Image description

ভারতের দিল্লিতে এখন একসঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিন্টে ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনকে ঘিরে এই তিন নেতার উপস্থিতিই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। পুতিন গত ১১ সেপ্টেম্বর ভারতে পৌঁছেছেন। পরদিন ১২ সেপ্টেম্বর চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং দিল্লিতে পৌঁছেন। ২০১৯ সালের পর ভারতে সির এটি প্রথম সফর।

 

দিল্লিতে তিন নেতার এই উপস্থিতিকে শুধু কূটনৈতিক সাক্ষাৎ হিসেবে দেখছে না বিশ্ব। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের ভাবনা, এই সফরের মধ্যে লুকিয়ে আছে এশিয়ার বদলে যাওয়া ভূরাজনীতির বার্তা। তবে কি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অংশীদার ভারত মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গে আবারও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে? নাকি দিল্লি তার পুরোনো নীতি, অর্থাৎ কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রেখেই যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে নিজের স্বার্থে ভারসাম্য তৈরি করছে?

 

আমেরিকার উদ্বেগ কোথায়

 

ভারতকে পুরোপুরি নিজের বশে রাখা নিয়ে ওয়াশিংটন এখন বেশি উদ্বিগ্ন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র গত এক দশকে ভারতকে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলেছে। চীনের উত্থান ঠেকাতে কোয়াডে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া একসঙ্গে কাজ করছে। ভারত একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ক বজায় রাখছে এবং চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।

 

নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারত ব্রিকসকে পশ্চিমাবিরোধী জোটে পরিণত করতে চায় না, পশ্চিম ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে রাখতে চায়। অর্থাৎ দিল্লির বার্তা ‘আমরা ওয়াশিংটনের বন্ধু, কিন্তু ওয়াশিংটনের অনুসারী নই।’

 

 

পুতিনের সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ

 

পুতিনের দিল্লি সফরকে বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ব্যাপকভাবে খারাপ হয়েছে। ফলে ভারতের মতো বড় অর্থনীতি ও প্রভাবশালী দেশের প্রকাশ্য সমর্থন বা সহযোগিতা মস্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

 

গতকাল দিল্লিতে মোদি-পুতিন বৈঠকে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দুই দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্যও পুনর্ব্যক্ত করেছে। ভারত এখনো রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কিনছে। ফলে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক নয়, এর সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতি, নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।

 

সি চিনপিংয়ের উপস্থিতি

 

ভারত ও চীনের মধ্যে ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার সীমান্ত সংঘর্ষের পর সম্পর্ক তলানিতে নেমে গিয়েছিল। লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় ও ৪ জন চীনা সেনা নিহত হন। এটি ছিল ১৯৭৫ সালের পর দুই দেশের সীমান্তে প্রথম প্রাণঘাতী সংঘর্ষ। এরপর সীমান্তে দীর্ঘ সামরিক অচলাবস্থার পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসা, ভ্রমণ ও যোগাযোগেও বড় বাধা আসে।

 

তবে গত দুই বছরে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দুই দেশ সীমান্তে সেনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়। এরপর সরাসরি বিমান যোগাযোগ আবার চালু হয়েছে, চীনা ব্যবসায়ীদের ভিসা প্রক্রিয়া কিছুটা সহজ হয়েছে এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগও বাড়ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পাঁচ বছর বন্ধ থাকার পর সাংহাই-দিল্লি সরাসরি ফ্লাইটও পুনরায় চালু হয়।

 

অন্যদিকে, চীন এখন ভারতের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস। ভারত বিদেশ থেকে যে পণ্য কেনে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্যের পণ্য আসে চীন থেকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চীন থেকে ভারতের আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩২ বিলিয়ন ডলার। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে মোবাইল ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, শিল্পের যন্ত্রপাতি, সৌরপ্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও বিভিন্ন উৎপাদন-উপকরণ। ফলে রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও ভারতের শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থায় চীনের ওপর নির্ভরতা এখনো অনেক বেশি।

 

দিল্লি চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে চাইছে। প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য চীনের সঙ্গে বাণিজ্যও চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে, আবার একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে ব্যবসাও করছে। সি চিনপিংয়ের দিল্লি সফর তাই ওয়াশিংটনের জন্য সতর্ক সংকেত। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি এশিয়া কৌশলের অন্যতম ভিত্তি হলো ভারতকে চীনের মোকাবিলায় শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে পাশে রাখা। কিন্তু দিল্লি যদি একই সময়ে বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে সম্পর্কও উন্নত করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সেই কৌশল আরও জটিল হয়ে যায়।

 

কারণ ভারত কোনো এক পক্ষের শিবিরে পুরোপুরি যেতে চায় না। দিল্লি নিজের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা, রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ক এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সবকিছুই চালিয়ে যেতে চাইছে।

 

 

ভারত কি আমেরিকা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে

 

ভারত-চীন সম্পর্ক কিছুটা শিথিল হলেও, সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য ঘাটতি ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা এখনো রয়েছে। একইভাবে ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে গভীর হলেও দিল্লি পশ্চিমা প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাজারের ওপরও ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে ভারত একই সঙ্গে তিন দিক সামলাতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ক এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। ওয়াশিংটনের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ ভারতকে নির্দিষ্ট একটি শিবিরে আটকে রাখা কঠিন।

 

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রিকসের সদস্যরা সবাই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী নয়। ভারতও চায় না, জোটটিকে সরাসরি পশ্চিমবিরোধী রাজনৈতিক বা সামরিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হোক। দিল্লি ব্রিকসকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন জোরদারের মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরছে। এবারের সম্মেলনে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, আন্তসীমান্ত ডিজিটাল পেমেন্ট, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে, যা ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের। তবে রাশিয়ার অবস্থানও সরল ‘ডলারবিরোধিতা’ নয়। ক্রেমলিন বলেছে, মস্কো ডলার থেকে সরে যাওয়ার নীতি অনুসরণ করছে না, বরং আন্তর্জাতিক লেনদেনে গ্রহণযোগ্য বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার সুযোগ বাড়াতে চায়।

 

আমেরিকা কী ভাবছে

 

বিশ্ব আর আগের মতো দুই শিবিরে বিভক্ত নেই। ভারত যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোয়াডে আছে, তেমনি রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও অস্ত্র কিনছে। চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ থাকলেও বাণিজ্যের প্রসার ঘটাচ্ছে। আবার ব্রিকসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে পশ্চিমা শক্তির বাইরে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য আলাদা কণ্ঠ তৈরি করতে চাচ্ছে।

 

পুতিন ও সির ভারত সফরকে তাই ‘আমেরিকার বিরুদ্ধে রাশিয়া-চীন-ভারতের জোট’ হিসেবে দেখা ভুল নয়, বরং এটি এমন এক বহুমেরু বিশ্বের ইঙ্গিত, যেখানে ভারত কোনো এক পক্ষের সঙ্গে পুরোপুরি না গিয়ে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে।

 

ওয়াশিংটনের কাছে এই বার্তাটি একদম স্বচ্ছ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন। এ কারণে দিল্লি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে এবং কোনো একক জোটে পুরোপুরি আবদ্ধ হতে চায় না। এই কারণেই দিল্লির এবারের ব্রিকস সম্মেলন শুধু ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নয়, আমেরিকা-চীন-রাশিয়া প্রতিযোগিতার মাঝখানে ভারতের অবস্থান কোন দিকে যাচ্ছে তারও বড় পরীক্ষা।