Image description

ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়ার তোব্রুক থেকে রাবারের নৌকায় চেপে ভূমধ্যসাগরে পাড়ি দিয়েছিলেন ৬ বাংলাদেশিসহ ৩৮ যুবক। কিন্তু যাত্রার ২৮ ঘণ্টার মাথায় হঠাৎ ফুটো হয়ে যায় নৌকার তলা। দ্রুত ভেতরে ঢুকতে শুরু করে পানি। দালালদের দেওয়া মোবাইল নম্বরে একের পর এক ফোন করেও মেলেনি কোনো সাড়া।

সামনে উত্তাল ভূমধ্যসাগর, পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ নেই। মুহূর্তেই ইউরোপযাত্রার স্বপ্ন পরিণত হয় বেঁচে থাকার লড়াইয়ে।

অবশেষে সাগরে চলাচলকারী ফ্রান্সের‌ ‘থেমিস’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে। পরে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় মিশরের দমিয়েত্ত বন্দরে। বর্তমানে তারা দামিয়েত্ত জেলার একটি অস্থায়ী আটককেন্দ্রে রয়েছেন।

উদ্ধার হওয়া অভিবাসন প্রত্যাশীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট লিবিয়ার তোব্রুক থেকে একটি রাবারের নৌকায় করে ইউরোপের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন ৩৮ জন। তাদের মধ্যে ১৭ জন মিশরের নাগরিক, ৬ জন বাংলাদেশি, ৬ জন সুদানের, ৬ জন ইথিওপিয়ার এবং ৩ জন দক্ষিণ সুদানের নাগরিক ছিলেন।

 

নৌকাটিতে ছিল না কোনো আধুনিক দিকনির্দেশনা বা নেভিগেশন ব্যবস্থা। সমুদ্রপথ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়াই তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভয়ংকর এই যাত্রায়।

যাত্রার প্রায় ২৮ ঘণ্টা পর তারা বুঝতে পারেন, নৌকার নিচের অংশ ফুটো হয়ে গেছে। মুহূর্তের মধ্যেই পানি ঢুকতে শুরু করে নৌকায়। আতঙ্কে সবাই প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করতে থাকেন।

বিপদ বুঝতে পেরে দালালদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু দেওয়া মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

 

এরপর ভূমধ্যসাগরে চলাচলকারী বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা শুরু করেন তারা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফ্রান্সের ‘থেমিস’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের দেখতে পায় এবং উদ্ধার করে।

উদ্ধারস্থল থেকে মিশরের দামিয়েত্তা বন্দরে পৌঁছাতে তাদের সময় লাগে প্রায় দেড় দিন। অর্থাৎ রাবারের নৌকা ও উদ্ধারকারী জাহাজ—দুই মিলিয়ে প্রায় তিন দিন ভূমধ্যসাগরের বুকে কাটাতে হয়েছে তাদের।

উদ্ধার হওয়া ছয় বাংলাদেশির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে বাংলাদেশ ও লিবিয়ার দালালদের মাধ্যমে লিবিয়ায় যান।

ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় প্রত্যেকেই দালালদের দিয়েছেন প্রায় ১৩ লাখ টাকা। বিপুল এই অর্থ জোগাড় করতে কেউ জমিজমা বিক্রি করেছেন, কেউ ঋণ করেছেন, আবার কেউ আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করেছেন।

কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর ইউরোপে পাঠানোর পরিবর্তে তাদের প্রায় ছয় মাস দালালদের নিয়ন্ত্রিত একটি আস্তানায় আটকে রাখা হয়। দীর্ঘ এই সময়ে তারা কোনো কাজও পাননি।

সমুদ্রপথে ইউরোপযাত্রার মাত্র তিন দিন আগে তাদের একটি নির্দিষ্ট ঘরে নিয়ে রাখা হয়। দালালদের কাছে ওই ঘরটি পরিচিত ছিল ‘গেম ঘর’ নামে। সেখান থেকেই গত ২ আগস্ট তাদের রাবারের নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর যাত্রা। যে যাত্রার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করেছিলেন, সেই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত তাদের ঠেলে দেয় মৃত্যুর মুখোমুখি।

উদ্ধার হওয়া ছয় বাংলাদেশির সবাই নরসিংদী জেলার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে পাঁচজন বেলাব উপজেলার এবং একজন রায়পুরা উপজেলার। তাদের ও পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়ায় মূল দালাল হিসেবে আব্দুর রহমান এবং বাংলাদেশি দালাল হিসেবে শাহিদা আক্তারের নাম উঠে এসেছে। তবে দালালদের ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আরও তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা দামিয়েত্তায় গিয়ে ছয় বাংলাদেশির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় সাগরের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন বলে জানিয়েছেন দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের এক কর্মকর্তা।

দীর্ঘদিন পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এই যুবকদের একটাই আকুতি ছিল—প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলা।

তারা দূতাবাস কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়ার জন্য। পরে পুলিশের অনুমতি নিয়ে দূতাবাসের কর্মকর্তারা নিজেদের মোবাইল ফোন থেকে একে একে ছয়জনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাদের কথা বলার সুযোগ করে দেন। প্রিয়জনদের কণ্ঠ শুনে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পরিবারের সঙ্গে এই কথোপকথন তাদের জন্য হয়ে ওঠে স্বস্তির এক মুহূর্ত।

মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ছয় বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভূমধ্যসাগরে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একের পর এক বিপজ্জনক যাত্রা ও প্রাণহানির ঘটনা আবারও সামনে এনেছে ইউরোপমুখী অবৈধ সমুদ্রপথের ভয়াবহ বাস্তবতা।

লিবিয়ায় দালালদের নিয়ন্ত্রণে মাসের পর মাস আটকে থাকা, ইউরোপে যাওয়ার জন্য লাখ লাখ টাকা পরিশোধ এবং শেষ পর্যন্ত কোনো নেভিগেশন ব্যবস্থা ছাড়াই রাবারের নৌকায় তুলে দেওয়ার ঘটনা বড় প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে—ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখিয়ে এসব মানুষকে মৃত্যুঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার দায় কার?

নরসিংদীর এই ছয় যুবক এবার প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন। কিন্তু একই পথে যাত্রা করা আরও কত মানুষ যে ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে হারিয়ে যাচ্ছেন, তার সঠিক হিসাবও অনেক সময় পাওয়া যায় না।