Image description

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের ছয় মাসের বেশি সময় পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি; বরং ইয়েমেন ও ইরাকে ইরান সমর্থিতদের সাম্প্রতিক তৎপরতায় সংকট আরো জটিল হয়ে উঠেছে। সংঘাত থেকে বের হওয়ার স্পষ্ট কোনো পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের গভীর চোরাবালিতে যেন আটকে গেছেন ট্রাম্প।

শুক্রবার বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ—পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের মুখে বাব আল-মান্দাব প্রণালি—বড় ধরনের বাধার মুখে ছিল। হরমুজ ইরানি নিয়ন্ত্রণে এবং বাব আল-মান্দাব ইয়েমেনের হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

একই দিনে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালির বাধা এড়িয়ে সৌদি আরব এই পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহনের চেষ্টা করছিল। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প এই সরবরাহপথেও নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বোমাবর্ষণ শুরুর আগের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের কিছু বেশি ছিল। শুক্রবার তা সাময়িকভাবে ১১০ ডলারে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দামও যুদ্ধ শুরুর সময়ের ২ দশমিক ৯৮ ডলার থেকে বেড়ে প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ৩০ ডলারে উঠেছে।

মার্কিন অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো নিয়মিত হামলার ঝুঁকিতে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে আর্থিক চাপ প্রয়োগের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’।

তবে মার্কিন নৌ অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করলেও দেশটির শাসনব্যবস্থায় এখনো বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। ইরানে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, মুদ্রার মূল্য কমেছে এবং জ্বালানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এরপরও দেশটির সরকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। একই সময়ে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্য তেহরানের প্রভাব আরো বাড়িয়েছে।

ইয়েমেনে হুথিদের মোখা দখল এবং ইরাকভিত্তিক ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সৌদি তেল অবকাঠামোয় হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরো বিস্তৃত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এর ফলে শুধু সামরিক সংঘাত নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যপথও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা সক্রিয় থাকায় ওয়াশিংটনের জন্য সংকট আরো কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে একই সময়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং সৌদি আরবের বিকল্প তেল পরিবহন ব্যবস্থায় হামলা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দ্রুত শেষ করার যে লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অভিযান শুরু করেছিল, ছয় মাসের বেশি সময় পর পরিস্থিতি তার বিপরীত দিকে যাচ্ছে। সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ, আঞ্চলিক মিত্রদের তৎপরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ—সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সংকট আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট