ে ফেলতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

গত মাসে স্কুলের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার উন্নতির দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম, জনসেবার অবনতি ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ এতে যুক্ত হয়। একই সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়ন ও বিভিন্ন বিক্ষোভকারী গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়।

কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সপ্তাহান্তের বিক্ষোভ ও সহিংসতায় প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। এ সময় দুই হাজার ৫০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, পুলিশের ছোড়া  গ্রেনেডে এক বিক্ষোভকারীর হাত উড়ে গেছে। এ ছাড়া প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

মধ্যাঞ্চলীয় লিমোজ শহরে শনিবার বিক্ষোভকারীদের লাগানো আগুনে ১৯ শতকের ঐতিহাসিক সিটি হলটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুনের তীব্রতায় ভবনটির ছাদ ও ঘড়ির টাওয়ার ধসে পড়ে। প্যারিস, মার্সেইসহ বিভিন্ন শহর ও ছোট জনপদে গাড়ি ও ভবনে আগুন দেওয়া এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে ফ্রান্সে অবস্থানরত নিজ দেশের নাগরিকদের বিক্ষোভপ্রবণ এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। চীন ও জার্মানিও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে।

সহিংসতায় বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন রাজনীতিক। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুর অভিযোগ, কিছু গোষ্ঠী আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগপর্যন্ত দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। তবে দলটির নেতা ও আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ এ অভিযোগের প্রমাণ দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রমাণ দিতে না পারলে ক্ষমা চেয়ে এ ধরনের বক্তব্য বন্ধ করারও দাবি জানান তিনি।