যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে তিন সন্তান হত্যার অভিযোগে লিন্ডসে ক্ল্যান্সির বিচার বাতিল ঘোষণা করেছেন বিচারক। জুরি বোর্ড ঐকমত্যে না পৌঁছানোয় শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) এ ঘোষণা দেয়া হয়। সন্তানদের হত্যার দায়ে ৩৬ বছর বয়সী এই নারীকে আইনগতভাবে দায়ী করা হবে কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র মতবিভেদ তৈরি হয়েছিল।
তবে তার আইনজীবীর দাবি, ২০২৩ সালে সন্তানদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করার সময় তিনি প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিস নামের একটি বিরল মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট শিশুটির বয়স ছিল মাত্র ৮ মাস। সন্তানদের হত্যার পর তিনি নিজেকেও হত্যার চেষ্টা করেন। তবে প্রসিকিউটররা দাবি করেন, ক্ল্যান্সি জেনেশুনেই এই কাজ করছিলেন।
বিচার বাতিলের ফলে মামলাটি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেল। জুরি সাত দিন ধরে আলোচনার পরও রায়ে পৌঁছাতে পারেনি। আদালতে মিসট্রায়ালের ঘোষণা শুনে ক্ল্যান্সি বা তার পরিবারের সদস্যরা কোনো আবেগ প্রকাশ করেননি।
খালাসের কাছাকাছি ছিলেন বলে দাবি আইনজীবীর
ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ বহাল রয়েছে এবং মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে একটি মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে রাখার কথা রয়েছে।
তার আইনজীবী কেভিন রেডিংটন বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা একজন জুরি না থাকলে ক্ল্যান্সি খালাস পেতে পারতেন বলে তিনি মনে করেন। মিসট্রায়ালের পর ক্ল্যান্সি কেমন আছেন জানতে চাইলে রেডিংটন বলেন, তিনি ভালো নেই।
তার বাবা-মা ও বোনকে পুলিশের সদস্যরা আদালত চত্বর থেকে বের করে নিয়ে যান। তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। মামলার প্রথম সাক্ষী ক্ল্যান্সির সাবেক স্বামী প্যাট্রিক ক্ল্যান্সি আগের সাক্ষাৎকারগুলোতে বলেছেন, তিনি তার সাবেক স্ত্রীকে ক্ষমা করেছেন এবং তার কর্মকাণ্ড মানসিক অসুস্থতার ফল বলে বিশ্বাস করেন।
শুক্রবার তার আইনজীবী এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই মর্মান্তিক ঘটনাকে আরেকটি বিচারের মাধ্যমে পুনরায় বাঁচিয়ে তোলার সম্ভাবনা অত্যন্ত কষ্টদায়ক।’
আবারও বিচার হতে পারে
ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের সিদ্ধান্ত নেয়া প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, দ্বিতীয়বার বিচার হবে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে জনমত কোনো প্রভাব ফেলবে না।
প্লাইমাউথ কাউন্টির জেলা অ্যাটর্নি টিমোথি ক্রুজ বলেন, ‘এই মামলাটি ছিল এবং সবসময়ই থাকবে ওই তিনটি ছোট্ট শিশুর জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার উদ্দেশ্যে। এই মামলাটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বা সেখানে নারীদের সাথে কেমন আচরণ করা হয়, বা কী ধরনের রোগ নির্ণয় করা হয়, তা নিয়ে নয়।’
শুক্রবার জুরি আলোচনার সময় নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিচারক প্রথমে মামলাটি বাতিল ঘোষণা করতে যাচ্ছিলেন। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ক্ল্যান্সির আইনজীবীকে ম্যাসাচুসেটসের সর্বোচ্চ আদালতে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদন করার সুযোগ দেন। তবে ওই আদালত বিচারককে মিসট্রায়াল ঘোষণা করা থেকে বিরত রাখেনি।
ক্ল্যান্সির আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, জুরি সদস্যদের একজন মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পক্ষপাত প্রকাশ করেছেন। তারা বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেননি। তাদের দাবি ছিল, অন্তত ওই জুরিকে আরও বিস্তারিতভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক অথবা মামলা বাতিলের ঘোষণার আগেই তাকে জুরি থেকে বাদ দেয়া হোক।
তিন সন্তান ও স্বামীর সঙ্গে লিন্ডসে ক্ল্যান্সি।
তিনবারও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি জুরি
প্রসিকিউটররা বলছেন, ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি ক্ল্যান্সি ইচ্ছাকৃতভাবে তার ৫ বছর বয়সী মেয়ে কোরা, ৩ বছর বয়সী ছেলে ডসন এবং ৮ মাস বয়সী ছেলে ক্যালানকে ব্যায়ামের ইলাস্টিক ব্যান্ড দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। তাদের অভিযোগ, সন্তানদের হত্যার আগে তিনি তার স্বামীকে বাড়ির বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। এক সন্তানের ওষুধ এবং পরিবারের রাতের খাবার আনতে তাঁ=কে বাইরে পাঠানো হয়েছিল।
