Image description

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাগান থেকে জলপাই চুরি করাকে বৈধতা দিয়ে ধর্মীয় ফতোয়া জারি করেছেন ইসরাইলের প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা রাব্বি ডোভ লিওর। তার এই ফতোয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

শুক্রবার দেওয়া ওই ফতোয়ায় ডোভ লিওর দাবি করেন, ইসরাইলি বিধিনিষেধের কারণে যে ফিলিস্তিনি কৃষকরা মৌসুমে নিজেদের জলপাই সংগ্রহ করতে পারছেন না, বিগত বছরগুলোতে জলপাই ভোগ করার মাধ্যমে তারা ইতোমধ্যে যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ পেয়ে গেছেন। ফতোয়া অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি ভূমির ওপর মালিকানা দাবি করার জন্য ইহুদিরা এসব ফিলিস্তিনি বাগান থেকে জলপাই তুলে নিতে পারবে।

পশ্চিম তীরে যখন ইসরাইলি দখলদার ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও তাণ্ডব অব্যাহত রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে ১৯৩৩ সালে পোল্যান্ডে জন্ম নেওয়া রাব্বির ফিলিস্তিনিদের খামার থেকে জলপাই চুরি করাকে এক ধরনের ‘অতিরিক্ত পুণ্য’ বা মহৎ কাজ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ইহুদি বসতির বাইরের জমিগুলোও বসতি স্থাপনকারীদের ‘দখল’ করা উচিত, যাতে জনসমক্ষে ‘মালিকানা জাহির’ করা যায় এবং বাইবেলের নির্দেশ অনুসরণ করা সম্ভব হয়।

ফতোয়ায় বলা হয়, ‘ইহুদি জাতি কখনোই ইসরাইলের ভূমির ওপর থেকে দাবি ছেড়ে দেয়নি, যা আমরা প্রতিদিনের প্রার্থনায় স্মরণ করি। আরবরা কখনোই ইহুদি জাতি বা কোনো একক ইহুদির কাছ থেকে এই জমি কেনেনি। তাই এটি তাদের হাতে থাকা এক ধরনের চুরি করা জমি... তারা কোনোভাবেই এটি ক্রয় করেনি এবং এটি ইহুদিদেরই মালিকানাধীন রয়েছে।’

 

জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে সহিংসতা

এমন সময়ে এই ধর্মীয় ফতোয়াটি এলো, যখন জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা মারাত্মকভাবে বেড়েছে। গত শুক্রবার পশ্চিম তীরজুড়ে জলপাই সংগ্রহ করার সময় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের ৩৪টি হামলায় অন্তত ১৯ জন আহত হয়েছেন।

দৈনন্দিন এই সহিংসতার সংবাদ সংগ্রহের সময় ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর হয়ে কর্মরত এক আমেরিকান ফটোসাংবাদিকও বসতি স্থাপনকারীদের আক্রমণের শিকার হন। এছাড়া এ দিন পাঁচটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ইসরাইলি বিধিনিষেধ ও বসতি স্থাপনকারীদের প্রাণঘাতী হামলার ঝুঁকির কারণে বহু ফিলিস্তিনি কৃষক তাদের নিজেদের কৃষিজমিতেই যেতে পারছেন না।

ধর্মীয় মহলে প্রতিক্রিয়া ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া

তবে সব ইহুদি ধর্মীয় নেতা ফিলিস্তিনিদের জলপাই চুরির এই আহ্বানকে সমর্থন জানাননি। গুশ এতজিওন বসতির ধর্মীয় কাউন্সিলের রাব্বিরা এক যৌথ চিঠিতে ফিলিস্তিনিদের ফসল অবৈধভাবে তুলে নেওয়াকে ‘চুরি’, ‘ধর্মদ্রোহিতা’ এবং ‘নৈতিক অধঃপতন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

 

প্রায় ৮০০ অর্থোডক্স রাব্বির সংগঠন ‘জোহার’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কেবল রাষ্ট্রেরই কোনো সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার কর্তৃত্ব রয়েছে। রাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত জলপাইয়ের ওপর আরবদের মালিকানা স্বীকার করে, ততক্ষণ তা তাদেরই সম্পত্তি।

ইসরাইলি রাজনীতির বিশ্লেষক মামুন আবু আমের আল জাজিরাকে জানান, অন্যান্য ধর্মীয় দলের পক্ষ থেকে রাব্বি ডোভ লিওরের মন্তব্যের বিরোধিতা করার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘যে রাব্বিরা এই আহ্বানের বিরোধিতা করেছেন, তাদের অবস্থানটি রাজনৈতিক কৌশল বা সরকারের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীগুলোর চাপের মুখে হতে পারে। তারা বিশ্বমঞ্চে এটা বোঝাতে চান যে, এগুলো চরমপন্থি কয়েকজনের বিচ্ছিন্ন বক্তব্য, যা সাধারণ বসতি স্থাপনকারীদের মতামতের প্রতিনিধিত্ব করে না।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘ইসরাইল সরকারও তুলে ধরার চেষ্টা করছে যে এই সহিংসতায় জড়িতরা সীমিত একটি দল এবং অধিকাংশ বসতি স্থাপনকারী শান্তিকামী ও আইন মেনে চলা নাগরিক। তারা পুরো বিষয়টিকে ‘হিলটপ ইউথ’ নামের একটি গোষ্ঠীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রমাণ করতে চায়।’

তবে চরমপন্থি বসতি স্থাপনকারী দলগুলোর মধ্যে রাব্বি ডোভ লিওরের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে ‘হিলটপ ইউথ’-এর সদস্যরা তার কঠোর ধর্মীয় নির্দেশ নির্দেশাবলী অন্ধভাবে অনুসরণ করে, যা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের ভূমি সংক্রান্ত সমঝোতার সম্পূর্ণ বিরোধী।

তিনি ইসরাইলের ‘রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট’ আন্দোলনেরও একজন শীর্ষ ব্যক্তিত্ব এবং দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভিরের নেতৃত্বাধীন অতি-ডানপন্থি দল ‘ওতজমা ইহুদিত’ (জুয়িশ পাওয়ার)-এর আধ্যাত্মিক অভিভাবক হিসেবে পরিচিত।

 

আবু আমের উল্লেখ করেন, ‘বেন-গাভির মূলত রাব্বি ডোভ লিওরের ধর্মীয় ফতোয়ার ওপর নির্ভর করেন, যা বাইবেলের বিভিন্ন বিষয়ের চরমপন্থি ব্যাখ্যা থেকে প্রাপ্ত।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টিকটক প্ল্যাটফর্ম, প্রচারণামূলক কৌশল ও পপুলিস্ট বক্তব্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক লড়াই চালাচ্ছেন বেন-গাভির। ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর ইসরাইলি সমাজে চরমপন্থার একটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে, যা তাকে ভোট পেতে সাহায্য করছে।’

অন্যদিকে, ইসরাইলি সংসদের (নেসেট) বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির সদস্য গিলাদ কারিভ লিওরের তীব্র সমালোচনা করে অভিযোগ করেছেন যে, তিনি ও তার অনুসারীরা ইসরাইলকে চরম নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।

কারিভ বলেন, ‘এই ইস্যুতে যারা নিরপেক্ষ বা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে, তারা প্রকৃতপক্ষে রাব্বি ডোভ লিওর ও তার অপরাধী চক্রের সঙ্গেই হাত মেলাচ্ছে।’