Image description

নেপালে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বরফ-পাথরের ধস ও আকস্মিক বন্যায় ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া এই দুর্যোগে হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কাঠমান্ডু সরকার আন্তর্জাতিক ফোরামে বৃহৎ কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলোর কাছে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবি করেছে। বৈশ্বিক জলবায়ু রাজনীতি ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দাবিটি একশ ভাগ যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত।

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো বিশ্বে নির্গত হওয়া মোট কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কম তৈরি হয় নেপালে। অথচ পরিবেশ দূষণকারী বড় অর্থনৈতিক দেশগুলোর সীমাহীন শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি বলি হচ্ছে হিমালয় অঞ্চল। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয়ের গ্লেসিয়ার বা বরফ বাঁধানো স্তরগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও হড়পা বানের অন্যতম অনুঘটক।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, দুর্যোগ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক সাহায্য কোনো দাতব্য অনুদান নয়, বরং এটি উন্নত ও প্রধান নির্গমনকারী দেশগুলোর নৈতিক ও আইনি দায়বদ্ধতা। নেপাল নিজের স্বার্থে শত শত একর বনভূমি রক্ষা এবং জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করে পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে, কিন্তু বহিরাগত কার্বনের কারণে তাদের উন্নয়নের চাকা থমকে যাচ্ছে।

জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকার করা হয়েছে, যেসব দেশ জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী নয়, কিন্তু চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, ধনী দেশগুলোকে তাদের লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল থেকে সরাসরি অনুদান দিতে হবে। নেপাল সেই ফ্রেমওয়ার্ক অনুসারেই চিঠি পাঠিয়েছে।

নুয়াকোটের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে যখন স্বজনরা মৃতদেহের অভাবে খড়ের কুশপুত্তলিকা বানিয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন করছে, ঠিক তখন নেপালের অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশ্বমঞ্চে এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক বার্তা পাঠাল—আমরা সাহায্য চাইছি না, আমরা বিচার ও ক্ষতিপূরণ চাই।

নেপালের হিমালয়ের কোলঘেঁষে বাস করা সাধারণ মানুষের কার্বন পদচিহ্ন প্রায় শূন্যের কোঠায়। তারা সাইকেলে চলায় অভ্যস্ত, রান্নায় কাঠের চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং দেশটির ৪৫ শতাংশ ভূখণ্ড বনাঞ্চল। কিন্তু ২৬ আগস্ট সকালে লেন্দে নদীর তীরে তিমুরে ও রসুয়া যেভাবে কয়েক হাজার টন কাদা ও বরফে মাটিচাপা পড়ল—তাতে স্পষ্ট, বিশ্ব উষ্ণায়নের আন্তর্জাতিক ভয়াবহতা পাহাড়ি এই ছোট রাষ্ট্রটিকে গ্রাস করছে।

নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের কাছে দেওয়া চিঠিতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গিয়ে বৃহৎ শক্তিগুলো বায়ুমণ্ডলে যে হাজার হাজার টন গ্রিনহাউস গ্যাস জমা করেছে, হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া তারই সরাসরি প্রতিক্রিয়া। এটি কোনো সাধারণ অতিবৃষ্টি বা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না; এটি ছিল মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির এক প্রত্যক্ষ ঘাতক রূপ।

আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থা অক্সফ্যামের মতে, ঋণের বোঝায় জর্জরিত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যদি নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে দুর্যোগের ক্ষতি সামলাতে হয়, তবে তা জলবায়ু অন্যায্যতাকে আরও ত্বরান্বিত করবে। নেপাল যে ক্ষতিপূরণ দাবি করছে, তা বিশ্ব জলবায়ু ন্যায়বিচারের কষ্টিপাথর। প্রধান দূষণকারী দেশগুলো যদি এর মাশুল না দেয়, তবে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু চুক্তির নীতিগত ভিত্তিই ভেঙে পড়বে।

কালবেলা