অন্যদিকে ক্ল্যান্সির আইনজীবী বলেন, প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিসের কারণে তাকে ফৌজদারি অপরাধের জন্য দায়ী করা উচিত নয়। এই বিরল মানসিক অসুস্থতার সঙ্গে সন্তান জন্মের পরের মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি ও হরমোনের পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।
জুরি তিনবার জানিয়েছে, তারা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না। বৃহস্পতিবার জুরির প্রধান বিচারককে জানান, একজন জুরি যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করছেন না।
শুক্রবার আদালতের বাইরে রেডিংটন ওই জুরির সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, ‘তারা জানে, একজন ব্যক্তি তাদের কাছ থেকে বিচার ছিনিয়ে নিয়েছে। সে সাত সপ্তাহ ধরে এত মনোযোগী, সুন্দর ও অসাধারণভাবে দায়িত্ব পালন করা অন্য জুরিদের সময় নষ্ট করেছে।’
জুরি কীভাবে বিভক্ত ছিল, কিংবা তারা দোষী সাব্যস্ত করা না খালাসের দিকে বেশি ঝুঁকেছিল কি না, তা স্পষ্ট হয়নি। হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে ক্ল্যান্সির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারত। আর খালাস পেলে বিচারক তাঁকে মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাখার নির্দেশ দিতে পারতেন। মামলাটি ব্যাপক ও বিভাজনমূলক মনোযোগ পাওয়ায় বিচারক জুরিদের নাম অন্তত ১৪ দিনের জন্য গোপন রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
লিন্ডসে ক্ল্যান্সির মামলা নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে লাখ লাখ মানুষ সরাসরি সম্প্রচারিত এই বিচার দেখেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মামলাটির ওপর নজর রাখছিলেন বলে জানিয়েছেন। শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ‘এটি একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি। দেখুন, সে একটি ভয়ানক কাজ করেছে। এর চেয়ে খারাপ আর হতে পারে না। এর একটা মূল্য দিতে হবে—মানসিক হাসপাতাল বা জেল বা ওইরকম কিছু একটা।’
বিচারের অধিকাংশ দিন গোলাপি পোশাক পরা ক্ল্যান্সির সমর্থক নারীরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাদের অনেকে নিজেদের প্রসব-পরবর্তী অভিজ্ঞতা বা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছেন।
শুক্রবার তাদের একজন ৫৫ বছর বয়সী শল্যচিকিৎসক মার্তা কুইজানো জানান, অসম্পূর্ণ বিচার তার জন্য, পরিবার ও লিন্ডসের জন্য এবং লিন্ডসের পরিবারের জন্য খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না, তাঁকে আবারও এসবের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আমার মনে হয়, বিষয়টির এখানেই সমাধান হওয়া উচিত ছিল।’
জুরি আলোচনার শুরুর দিকেই বিচারক স্বীকার করেছিলেন যে বিচারপ্রক্রিয়াটি সবার জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে। শিশুদের বাবার করা হৃদয়বিদারক জরুরি ফোনকল থেকে শুরু করে তাদের মৃত্যুর বর্ণনা—সাক্ষ্যের অনেক অংশই ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক।
একাধিকবার আদালতে কেঁদে ফেলেন ক্ল্যান্সি। একপর্যায়ে শিশুদের ময়নাতদন্তের ছবি দেখানোর সময় তার জোরে কান্নার শব্দে আদালতকক্ষে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠলে বিচারক সংক্ষিপ্ত বিরতি দেন।
বিচারের কেন্দ্রে ছিল ক্ল্যান্সির মানসিক স্বাস্থ্য
২১ দিন ধরে সাক্ষ্যগ্রহণে জুরিরা শুনেছেন, ক্যালানের জন্মের পর কীভাবে ক্ল্যান্সির মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তিনি তীব্র উদ্বেগে ভুগছিলেন, ঘুমাতে পারছিলেন না এবং নিজের ভাষায় অস্বস্তিকর এক ধরনের মস্তিষ্কের ধোঁয়াশা অনুভব করছিলেন। এ কারণে তিনি সন্তান জন্মের পরের মানসিক সমস্যাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হন। তারা তাকে একাধিক মানসিক রোগের ওষুধ দেন।
ক্ল্যান্সির পরিবারের সদস্যরা সাক্ষ্যে বলেন, নিজের মানসিক অবস্থার অবনতির বিষয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তার সাবেক শাশুড়ি সুসান ক্ল্যান্সি তাকে যত্নশীল ও ভালোবাসাপূর্ণ মা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, তিনি সাহায্যের জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন।
২০২৩ সালের শুরুর দিকে ক্ল্যান্সি নিজেই একটি মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি হন। তবে সেখানে তার অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে ছাড়া পাওয়ার ১৯ দিন পর তিনি সন্তানদের হত্যা করেন। বোস্টনের দক্ষিণে পরিবারের বাড়ির বেসমেন্টে শিশুদের মরদেহ পাওয়া যায়।
এরপর ক্ল্যান্সি বাড়িটির দ্বিতীয় তলা থেকে নিচে ঝাঁপ দেন। এতে কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যায় এবং তিনি এখনো সেই অবস্থায় রয়েছেন। প্রসিকিউটররা স্বীকার করেন, ক্ল্যান্সি গুরুতর মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তবে তাদের দাবি, তিনি তার কর্মকাণ্ড বুঝতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম ছিলেন।