সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র হুতি গোষ্ঠী। গতকাল শনিবার তারা এ দাবি করেছে। এছাড়া দেশটির লোহিত সাগর উপকূলে জ্বালানি স্থাপনাতেও হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে গোষ্ঠীটি।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াদকে লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে। তবে অন্য কোনো হামলা বা হতাহতের খবর নিশ্চিত করেনি তারা।
শনিবার সৌদি রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে জ্বালানি ট্যাংক থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। ওই সময় কিছুক্ষণের জন্য বিমান চলাচলেও সমস্যা হয়।
শনিবার রিয়াদে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪ জানিয়েছে, বেশ কিছু ফ্লাইট বিলম্বিত ও বাতিল হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, আরামকোর একটি পুড়ে যাওয়া জ্বালানি ট্যাংকের আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে দেখা গেছে দমকলকর্মীদের।
এর আগে সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ রিয়াদসহ বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠায়। শনিবার সকালে পরে নিরাপদ থাকার বার্তা দেওয়া হয়।
হুতিদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্থ সৌদি আরামকোর একটি ডিপো। ফাইল ছবি/ সংগৃহীত
রিয়াদের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সতর্কসংকেতের পর তারা একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। উত্তর রিয়াদের এক বাসিন্দা বলেছেন, ‘আমি সতর্কসংকেত শুনেছি। এরপর আমার ঘরের জানালা কেঁপে ওঠে। ঘটনাটি সত্যিই ভয়ংকর ছিল। আমি এমন কিছু আশা করিনি।’
জুলাইয়ে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সৌদি আরববিরোধী হামলা বাড়ার পর শনিবার প্রথমবারের মতো রিয়াদে বিমান হামলার সতর্কসংকেত শোনা যায়।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। সম্ভাব্য ফ্লাইট বাতিল ও অন্যান্য ভ্রমণ সমস্যার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে আসছে। এর মধ্যে বেসামরিক বিমানবন্দরও রয়েছে। এই সামরিক সংঘাত দ্রুত বড় আকার নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা। মধ্যপ্রাচ্যে এবং এই অঞ্চলের ভেতর দিয়ে ভ্রমণের বিষয়েও মার্কিন নাগরিকদের নতুন করে ভাবতে বলা হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিশ, তাইফ, ফারাসান ও ইয়ানবু শহরে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো হামলার চেষ্টাও প্রতিহত করা হয়েছে।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া আল-সারিয়া জানিয়েছেন, রিয়াদের ‘গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা’ এবং লোহিত সাগরের উপকূলীয় শহর ইয়ানবুতে সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানি আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে বিপুলসংখ্যক ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
সৌদি আরবের হামলার জবাবে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। সারিয়া আরও অভিযোগ করেছেন, গত এক সপ্তাহে সৌদি আরব ইয়েমেনে ৩০০টি হামলা চালিয়েছে।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে হুতিদের দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ চলছে। সৌদি আরব ওই সরকারকে সমর্থন করে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বেশ কয়েকবার হামলা চালিয়েছে হুতিরা। চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের আকাশে একটি সৌদি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবিও করেছে তারা।
হাতে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র কাধে এক হুতি সদস্য। ফাইল ছবি / রয়টার্স
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, শনিবার হুতি ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর লড়াইয়ে ৪৮ জন নিহত হয়েছেন বলে দুই পক্ষের সামরিক সূত্র জানিয়েছে। হুতিরা জানিয়েছে, তাদের ৩১ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। সরকারি বাহিনীর পক্ষ থেকে ১৭ সেনা নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
জাতিসংঘের সংস্থা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) শুক্রবার জানিয়েছে, সাম্প্রতিক লড়াইয়ের কারণে ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৪ হাজার ৭৯৬ ছাড়িয়েছে।
সম্প্রতি হুতিরা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগর মোখা ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এই এলাকা উপসাগরীয় দেশগুলোর এশিয়া ও ইউরোপে তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের প্রবেশদ্বার।
হুতিরা জানিয়েছে, তাদের নৌ অবরোধের সিদ্ধান্ত সৌদি আরবের পাল্টা অবরোধের জবাবে নেওয়া হয়েছে। সৌদি আরব হুতি নিয়ন্ত্রিত উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের বন্দর ও বিমানবন্দরে অবরোধ আরোপ করেছে বলে অভিযোগ করেছে গোষ্ঠীটি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি জাহাজগুলো তেল রপ্তানিতে লোহিত সাগরের এই নৌপথের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে।
এদিকে বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে তেলের দামে কী প্রভাব পড়বে তা অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। শুক্রবার বিনিয়োগকারীদের দেওয়া এক বার্তায় প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, যুদ্ধের শেষ পরিণতি কী হবে, তা তারা এখনো বুঝতে পারছে না।
সূত্র : বিবিসি