বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ দফা প্রস্তাব দীর্ঘদিনের এই সমস্যাটিকে আবারও আলোচনায় এনেছে। তবে অতীতে আওয়ামী লীগ সরকার এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও নিরাপদ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে একই ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিল। সেগুলোর কোনোটিই বড় ধরনের বাস্তব অগ্রগতি আনতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন করে প্রস্তাব তৈরির চেয়ে সেটি বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
নিপীড়নের শিকার হয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে। তবে সবচেয়ে বড় ঢল নামে ২০১৭ সালের আগস্টে। তখন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
এর ৯ বছর পরও আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যায়নি। বরং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখে দাঁড়িয়েছে।
এর মধ্যে সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণও কমছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে তারেক রহমান বলেন, ২০২৫ সালে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় মানবিক সহায়তার জন্য ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ চাওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালে সেই আবেদন কমে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এই অর্থ শুধু ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তিনি আরও আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন।
জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার নানা সময়ে উদ্যোগ নিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন প্রস্তাব থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকারের সাত দফা প্রস্তাবেও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা ছিল।
এসব প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, মানবিক সহায়তা বাড়ানো, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ও ছিল।
তারেক রহমানের পাঁচ দফা প্রস্তাবে নতুন করে সীমান্তপারের নিরাপত্তা হুমকির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাদকপাচার, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা ও অবৈধ অস্ত্র পাচারের মতো বিষয় রয়েছে।
তবে আগের উদ্যোগগুলোর মতো নতুন প্রস্তাবটিও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক নাদিয়া রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ব্যর্থ প্রত্যাবাসনের এই চক্র ভাঙতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জবাবদিহি, আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় প্রণোদনার মাধ্যমে ভারসাম্য রাখতে হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, তা না হলে সর্বশেষ পাঁচ দফা প্রস্তাবও আগের উদ্যোগগুলোর মতো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে পারে।
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মঞ্জুর হোসাইন বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের যেকোনো উদ্যোগের কেন্দ্রে জবাবদিহি থাকতে হবে।
তিনি বলেন, জবাবদিহির আওতায় আনার বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা না থাকলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। তাই প্রত্যাবাসন, মানবিক সহায়তা ও জবাবদিহিতাকে আলাদা বিষয় হিসেবে না দেখে একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রোহন গুণারত্ন স্ট্রিমকে বলেন, মিয়ানমারের চলমান অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কঠিন হয়ে পড়েছে। সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের বর্তমান সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা জরুরি।