এবার যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ হুমকি দিয়েছে ইরান। এক বিবৃতিতে তেহরানের নিরাপত্তা বাহিনী মঙ্গলবার দাবি করেছে, তারা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে একটি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর মধ্য দিয়ে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের উত্তেজনা আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, কয়েক দিন আগেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষ আবারও পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়েছিল।
সবশেষ শনিবার যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা ইরানের তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর পর রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, কয়েকটি মার্কিন জাহাজে হামলার সময় ইরান ‘কাসেম বসির’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
এদিকে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি সৌদি আরবের কয়েকটি শহরে ফের হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের এক মুখপাত্র।
ওয়াশিংটন-তেহরান কূটনৈতিক অগ্রগতি থমকে থাকায় এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করলেও ইরান এখনো বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে চলেছে। চলতি সপ্তাহেও এই পথে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল কমে গেছে।
ইরান আগামী কয়েক দিনের মধ্যে উপসাগরে নতুন একটি সীমিত প্রবেশ এলাকা ঘোষণা করার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে নতুন একটি নৌপথের মানচিত্র প্রকাশের কথাও জানিয়েছে দেশটি। তবে এসব পরিকল্পনার বিস্তারিত কবে প্রকাশ করা হবে, তা স্পষ্ট নয়।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শুরুর স্থান থেকে নতুন সীমিত প্রবেশ এলাকা কার্যকর হবে এবং তা উপসাগরের বিভিন্ন অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। তিনি বলেন, ওই এলাকায় প্রবেশকারী যেকোনো জাহাজকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মঙ্গলবার আবারও অর্থনৈতিক ও সামরিক হুমকি দেন। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে স্পষ্ট সতর্কবার্তা পেয়েছে। অর্থনৈতিক যুদ্ধের জবাব দেওয়া হবে পারস্য উপসাগরে সামুদ্রিক নিষিদ্ধ এলাকা তৈরির মাধ্যমে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও ঘাঁটির বিরুদ্ধে আমাদের সামরিক অবস্থান মৌলিকভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, রেজাই সম্ভবত ‘কাসেম বসির’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের কথাই উল্লেখ করেছেন। ইরানের গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের যুদ্ধজাহাজগুলো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এড়িয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের হামলায় ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির দুর্বল অর্থনীতির ওপর চাপ বেড়েছে। এরপরও ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজকে হুমকি দেওয়ার মতো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতেও হামলার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
ইরান ‘কাসেম বসির’ ক্ষেপণাস্ত্রকে উন্নত সংস্করণের ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে তুলে ধরেছে। দেশটির দাবি, এটি অধিক গতিশীল এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে সক্ষম। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যুদ্ধ মোকাবিলায় কার্যকর নির্দেশনা ব্যবস্থা রয়েছে এর।
ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলার মাধ্যমে এই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম যুদ্ধক্ষেত্র ব্যবহার হয়েছিল।
কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরানের প্রভাব কমে আসছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চাপও ইরানের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কারণে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারী জাহাজকে হুমকি দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
এর ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী জনমত বাড়ায় এবং নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচন সামনে থাকায় এই যুদ্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হলে তেলের দাম দ্রুত কমে যাবে। প্রতি গ্যালন তিন ডলারে নেমে আসবে এবং শেষ পর্যন্ত দুই ডলারের নিচেও যাবে। সবকিছু দ্রুত ঘটবে এবং ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।’
তবে গত ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার সময় ট্রাম্প যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তা এখনো পূরণ হয়নি। তার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলার সক্ষমতা থামানো এবং ইরানিদের নিজেদের নেতৃত্ব পরিবর্তনের মতো পরিস্থিতি তৈরি করা।