Image description
২ এপ্রিল, ইরানের ছোড়া কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি এফ-১৫ই ‘স্ট্রাইক ঈগল’ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর ইতিহাসের অন্যতম বড় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। ওই ঘটনায় দুই মার্কিন সেনা যুদ্ধবিমান থেকে ইরানের দুর্গম পাহাড়ে পড়ে যান।
 
বিমানের পাইলট—যাকে মিশনের ভাষায় ‘আলফা’ বলা হয়—কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার হন। কিন্তু অস্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, ‘ব্রাভো’, প্রায় ৫০ ঘণ্টা শত্রু নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আটকে ছিলেন। ইরানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পিঠে গুরুতর আঘাত নিয়ে একটি পাহাড়ি ফাটলে লুকিয়ে থেকে তিনি ইরানি বাহিনীর চোখ এড়িয়ে ছিলেন। পরে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়।
 
নিরাপত্তাজনিত কারণে তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। মিশনের কলসাইন ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’ নামে পরিচিত এই কর্মকর্তা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, কীভাবে প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি পাহাড়ি রিজ ভাঙা পিঠ নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন, দুই দিন ইরানি বাহিনীর কাছ থেকে লুকিয়ে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী তাকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনে।
 
তিনি তার বেঁচে থাকার সময়কার ‘সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্তের’ কথাও জানিয়েছেন—যখন তিনি প্রায় মুক্তপতনের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন।
 
‘আধুনিক যুগের এক অলৌকিক ঘটনা’
সিবিএসের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রাভো তার বেঁচে থাকার ঘটনাকে ‘আধুনিক যুগের এক অলৌকিক ঘটনা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
 
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানান, ওই রাতে ব্রাভোর মিশন ছিল ইসফাহানের দক্ষিণে একটি পাহাড়ি এলাকার কাছে থাকা শিল্প স্থাপনায় হামলা চালানো। ধারণা করা হয়, ইরান সেখানে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদানের বড় একটি অংশ সংরক্ষণ করে।
 
ব্রাভো বলেন, ‘সেদিন পর্যন্ত আমাদের কাছে যুদ্ধের অন্য যেকোনো দিনের মতোই ছিল। কিন্তু ইরানের একটি অস্ত্র আমাদের আঘাত করার মুহূর্তে সবকিছু বদলে যায়।’
 
তিনি সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে বলেন, আমেরিকার ৩ কোটি ডলার মূল্যের দুই আসনের এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানটি—যা কয়েক দশক ধরে মার্কিন বিমানযুদ্ধ অভিযানের অন্যতম প্রধান যুদ্ধবিমান—কাঁধে বহনযোগ্য একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হয়। অথচ ওই ধরনের একটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ১ লাখ ডলার হতে পারে।
 
ব্রাভো ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতকে বর্ণনা করেন, ‘মনে হয়েছিল যেন একটি মালবাহী ট্রেন এসে ধাক্কা দিয়েছে।’
 
তিনি বলেন, আলফা যুদ্ধবিমানটি বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দ্রুতই তারা বুঝতে পারেন, বিমানটি আর রক্ষা করা সম্ভব নয়। এরপর দুজনই যুদ্ধবিমান থেকে ইজেক্ট করে বেরিয়ে যান।
 
আলফা নিরাপদে ইজেক্ট করে বেরিয়ে যাওয়ার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত প্যারাসুট সামলাতে গিয়ে ব্রাভো প্রায় ৫ মাইল দূরে গিয়ে কঠিনভাবে মাটিতে অবতরণ করেন।
 
ব্রাভো বলেন, ‘একপর্যায়ে আমি ওপরে তাকিয়ে দেখলাম, কোনো প্যারাসুট নেই। জীবনে দেখা সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য ছিল সেটি।’
 
‘তখন আমি থেমে গেলাম এবং প্রার্থনা করলাম, “প্রভু, আপনার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক। তবে আমি যদি এখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারি, তাহলে আমার সাহায্য দরকার”।’
 
অত্যন্ত বেশি গতিতে মাটিতে আছড়ে পড়ায় তার মেরুদণ্ড, একটি হাত ও একটি কাঁধ ভেঙে যায়।
 
অন্ধকার কেটে যাওয়ার পর শত্রু এলাকায় নিজের অবস্থান বুঝতে পারেন ব্রাভো। এরপর সেখান থেকে পালানোর পরিকল্পনা শুরু করেন। তিনি নিজেকে দুই পাশে খাড়া পাহাড়ঘেরা একটি উপত্যকায় দেখতে পান। তাই নিরাপদ জায়গা হিসেবে ওপরে ওঠার সিদ্ধান্ত নেন। হাড় ভাঙা অবস্থাতেও তিনি প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি পাহাড়ি রিজে হেঁটে ও চড়ে ওঠেন।
 
সিবিএসকে ব্রাভো বলেন, ‘আমার চোট ছিল। কিন্তু আমরা যেসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, সেগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেয়া এবং তা মোকাবিলা করার প্রশিক্ষণ আমরা সবাই পেয়েছি। আঘাত থাকা সত্ত্বেও যত দ্রুত সম্ভব সেখান থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।’
 
হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘প্রেরণার অভাবকে কখনোই আপনাকে ইরানি টেলিভিশনে পৌঁছে দিতে দেবেন না।’
 
যেভাবে উদ্ধার করে মার্কিন বাহিনী
যুক্তরাষ্ট্রে এদিকে, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে মাঝরাতে ঘুম থেকে ওঠেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, দুই সেনাসদস্য জীবিত থাকুন বা মারা যান—যেভাবেই হোক তাদের ফিরিয়ে আনবে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
 
কুপার জানান, এরপর দুই কর্মকর্তাকে খুঁজে বের করতে বিশাল অভিযান শুরু করা হয়। এতে আকাশে শত শত সেনা এবং তাদের সহায়তায় আরও কয়েক হাজার সদস্য যুক্ত হন।
 
সেন্টকম প্রধান জানান, ইরানের মাটিতে ৯০ জনেরও বেশি মার্কিন সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়। ৪৬ বছর পর এটিই ছিল ইরানে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েনের প্রথম ঘটনা।
 
ছয় ঘণ্টার মধ্যেই আলফাকে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু ব্রাভোর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে তাকে প্রায় কোনো খাবার বা পানি ছাড়াই পাহাড়ে আরও একদিন একা থাকতে হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের অবস্থান জানিয়ে মার্কিন বাহিনীর কাছে একটি বার্তা পাঠাতে সক্ষম হন।
 
ব্রাভো যেখানে লুকিয়ে ছিলেন, তার কাছাকাছি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সদস্যদের ওপর হামলা চালাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী বোমারু বিমান ও ড্রোন ব্যবহার করে। এরপর চূড়ান্ত উদ্ধারকারী দলকে সেখানে পাঠানো হয়।
 
এই অভিযানে সিআইএও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইরানি বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে তারা একটি প্রতারণামূলক অভিযান চালায় এবং নিখোঁজ মার্কিন কর্মকর্তার অবস্থান শনাক্ত করতে গোপন প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
 
মিলিয়ন ডলার মূল্যের বিমান ব্যবহার করে প্রায় ৫০ ঘণ্টা ধরে তল্লাশি চালানোর পর অবশেষে ব্রাভোকে খুঁজে পাওয়া যায়।
 
উদ্ধারের মুহূর্তটিকে তিনি বর্ণনা করেছেন, ‘আমার জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত’ হিসেবে।